থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে শেষ হয়েছে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ২০২৬ সালের বার্ষিক সম্মেলন। ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর অনুষ্ঠিত এ শীর্ষ সম্মেলন থেকে বৈশ্বিক অর্থায়ন, কর্মসংস্থান ও বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির নতুন রূপরেখা সামনে এসেছে। পাশাপাশি বাংলাদেশে ব্যাংক খাতের চরম অনিয়ম, খেলাপি ঋণের পাহাড়, কর-জিডিপি অনুপাতের তলানি অবস্থার মধ্যে সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলারের নতুন ঋণপ্রস্তাব পর্যালোচনা করতে গিয়ে বাংলাদেশের সামনে
কঠোর সংস্কারের শর্ত ছুড়ে দিয়েছে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা দুটি। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, জনগণের ম্যান্ডেট ও বাস্তব অর্থনৈতিক সক্ষমতা বিবেচনায় ঋণদাতার কঠোর শর্তগুলো ‘একসঙ্গে’ না চাপিয়ে ‘ধাপে ধাপে’ বাস্তবায়নের কৌশল গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জ্বালানি সংকট, রাজস্ব সংস্কার, ব্যাংক সংস্কার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে না পারলে সামনে কঠিন সময় মোকাবিলা করতে হবে। শুধু দাতাসংস্থার ঋণের ওপর ভরসা করে প্রবৃদ্ধি বাড়ানো যাবে না।
সূত্র বলছে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলন থেকে বাংলাদেশের জন্য অর্থায়নের সম্ভাবনা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার আশ্বাস মিলেছে। তবে নতুন ঋণচুক্তি কিংবা প্রস্তাবিত অর্থছাড়ের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। আইএমএফের কাছে নতুন কর্মসূচির আওতায় ৪৫০ কোটি ডলার ঋণ চেয়েছে বাংলাদেশ। অন্যদিকে আগামী তিন বছরে বিশ্বব্যাংকের কাছে নিয়মিত সহায়তার বাইরে আরও ১০ বিলিয়ন ডলার অর্থায়ন চাওয়া হয়েছে। দুই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা এগোলেও অর্থ পেতে এখন শর্ত চূড়ান্ত করা, সংস্কার বাস্তবায়ন এবং প্রকল্পের কার্যকারিতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
আইএমএফের কাছে ৪৫০ কোটি ডলারের ঋণপ্রস্তাব : নতুন ঋণ কর্মসূচির আওতায় ২০২৬ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয়টি কিস্তিতে প্রায় ৪৫০ কোটি ডলার পাওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। তবে ঋণের চূড়ান্ত পরিমাণ, শর্ত ও কিস্তির সময়সূচি এখনো নির্ধারিত হয়নি। বছরের শেষ নাগাদ চুক্তিতে পৌঁছানোর আশা করছে সরকার। এ লক্ষ্যে চলতি মাসের শেষ দিকে আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদলের বাংলাদেশ সফরের সম্ভাবনা রয়েছে। সফরে ঋণের শর্ত ও সংস্কার কর্মসূচি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার কথা।
ব্যাংককে আইএমএফের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক নাইজেল ক্লার্কের সঙ্গে বৈঠকের পর অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, আলোচনায় নীতিগতভাবে অগ্রগতি হয়েছে। বাকি বিষয়গুলো চূড়ান্ত করতে দুই পক্ষের প্রতিনিধিদল পরবর্তী দুই থেকে তিন সপ্তাহ ধরে বিস্তারিত আলোচনা করবে। তবে এ অগ্রগতিকে চূড়ান্ত ঋণ অনুমোদন বা অর্থছাড় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের চার কঠিন শর্ত : আগেই ঋণ পেতে বাংলাদেশের সামনে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের চার কঠিন শর্ত দিয়েছে। আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে, কোনো প্রকার দৃশ্যমান ও মৌলিক সংস্কার ব্যতিরেকে ঋণের অর্থছাড় সম্ভব নয়। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ৪টি প্রধান কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি করা হয়েছে। যেমন কর ও রাজস্ব সংস্কার, কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো, এনবিআরের সংস্কার ও করের আওতা সম্প্রসারণ, ২০২৭ সালের মধ্যে কর অব্যাহতি যৌক্তিকীকরণ অন্যতম। এ ছাড়া ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনা, দুর্বল ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি পূরণ ও একীভূতকরণ/পুনর্গঠন করা, ব্যাংকগুলোর মূলধন ও তারল্য সংকট কাটানোর বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ। আরও চাপ রয়েছে ব্যাংকিং খাত পুনর্গঠন; বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও গ্যাসে ধাপে ধাপে ভর্তুকি প্রত্যাহার; স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে বিশ্ববাজারের সঙ্গে জ্বালানির দাম সমন্বয়; সামষ্টিক স্থিতিশীলতা; মূল্যস্ফীতি হ্রাস ও রিজার্ভ শক্তিশালীকরণে। একই সঙ্গে বিনিময় হারে নমনীয়তা ও বাজারভিত্তিক ব্যবস্থা জোরদার, উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির কঠোর সমন্বয় বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত : সম্মেলনের প্রাপ্তি ও বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের চাপের আলোকে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাংলাদেশকে ঋণনির্ভরতা কাটিয়ে কাঠামোগত অভ্যন্তরীণ সংস্কারে মনোযোগ দিতে হবে। ডিজিটালাইজেশন ও ক্যাশ ট্রানজেকশন হ্রাস, কর ফাঁকি ও অসাধু সিন্ডিকেট ভাঙতে ডিবিসি (ডকুমেন্ট ভেরিফিকেশন সিস্টেম) শতভাগ নিখুঁতভাবে প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে এবং ক্যাশ ট্রানজেকশন কমিয়ে ডিজিটাল লেনদেনের আওতা বাড়াতে হবে। জ্বালানি বা সুদের হার বাড়ানোর মাধ্যমে একতরফা জনগণের ওপর বোঝা না চাপিয়ে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া করের আওতা বাড়াতে হবে। জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংকের ঋণ কেবল সাময়িক স্বস্তি বা সময় ক্রয়ের হাতিয়ার হতে পারে, কিন্তু ব্যাংক খাত ও রাজস্ব ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি পচন ঠেকাতে ‘সুশাসন’ ও ‘কঠোর অর্থনৈতিক সংস্কার’-এর কোনো বিকল্প নেই। সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানে বিদেশি কোম্পানি দিয়ে উত্তোলন করার সিদ্ধান্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে নিতে হবে। আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা প্রায় ৩০ হাজার মেগাওয়াট। উৎপাদন করতে পারছে ১৭ থেকে ১৮ হাজার মেগাওয়াট। তেল-গ্যাসের সংকটের কারণে সম্ভব হচ্ছে না। আইএমএফ বিশ্বব্যাংক থেকে ঋণের ওপর ভরসা করে প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। রাজস্ব ঘাটতি থাকলে বিশ্বব্যাংকের ঋণ নিলে শেষ পর্যন্ত জনগণের ওপর চাপ বৃদ্ধি করবে। অর্থনীতি সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক আইনুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে ৬ কোটি লোক দারিদ্র্যসীমার মধ্যে। আরও প্রায় ২ কোটি মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার মধ্যে আসতে পারে। মূল্যস্ফীতি যেভাবে চোখ রাঙাচ্ছে তাতে ভর্তুকি কমালে জনগণেরও ওপর আরও চাপ বাড়বে। তাই যে শর্তে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক থেকে ঋণ দিতে চাইছে, বাংলাদেশ তা বাস্তবায়ন করতে গেলে আরও সংকট তৈরি হতে পারে। তাই বাংলাদেশকে আরও আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
