অলংকরণ: নাজমুল আলম
-->ছোটকাল থেকেই আরহামের একটি অদ্ভুত খানদানি স্বভাব রয়েছে। খানদানিপনা করে মুখ ফুটে কারও কাছে সে কিছুই চায় না। আবার তার পাওয়া উচিত এমন জিনিস তাকে স্বেচ্ছায় না দেওয়া হলেও অভিমানে গাল ফুলিয়ে রাখে। পেট ভর্তি তার গোসসার গুদাম।
আরহাম চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। সামনে পরীক্ষা, তাই সে এক রাতে পড়া প্রস্তুত করছিল। তখন বাবা বাজার থেকে ইয়া বড় একটি কেক নিয়ে হাজির হলো। কেক দেখেই আরহামের জিভে জল চলে এল। বাবা জিজ্ঞেস করল, ‘আরহাম, কেক খাবা?’ আরহাম চরম বিরক্তি নিয়ে অনেক কষ্টে জিভের জলের বাধা অতিক্রম করে বলে উঠল, ‘না। খাব না।’ বাবা বুঝে ফেলল–এই ‘না’ শব্দটি শুকনো ‘না’ নয়, জিভের জলে ভেজা ‘না’। বাবা মুচকি হেসে কেকটি আরহামের সামনে রেখে বলল, ‘খাও বাবা। তোমার জন্যই তো এনেছি। আমি মজা করছিলাম।’ এবার আরহাম কেকে হাত চালিয়ে দিল।
আজ আরহামের বাবা সত্যি মজা করে তাকে একথা জিজ্ঞেস করেছে। আসলে কোনো কিছু সাধার সময় তার বাবা-মা কখনো তাকে প্রশ্ন করে না। প্রশ্ন করলেই তার মাথা গরম হয়ে যায়। তখন মুখের ওপর না বলে দেয়। তাই সবসময় তার বাবা-মা কোনো কিছু সাধার সময় তার সামনে নাও, খাও শব্দ দুটিই শুধু উচ্চারণ করে।
অর্ধ-বার্ষিক পরীক্ষা শুরু হয়ে গেল। সব পরীক্ষা ভালোভাবেই শেষ হলো। কিন্তু গণিত পরীক্ষার দিন ক্লাসের সবাই হা-হুতাশ শুরু করে দিল। প্রশ্ন বেশ কঠিন হয়েছে। আরহামেরও চিবুক বেয়ে ঘাম ঝরছে। বন্ধুরা একে অপরের সহায়তা নিয়ে অঙ্ক সমাধান করছে। অন্যদিকে আরহাম বরাবরের মতো কারও দিকে না তাকিয়ে পরীক্ষা দিচ্ছে। তারও সহসায় চার-পাঁচটি অঙ্কে প্যাঁচ লেগে গেছে। কাউকে জিজ্ঞেস করতে পারলে সমাধান হয়ে যেত। কিন্তু তার খানদানি স্বভাব বলে কথা। ফেল করলেও কারও সাহায্য সে নেবে না। বন্ধুরা ভাবছে আরহাম ১০০-তে ১০০ নম্বর পাবে। ওর হয়তো সবই কমন পড়েছে। অনেকেই আরহামের কাছে সাহায্য চাচ্ছে। সে যথাসাধ্য সবাইকে সাহায্য করছে। কিন্তু কারও কাছ থেকে সাহায্য নেওয়ার পাত্র নয় সে।
পরীক্ষার পর থেকেই বন্ধুমহলের অন্যতম আলোচনা ছিল ‘এবার আরহাম গণিতে ১০০-তে ১০০ পাবে। এতগুলো কঠিন অঙ্ক সে একা সমাধান করল কীভাবে?’
আরও পড়ুন
এ ব্যাপারে আরহাম কিছু বলতে চাইলেও; সে কিছু বলার সুযোগই পেত না।
অবশেষে একদিন বন্ধুদের ভুল চরমভাবে ভেঙে গেল। গণিত স্যার পরীক্ষার মূল্যায়িত খাতাগুলো নিয়ে ক্লাসে প্রবেশ করলেন। উত্তেজনায় সবার বুকে ধপধপ করে হাতুড়ি পেটা শুরু হয়ে গেল।
প্রাপ্ত নম্বর ঘোষণা না করেই স্যার সবার হাতে স্ব-স্ব খাতা দিয়ে দিলেন। সবাই হাশরের ময়দানের মতো যে যার আমলনামা দেখায় ব্যস্ত। কিছুক্ষণ পর সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ল। সবাই ৭০ আর ৮০-এর মাঝামাঝি নম্বর পেয়েছে। গণিত স্যার বিষণ্ন মনে আরহামকে দাঁড় করিয়ে তার নম্বর জিজ্ঞেস করলেন। তার প্রাপ্ত নম্বর শুনে বন্ধুরা সবাই মুখ চাওয়া-চাওয়ি শুরু করে দিল। বন্ধুরা ভেবেছিল আরহাম এবার কেঁদে ফেলবে। কিন্তু আরহামের চোখে বিন্দুমাত্র জলও নেই। সে নম্রভাবে, তবে দৃঢ় গলায় বলল, ‘স্যার, আমি ওদের চেয়ে নম্বর কম পেয়েছি, এটা ঠিক। তবে যে ৬০ নম্বর পেয়েছি; তা আমি কারও সাহায্য ছাড়াই পেয়েছি। আমি এতেই খুশি।’
আরহামের জবাবে স্যার অনেক খুশি হলেন। স্যার সবাইকে তালি দিতে বললেন। আরহামের চোখ এবার জলে ভিজে উঠল। গণিত স্যার এবার তালি থামিয়ে বললেন, ‘আচ্ছা বাবা, শুধু নিজে খুশি হলেই হবে? আমাদের খুশি করতে হবে না? তুমি মেধা প্রমাণে কারও সাহায্য নাওনি, এটা অসাধারণ গুণ। এই গুণ আজীবন ধরে রাখবা। কিন্তু তুমি যে চারটি অঙ্ক ভুল করেছ তা খুবই তুচ্ছ কারণে। মানে তুমি অঙ্কগুলো ভালো করে না বুঝেও চুপ করে থেকেছ, ক্লাসে জিজ্ঞেস করোনি। এটা তোমার খুবই বাজে গুণ। মুখ ফুটে জানতে চাইতে হবে। শুধু বিদ্যার ক্ষেত্রে নয়; সব ক্ষেত্রেই অধিকার আদায় করে নিতে হবে। মুখ ফুটে তোমার প্রাপ্য জিনিস চাইতে হবে। প্রাপ্যতায় ব্যাঘাত ঘটলে প্রতিবাদ করতে হবে।’
গণিত স্যারের কথা শুনে আরহাম সুবোধ বালকের মতো মাথা নাড়ল।
