বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, জ্বালানি সংকট, গ্যাস-বিদ্যুতের ঘাটতি, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও ঋণের উচ্চ সুদহারের মতো প্রতিকূলতার মধ্যেও বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের চাহিদা বাড়ছে। বিশেষ করে তুলাবহির্ভূত বা নন-কটন পোশাকের বাজার সম্প্রসারণ দেশের রপ্তানি খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে মোট তৈরি পোশাক রপ্তানির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এসেছে এ শ্রেণির পণ্য থেকে। আগস্টে মোট পোশাক রপ্তানিতে নন-কটনের অংশ বেড়ে দাঁড়ায় সর্বোচ্চ ৩৪ দশমিক ৬ শতাংশে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়তি চাহিদা কাজে লাগাতে উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, পণ্যের বৈচিত্র্য এবং নীতিসহায়তা জোরদার করা জরুরি বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলতি বছর ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর— এই নয় মাসে দেশ থেকে ৯ দশমিক ১৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের নন-কটন পোশাক রপ্তানি হয়েছে। এ সময় মোট তৈরি পোশাক রপ্তানির ৩০ দশমিক ৭ শতাংশ এসেছে তুলাবহির্ভূত বা নন-কটন পোশাক থেকে। অন্যদিকে প্রচলিত তুলাভিত্তিক পোশাক রপ্তানি এখনও খাতটির প্রধান ভিত্তি হিসেবে রয়েছে।
বিশ্লেষণ অনুযায়ী,
২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে বাংলাদেশের মোট তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে ২৯ দশমিক ৯১ বিলিয়ন ডলারের। এর মধ্যে তুলাভিত্তিক পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ২০ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার, যা মোট রপ্তানির ৬৯ দশমিক ৩ শতাংশ। অন্যদিকে নন-কটন পোশাক রপ্তানি হয়েছে ৯ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলারের, যা মোট রপ্তানির ৩০ দশমিক ৭ শতাংশ। এখানে তৈরি পোশাক বলতে হারমোনাইজড সিস্টেমের (এইচএস) ৬১ ও ৬২ নম্বর অধ্যায়ভুক্ত পণ্যকে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের (বিএভি) প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মহিউদ্দিন রুবেল আমাদের সময়কে বলেন, বিশ্ববাজারে তুলার তৈরি পোশাকের পাশাপাশি তুলাবহির্ভূত (নন-কটন) পোশাকের কদর বাড়ছে। ক্রেতারা নন-কটন পোশাকের দিকে ঝুঁকছে। এই মার্কেট ধরতে পারলে রপ্তানি অনেকগুণ বেড়ে যাবে বলে আশা করা যায়। তবে এর জন্য সবার আগে সরকারের পক্ষ থেকে নীতি-সহায়তা আরও বাড়ানো দরকার বলেও মনে করেন তিনি।
নন-কটনের বাজার হিস্যা বাড়ছে : মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বছরের শুরুতে মোট পোশাক রপ্তানিতে নন-কটনের অংশ তুলনামূলক কম থাকলেও সময়ের সঙ্গে তা বেড়েছে। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে নন-কটন পোশাকের অংশ ছিল ২৮ শতাংশ। এরপর ধীরে ধীরে এই অংশ বাড়তে থাকে এবং জুনে প্রথমবারের মতো ৩০ শতাংশের সীমা অতিক্রম করে ৩১ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছায়।
নন-কটন পোশাকের অংশ সর্বোচ্চ পর্যায়ে ওঠে আগস্টে। ওই মাসে মোট তৈরি পোশাক রপ্তানির ৩৪ দশমিক ৬ শতাংশ ছিল নন-কটন পণ্য। তবে সেপ্টেম্বরে এ হার কিছুটা কমে ৩২ দশমিক ৬ শতাংশে দাঁড়ায়। মাসভিত্তিক রপ্তানি মূল্যের হিসাবে নন-কটন পোশাকের সর্বোচ্চ রপ্তানি হয়েছে জুলাইয়ে, যার পরিমাণ ছিল ১ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলার।
এ পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে নন-কটন পণ্যের গুরুত্ব বাড়ছে। যদিও কোনো কোনো মাসে এ পণ্যের অংশে ওঠানামা দেখা গেছে, সামগ্রিকভাবে বছরের প্রথম নয় মাসে নন-কটন পোশাকের রপ্তানি অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য অবস্থানে রয়েছে।
তুলাভিত্তিক পোশাক এখনও প্রধান : নন-কটন পোশাকের অংশ বাড়লেও বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে তুলাভিত্তিক পণ্যের প্রাধান্য এখনও অক্ষুণ্ন রয়েছে। জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মাসগুলোয় তুলাভিত্তিক পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ১ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন থেকে ২ দশমিক ৬০ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে ছিল।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, নন-কটন পোশাকের রপ্তানি অংশ বাড়ার পেছনে তুলাভিত্তিক পোশাকের রপ্তানি কমে যাওয়ার চেয়ে নন-কটন পণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধিই প্রধান ভূমিকা রেখেছে। অর্থাৎ প্রচলিত তুলাভিত্তিক পোশাকের পাশাপাশি নন-কটন পণ্যের রপ্তানি বাড়ায় সামগ্রিক রপ্তানি ঝুড়িতে পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ছে।
পণ্য বৈচিত্র্যে নতুন সম্ভাবনা : বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত দীর্ঘদিন ধরে তুলাভিত্তিক পণ্যের ওপর নির্ভরশীল। তবে নন-কটন পোশাকের রপ্তানি অংশের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা খাতটির পণ্য কাঠামোয় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। কৃত্রিম তন্তু ও অন্যান্য তুলাবহির্ভূত উপকরণ দিয়ে তৈরি পোশাকের রপ্তানি বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের বৈচিত্র্য সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে রপ্তানির এই প্রবণতা ধরে রাখতে পণ্যের মান, উৎপাদন সক্ষমতা, প্রযুক্তি, কাঁচামাল সংগ্রহ এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে তুলাভিত্তিক পোশাকের শক্তিশালী অবস্থান ধরে রেখে নন-কটন পণ্যের উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানো বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসের রপ্তানি চিত্রে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে নন-কটন পণ্যের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি স্পষ্ট। মোট রপ্তানির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এখন এই শ্রেণির পণ্য থেকে আসছে। তুলাভিত্তিক পোশাকের প্রাধান্য বজায় থাকার পাশাপাশি নন-কটনের এই অগ্রগতি দেশের পোশাক রপ্তানিতে পণ্য বৈচিত্র্যের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব তুলে ধরছে।
