ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার মধ্যে রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানির পরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে সমালোচনা বাড়ছে।
রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট উভয় দলের কয়েকজন আইনপ্রণেতা এ উদ্যোগকে মার্কিন আইনের লঙ্ঘন বলে দাবি করেছেন। তাদের মতে, ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া রাশিয়াকে এভাবে আর্থিক সুবিধা দেওয়ার সুযোগ নেই। ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা বিবিসির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।
এর আগে গত শুক্রবার ট্রাম্প ঘোষণা করেন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন অবিলম্বে যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্ববাজারের জন্য তিন লাখ টন ডিজেল সরবরাহে সম্মত হয়েছেন। এরপর নভেম্বরে আরও পাঁচ লাখ টন এবং পরবর্তী সময়ে আরও ১০ লাখ টন ডিজেল সরবরাহ করা হবে। এ ছাড়া রাশিয়ার শোধনাগারগুলোর পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে অল্প সময়ের মধ্যে আরও ৩০ লাখ টন ডিজেল সরবরাহ করা হতে পারে।
রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা তাসকে দেওয়া বক্তব্যে দেশটির উপপ্রধানমন্ত্রী আলেকজান্ডার নোভাকও এ পরিমাণের কথা নিশ্চিত করেছেন। ভবিষ্যতে রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানির পরিমাণ মাসে ৩০ লাখ টনে পৌঁছাতে পারে বলেও জানান তিনি।
ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, ‘আমেরিকানদের জন্য, বিশেষ করে আমাদের কৃষক, খামারমালিক ও ট্রাকচালকদের জন্য জ্বালানির দাম কমানোই আমার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।’
তবে এ উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, কারণ কয়েক সপ্তাহ আগেই রাশিয়ার তেল ও গ্যাস আমদানিকারী দেশগুলোর বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দিতে একটি আইনে স্বাক্ষর করেছিলেন ট্রাম্প।
আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ আইনপ্রণেতাদের
রোববার চার রিপাবলিকান ও তিন ডেমোক্র্যাট সিনেটর ট্রাম্পের পরিকল্পনার বিরোধিতা করে তাকে সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।
এক যৌথ বিবৃতিতে তারা বলেন, ‘রাশিয়া যখন ইউক্রেনের বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা অব্যাহত রেখেছে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের উচিত নয় পুতিনকে আর্থিকভাবে টিকে থাকার সুযোগ করে দেওয়া।’
আইনপ্রণেতারা আরও বলেন, পুতিনের ইউক্রেনবিরোধী যুদ্ধের অর্থায়নে মার্কিন অর্থ যেন ব্যবহার না হয়, সে জন্য ২০২২ সালে কংগ্রেস রাশিয়ার জ্বালানি আমদানি স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করেছিল।
বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্স, লিসা মারকাউস্কি, থম টিলিস ও জন কার্টিস এবং ডেমোক্র্যাট সিনেটর জিন শাহিন, রিচার্ড ব্লুমেনথাল ও রন ওয়াইডেন।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও এ চুক্তির সমালোচনা করেছেন। তার ভাষায়, এ উদ্যোগ পুতিনকে উপহার দেওয়ার শামিল এবং এটি এমন একটি যুদ্ধে বিনিয়োগ, যে যুদ্ধের অবসান হওয়া প্রয়োজন।
তবে সবাই এ পরিকল্পনার বিরোধিতা করছেন না। রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা থমাস ম্যাসি সব ধরনের পেট্রোলিয়াম পণ্যের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ফক্স নিউজকে বলেছেন, জ্বালানির দাম কমাতে বিদ্যমান আইনি ব্যবস্থার মধ্য দিয়েই এ চুক্তি কার্যকর করা হবে। কংগ্রেসের যেসব সদস্য বলছেন, এটি আইনসম্মত নয়, তারা ভুল করছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
চুক্তির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় ৭ এপ্রিল পর্যন্ত রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা স্থগিত রাখছে বলে জানা গেছে। তবে মার্কিন ব্যাংকগুলোতে থাকা রাশিয়ার অন্যান্য সম্পদের ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে চাপে ট্রাম্প
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়েছে। সংঘাতের কারণে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ায় পেট্রল ও ডিজেলের বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে।
আগামী মাসে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এ নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ রিপাবলিকান পার্টির হাতে থাকবে কি না, তা নির্ধারিত হবে। এর আগে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা গেছে, অর্থনীতি ও ইরান যুদ্ধ সামলানোর ক্ষেত্রে ট্রাম্পের ভূমিকা নিয়ে অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক অসন্তুষ্ট। এ পরিস্থিতিতে জ্বালানির দাম কমিয়ে রাজনৈতিক চাপ মোকাবিলার চেষ্টা করছেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিনির্ভর অঙ্গরাজ্যগুলোতে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব বিশেষভাবে অনুভূত হচ্ছে। কৃষিযন্ত্র চালানো এবং উৎপাদিত পণ্য বাজারে পরিবহনের জন্য এসব অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ ডিজেল প্রয়োজন।
আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের (এএএ) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন ডিজেলের গড় দাম ৬ দশমিক ২৮ ডলার। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে রেকর্ড ৬ দশমিক ৫৩ ডলারে পৌঁছানোর পর দাম কিছুটা কমেছে।
তবে বিশ্লেষকেরা প্রশ্ন তুলেছেন, রাশিয়া আদৌ প্রতিশ্রুত পরিমাণ ডিজেল সরবরাহ করতে পারবে কি না এবং এই সরবরাহ মার্কিন ভোক্তাদের জন্য জ্বালানির দাম কতটা কমাতে পারবে।
যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিদিন প্রায় ৩৬ লাখ ব্যারেল ডিজেল ব্যবহৃত হয়। ফলে রাশিয়া চলতি মাসে প্রতিশ্রুত তিন লাখ টন ডিজেল সরবরাহ করলেও তা যুক্তরাষ্ট্রের এক দিনের মোট চাহিদার প্রায় অর্ধেকের সমপরিমাণ হবে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়েও সমালোচনা
রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানির পরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরেও সমালোচনা হচ্ছে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এবং যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিংসহ কয়েকজন আন্তর্জাতিক নেতা এ উদ্যোগের বিরোধিতা করেছেন।
ওয়েস স্ট্রিটিং বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউক্রেনের মিত্রদের উচিত যুদ্ধ বন্ধে রাশিয়ার ওপর চাপ আরও বাড়ানো।
এদিকে রোববার ট্রাম্প ঘোষণা করেন, রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে ‘জ্বালানি যুদ্ধবিরতি’ হয়েছে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি। জেলেনস্কি এ ঘোষণাকে স্বাগত জানালেও মস্কোর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
