বৃদ্ধাশ্রম চালাতে গিয়ে চাকরি হারিয়েছেন সাখাওয়াত হোসেন (এনায়েত)। আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আশ্রয়ে থাকা মানুষগুলোর মুখে খাবার তুলে দিতে পথে পথে ভিক্ষা করেছেন। ভিআইপি এলাকায় ভিক্ষা করতে গিয়ে দুই দিন কারাগারেও থাকতে হয়েছে তাকে। সহ্য করতে হয়েছে মারধর ও অপমান। তবু থেমে যাননি সাখাওয়াত। কারণ তার ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছেন ৭০ জন মানুষ। তাদের কেউ শেষ বয়সে সন্তানদের পাশে পাননি, কেউ পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন, আবার কেউ শারীরিক প্রতিবন্ধীর কারণে অন্যের সহযোগিতা ছাড়া চলতে পারেন না।
বরিশাল নগরের কাউনিয়া হাউজিং এলাকায় বয়স্ক পুনর্বাসন কল্যাণ সংস্থার একটি বৃদ্ধাশ্রম পরিচালনা করেন সাখাওয়াত। সেখানে বিনা মূল্যে থাকা-খাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন প্রবীণ নারী-পুরুষ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও আশ্রয়হীন শিশুসহ ৭০ জন। তাদের খাবার, পোশাক ও দেখাশোনার ব্যবস্থা করতে গিয়ে নিজের জীবনও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে তার। নিয়মিত আয় নেই, নেই বড় কোনো আর্থিক সংস্থান। তবু আশ্রয়ে থাকা মানুষগুলোকে ছেড়ে যেতে চান না তিনি।
অসহায় মানুষের জন্য আশ্রয়
আরও পড়ুন
সাখাওয়াত জানান, একসময় একটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মচারী হিসেবে কাজ করতেন তিনি। ২০১৪ সালে নিজের মায়ের প্রতি ভাইবোনদের অবহেলা ও অযত্ন দেখে অসহায় প্রবীণদের জন্য কিছু করার তাগিদ অনুভব করেন। নিজের জীবনে পারিবারিক নির্যাতন ও নানা প্রতিকূলতার অভিজ্ঞতা তাকে অসহায় মানুষের কষ্ট উপলব্ধি করতে শিখিয়েছে। বিশেষ করে পরিবারে অবহেলা ও নির্যাতনের শিকার প্রবীণদের পাশে দাঁড়ানোর চিন্তা থেকেই বৃদ্ধাশ্রম প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন তিনি।
২০১৫ সালের ১৯ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠা করেন বয়স্ক পুনর্বাসন কল্যাণ সংস্থা। বরিশাল নগরের কাউনিয়া হাউজিং এলাকার ১৫৫৩ নম্বর বাড়িতে শুরু হয় এর কার্যক্রম। অসহায় মানুষের কল্যাণে কাজ করার জন্য সংস্থাটি সরকারি অনুমোদনও পেয়েছে।
সাখাওয়াত বলেন, শুরুতে তার লক্ষ্য ছিল এমন মানুষদের পাশে দাঁড়ানো, যাদের জীবনের শেষ সময়ে থাকার জায়গা ও খাবারের নিশ্চয়তা নেই। পরে ধীরে ধীরে আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রায় ৩০০ জনকে বিনা মূল্যে আশ্রয় ও সেবা দিয়েছেন তিনি।
মানুষের সাহায্য-সহযোগিতায় ভালোই চলছিল প্রতিষ্ঠানটি। তবে জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর সহযোগিতা কমে যায়। বর্তমানে ৬০ শয্যার এই বৃদ্ধাশ্রমে পাঁচজন প্রতিবন্ধী শিশুসহ ৭০ জন বাস করছেন। অর্থসংকটে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম চালিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
খাবার জোগাতে ভিক্ষা
বৃদ্ধাশ্রম পরিচালনা করতে গিয়ে একসময় চাকরিও হারাতে হয় সাখাওয়াতকে। আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা হয়ে দাঁড়ায় আশ্রয়ে থাকা মানুষগুলোর খাবারের ব্যবস্থা করা। প্রতিদিন এত মানুষের খাবার জোগাড় করার মতো সঞ্চয় তার ছিল না। একদিকে অসহায় মানুষগুলোর দায়িত্ব, অন্যদিকে অর্থের সংকট–এই পরিস্থিতিতে শেষ পর্যন্ত ভিক্ষার পথ বেছে নেন তিনি।
২০২২ সালের জুলাইয়ে কোরবানির ঈদের আগে ঢাকার ধানমন্ডি লেক এলাকায় দানবাক্স হাতে অর্থ সংগ্রহের সময় পুলিশ তাকে আটক করে। পরে তাকে ভবঘুরে হিসেবে কারাগারে পাঠানো হয়। দুই দিন পর আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পান তিনি। এ ছাড়া ভিক্ষা করতে গিয়ে বিভিন্ন সময় মারধর ও অপমানের শিকারও হয়েছেন। তবু আশ্রয়ে থাকা মানুষগুলোর কথা ভেবে পিছিয়ে যাননি।
কারও ফেরার পথ নেই
এই মানুষগুলোর অনেকেরই ফিরে যাওয়ার মতো কোনো আশ্রয় নেই। তাদের খাবার ও থাকার ব্যবস্থা অনিশ্চিত হয়ে পড়া মানে জীবনের শেষ বয়সে আবারও সংকটের মুখে পড়া। সে কারণেই নিজের দুর্ভোগের মধ্যেও তাদের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে চান না সাখাওয়াত।
তিনি বলেন, বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দাদের প্রত্যেকের জীবনের গল্প আলাদা। কেউ পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছেন, কেউ আর্থিক অসচ্ছলতায় পড়েছেন, আবার কেউ শারীরিক প্রতিবন্ধী কিংবা স্বামী-সন্তানহীন জীবনের কারণে নির্ভরতার জায়গা হারিয়েছেন। তাদের ভরণপোষণের সামর্থ্য অনেক পরিবারের নেই। এমনো আছেন, যাদের সন্তান বছরের পর বছর কোনো খোঁজখবর নেন না।
সাখাওয়াত বলেন, তার আশ্রয়ে থাকা কয়েকজন প্রবীণের সন্তান পরে নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে তাদের বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে গেছেন। তবে সবার ক্ষেত্রে এমন হয়নি। কেউ কেউ বৃদ্ধাশ্রমে থাকা অবস্থায় মারা গেছেন। তাদের মরদেহ নিতে পরিবারের কেউ আসেননি। প্রতিষ্ঠার পর থেকে তার উদ্যোগে ৪০ জন নারী বাসিন্দার দাফন সম্পন্ন হয়েছে। সাখাওয়াতের আবেদন, সমাজের বিত্তবানরা একটু এগিয়ে এলে অসুস্থ, প্রতিবন্ধী ও অসহায় প্রবীণেরা কিছুটা ভালো থাকতে পারবেন।
কাউনিয়া হাউজিংয়ের এই আশ্রয়ে আছেন উষা রাণী। নদীভাঙনে হারিয়েছেন ঘরবাড়ি ও ভিটেমাটি। আশ্রয়ের জন্য বড় ছেলের কাছে অনুরোধ করেও জায়গা পাননি। ছোট ছেলের ঘরেও ঠাঁই হয়নি তার। শেষ পর্যন্ত আশ্রয় মিলেছে সাখাওয়াতের বৃদ্ধাশ্রমে।
উষা রাণী বলেন, ‘জীবনের শেষ বয়সে সন্তানদের কাছে আশ্রয় চেয়েও পাইনি। অথচ সাখাওয়াত আমাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। আমাদের মুখে খাবার তুলে দিতে তাকে মানুষের কাছে হাত পাততে হয়, কত কষ্ট করতে হয়। তারপরও তিনি আমাদের ছেড়ে যাননি।’
বৃদ্ধাশ্রমের আরেক বাসিন্দা কহিনূর বেগম বলেন, ‘বয়স হয়েছে, এখন আর আগের মতো কাজ করার শক্তি নেই। এখানে এসে অন্তত নিরাপদে থাকার একটা জায়গা পেয়েছি। সাখাওয়াতেরও নিজের জীবন আছে, নিজের কষ্ট আছে। তার পরও তিনি আমাদের ছেড়ে যাননি। আমরা চাই, এখানে খাবার ও চিকিৎসার অভাব যেন না হয়।’
প্রায় ১১০ বছর বয়সী হামিদা বেগমের মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়েছে এই বৃদ্ধাশ্রমে। আট বছর ধরে এখানে আছেন তিনি। প্রথম দিকে ছেলে-মেয়েরা আসতেন। তবে গত কয়েক বছর ধরে তার সঙ্গে কারও যোগাযোগ নেই।
হামিদা বেগম বলেন, ‘কোথায় থাকব, কী খাব–এমন দুশ্চিন্তা ছিল। এখানে এসে নিয়মিত খাবার পাচ্ছি। সাখাওয়াত নিজের কষ্টের কথা না ভেবে আমাদের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার চেষ্টা করেন। আমরা চাই, এই আশ্রয়টা যেন টিকে থাকে।’
এই আশ্রমে তিন বছর ধরে বসবাস করছেন বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার হেলেনছা গ্রামের বকুল বেগম। তার বাবার মৃত্যুর পর প্রতিবেশীরা তাকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে প্রায় এক বছর চিকিৎসা দেওয়ার পর তাকে এই বৃদ্ধাশ্রমে আনা হয়।
বকুল বেগম বলেন, ‘আমার এই আব্বা (সাখাওয়াত) ছাড়া দুনিয়াতে কেউ নেই। আব্বা সব সময় আমার খোঁজ নেন। আব্বাকে আল্লাহ হায়াত দান করুন।’
একা সাখাওয়াতের পক্ষে কত দূর?
৭০ জন মানুষের খাবার, পোশাক, চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে নিয়মিত অর্থের প্রয়োজন। কিন্তু সাখাওয়াতের নিজের আয়ের নিশ্চয়তা নেই। মানুষের সহযোগিতা কমে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি চালিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। তার স্বপ্ন, বৃদ্ধাশ্রমটিকে আরও বড় করবেন, আরও বেশি অসহায় মানুষকে আশ্রয় দেবেন। কিন্তু বর্তমান সংকটে প্রতিষ্ঠানটি টিকিয়ে রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ।
বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দাদের সেবা দিতে নিয়োজিত রয়েছেন কয়েকজন সেবিকা। চারটি ভবনে ৭০ জনের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। প্রতি মাসে বাসাভাড়া, খাবার, চিকিৎসা ও কর্মীদের বেতন বাবদ প্রায় পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকা ব্যয় হয়। ব্যয় মেটানোর জন্য বড় কোনো দাতা নেই। মাঝেমধ্যে যে সামান্য অনুদান পাওয়া যায়, তা দিয়ে সব খরচ নির্বাহ করা সম্ভব হয় না। তাই বাধ্য হয়েই সাখাওয়াত বিভিন্ন এলাকায় বিপণিবিতানের সামনে দানবাক্স হাতে অর্থ সংগ্রহ করতে নামেন।
বরিশাল সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অধ্যক্ষ সাজ্জাদ পারভেজ বলেন, ‘সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে বছরে কিছু থোক বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে সেই অর্থ দিয়ে দীর্ঘদিন প্রতিষ্ঠান চালানো কঠিন। সমাজের বিত্তবান ব্যক্তিরা স্বেচ্ছায় সহযোগিতার হাত না বাড়ালে এ ধরনের প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।’
বরিশাল সাংস্কৃতিক সংগঠন সমন্বয় পরিষদের সভাপতি ফারুক আহমেদ বলেন, ‘সাখাওয়াতের সংগ্রাম শুধু একজন মানুষের ব্যক্তিগত ত্যাগের গল্প নয়; এটি এমন এক সামাজিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি, যেখানে জীবনের শেষ বয়সে এসে অনেকের সবচেয়ে বড় সংকট হয়ে দাঁড়ায় নিরাপদ আশ্রয় ও আপনজনের সঙ্গ।’
তিনি বলেন, নিজের জীবনের নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও সাখাওয়াত অসহায় প্রবীণ ও আশ্রয়হীন মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তবে ৭০ জন মানুষের ভরণপোষণের দায়িত্ব একা তার পক্ষে দীর্ঘদিন বহন করা কঠিন। এ জন্য সামর্থ্যবান ব্যক্তি, ব্যবসায়ী, সামাজিক সংগঠন এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে আসতে হবে।
