সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার ১১ নম্বর মধ্য জাফলং ইউনিয়নের বাংলাবাজার সংলগ্ন বালির হাওরে দিন-রাতে চলছে অবাধে বালু উত্তোলন। সরকারি নিয়মনীতি উপেক্ষা করে ইজারাবহির্ভূত স্থান থেকে ড্রেজার ও পরিবেশবিধ্বংসী শ্যালো মেশিন বসিয়ে নির্বিচারে কোটি-কোটি টাকার বালু লুটপাট হচ্ছে। এতে একদিকে সরকার হারাচ্ছে বিপুল রাজস্ব, অন্যদিকে নদীভাঙনে বিলীন হচ্ছে ফসলি জমি ও নদীতীরবর্তী বসতভিটা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বালির হাওরে দিনে কিছুটা আড়ালে থাকলেও রাত নামলেই শুরু হয় বালু উত্তোলনের তাণ্ডব। শত শত শ্যালো নৌকা ও ড্রেজারের বিকট শব্দে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন আশপাশের এলাকার বাসিন্দারা। হাওরের পাড় কেটে গভীর গর্ত করে বালু উত্তোলনের কারণে ধসে পড়ছে বিস্তীর্ণ কৃষিজমি।
স্থানীয় কৃষকেরা জানান, একসময় এসব পলিযুক্ত জমিতে তরমুজ, মরিচ, বাদামসহ বিভিন্ন উচ্চমূল্যের ফসলের ভালো ফলন হতো। কিন্তু অপরিকল্পিতভাবে বালু তোলার কারণে অনেক জমি ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। কোথাও কোথাও কৃষিজমির জায়গায় সৃষ্টি হয়েছে বিশাল গর্ত ও জলাশয়। ফলে কৃষিনির্ভর পরিবারগুলো পড়েছে চরম বিপাকে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, জাফলংয়ের ‘ছুটোখেল খালের মুখ’ হিসেবে পরিচিত বালির হাওর এলাকায় রাতের বেলায় বালু উত্তোলনকারীদের তৎপরতা বেড়ে যায়। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী একটি চক্রের ছত্রচ্ছায়ায় দীর্ঘদিন ধরে এই কার্যক্রম চলছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, দিনের বেলায় প্রশাসনের অভিযান কিংবা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হলেও রাতের বেলায় হাওরের বিস্তীর্ণ এলাকায় কার্যকর নজরদারি থাকে না। আর সেই সুযোগেই ড্রেজার ও শ্যালো মেশিন নামিয়ে বালু তুলে নেওয়া হচ্ছে।
তাদের দাবি, এভাবে চলতে থাকলে শুধু কৃষিজমি নয়, নদীতীরবর্তী বহু বসতবাড়িও ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়বে। একই সঙ্গে নষ্ট হবে এলাকার প্রাকৃতিক ভারসাম্য।
গোয়াইনঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ওমর ফারুক মন্ডল বলেন, অবৈধ বালু ও পাথর উত্তোলন বন্ধে উপজেলা প্রশাসনকে সার্বিক আইনগত সহায়তা দিচ্ছে পুলিশ। রাতের আঁধারে যারা এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত, সোর্সের তথ্যের ভিত্তিতে তাদের চিহ্নিত করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘অপরাধী কিংবা সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।’
গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রতন কুমার অধিকারী বলেন, বালির হাওরসহ উপজেলার কোথাও অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করতে দেওয়া হবে না। ইতোমধ্যে সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর নেতৃত্বে কয়েকটি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে জরিমানা এবং অবৈধ মেশিন বিনষ্ট করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, পরিবেশ রক্ষায় শিগগিরই পুলিশ ও বিজিবিসহ সংশ্লিষ্টদের সমন্বয়ে টাস্কফোর্সের মাধ্যমে কঠোর ও সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করা হবে।
এদিকে বালির হাওরে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে স্থায়ী নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল ও পরিবেশবাদীরা। তাদের মতে, বিচ্ছিন্ন অভিযান চালিয়ে দীর্ঘমেয়াদে বালু লুট বন্ধ করা সম্ভব নয়। রাতের বেলায় নিয়মিত টহল ও অভিযান নিশ্চিত করতে স্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন অথবা বিজিবির সার্বক্ষণিক টহল জোরদার করা প্রয়োজন।
তাদের দাবি, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে জাফলংয়ের বালির হাওরে একদিকে যেমন কৃষিজমি হারিয়ে যাবে, অন্যদিকে নদীভাঙনে বাস্তুচ্যুত হতে পারেন বহু পরিবার। তাই প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার পাশাপাশি কৃষিজমি ও বসতভিটা রক্ষায় এখনই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
