আদালতের নির্দেশনা ও সরকারি সিদ্ধান্ত থাকা সত্ত্বেও দাপটে চলছে ব্যাটারিচালিত রিকশা। প্রতিদিন অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশার বিরুদ্ধে নগরের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান, আটক ও মামলা অব্যাহত রয়েছে। ডাম্পিং স্টেশনগুলোও ব্যাটারি রিকশায় ঠাসা। ট্রাফিক পুলিশের এমন দাবির প্রেক্ষিতে নগরজুড়ে বেড়েই চলেছে ব্যাটারিচালিত রিকশার দৌরাত্ম্য। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত অলিগলি থেকে এখন মূল সড়ক সবখানেই এখন ব্যাটারি রিকশার দাপট। কোথাও কোথাও আবার অবৈধ স্ট্যান্ডও গড়ে তোলা হয়েছে। সেখানে নিয়মিত তোলা হচ্ছে টাকা। ব্যাটারি রিকশার বেপরোয়া চলাচলে বাড়ছে যানজট। পথচারীদের চলাচলে তৈরি হয়েছে রীতিমত ঝুঁকি ও আতঙ্ক। এছাড়া ঘটছে দুর্ঘটনাও।
এদিকে অবৈধ এসব ব্যাটারি রিকশার অবাধ চলাচলে সড়কের পাশাপাশি বিদ্যুৎ সরবরাহেও চাপ তৈরি করেছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন এলাকায় চার্জিং স্টেশনের সংখ্যা বেড়েছে বলেও জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য বলছে, নগরে ৫০ হাজারের বেশি ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করছে। প্রতিটি রিকশা দিনে গড়ে প্রায় ৮ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে। সেই হিসেবে ৫০ হাজার রিকশা প্রতিদিন ঘিলছে ৪ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ। এতে ব্যাটারিচালিত রিকশা বিদ্যুৎ সরবরাহে নতুন চাপ তৈরি করেছে।
ট্রাফিক পুলিশের দাবি, প্রতিদিন ব্যাটারি রিকশার বিরুদ্ধে অভিযান চলমান রয়েছে। মূল সড়কে আসলেই মামলা দিয়ে আটক করে ডাম্পিংয়ে পাঠানো হচ্ছে। তবে ব্যাটারি রিকশা আটক করতে গিয়ে হামলার শিকার হচ্ছেন পুলিশ সদস্যরা।
প্রশ্ন উঠেছে, এতকিছুর পরও ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণে আসছে না কেন?
ট্রাফিক পুলিশের তথ্য মতে, গত দেড় বছরে ব্যাটারি রিকশার বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযানে ১৩ পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। এর মধ্যে আহত একজনের মাথায় পড়েছে ১০ সেলাই। এছাড়া একজন নিহত হয়েছেন।
এদিকে মূল সড়কে অভিযান চললেও অলিগুলিতে না থাকার সুযোগে প্রতিদিন বাড়ছে অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা। অনেক এলাকায় গড়ে উঠেছে অবৈধ চার্জিং স্টেশন। কোনো কোনো এলাকায় সড়ক দখল করে স্ট্যান্ড গড়ে তোলা হয়েছে। স্বেচ্ছাসেবকের মাধ্যমে এসব নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। আদায় করা হচ্ছে টাকা। অলিগলির ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক ও থানা পুলিশ একে অপরের ওপর দোষ চাপিয়ে দায় সারছেন।
নগরবাসির দাবি, বর্তমান সময়ে ট্রাফিক পুলিশের অভিযান ঢিলেঢালা হয়ে পড়েছে। ফলে এখন দিন-রাত মূল সড়কেও চলাচলে করছে ব্যাটারিচালিত রিকশা।
অভিযোগ রয়েছে, ট্রাফিক পুলিশের সামনে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করলেও তা এড়িয়ে যাওয়া হয়। অবৈধ ব্যাটারি রিকশা নিয়ে বাণিজ্য চলছে। স্থানীয় রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় এসব রিকশা নির্বিঘ্নে চলাচল করছে। রিকশা আটক করা হলেও কিছুদিন পর জরিমানা দিয়ে আবার সড়কে চলছে। এতে স্থায়ী কোনো সুফল মিলছে না। ফলে বন্দর নগরী এখন দিনে দিনে ব্যাটারিচালিত রিকশার নগরীত পরিণত হচ্ছে।
সরেজমিন দেখা গেছে, নগরের চকবাজার, পশ্চিম ও পূর্ব বাকলিয়া, নবাব সিরাজউদ্দৌল্লা রোড, কলেজ রোড, দিদার মার্কেট আন্দরকিল্লা, টেরীবাজার, চেরাগী পাহাড়, জামালখান, কাজির দেউড়ি, লালদীঘি, কোতোয়ালী, পাথরঘাটা, রিয়াজউদ্দিন বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় অবাধে চলছে অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশা। এমনকি ট্রাফিক পুলিশ ও সার্জেন্টের সামনেও চালিয়ে যেতে চোখে পড়েছে। যেখানে-সেখানে দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠানামা করছে ইচ্ছেমত। চালকদের অধিকাংশ কিশোর ও তরুণ। অনেকে আবার মাদকাসক্ত। এছাড়া নারী ও শারীরিক প্রতিবন্ধীরাও এসব অবৈধ গাড়ির চালক বনে যাচ্ছেন। একাধিকজনের রিকশার সামনে চোখে পড়েছে ‘শারীরিক প্রতিবন্ধী’ লেখা কাগজ।
সরেজমিন আরও দেখা গেছে, নগরের পশ্চিম বাকলিয়া ফুলতলা ও রাহাত্তারপুল এলাকায় অবৈধ ব্যাটারি রিকশার স্ট্যান্ড গড়ে তোলা হয়েছে। উঠানামা ভাড়া ১০ টাকা। সেখানে স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে প্রতি গাড়ি থেকে ২০ টাকা করে আদায় করা হচ্ছে প্রতিদিন। দৈনিক দুইশত গাড়ির বেশি চলাচল করছে ফুলতলা ব্রিজ থেকে রাহাত্তারপুল।
এছাড়া টেরীবাজার এলাকায়ও নিয়ন্ত্রণহীন ব্যাটারিচালিত রিকশা। শারদীয় দুর্গাপূজার সময় এসব রিকশা নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক বিভাগকে চিঠি দিয়ে ব্যবস্থার নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছিল টেরীবাজার ব্যবসায়ী সমিতি। কিন্তু পূজার সময়ও এসব রিকশা অবাধে চলতে দেখা গেছে।
অন্যদিকে জামালখান এলাকা ভোর ৬টা থেকে থাকে ব্যাটারি রিকশার নিয়ন্ত্রণে। এতে আতঙ্ক নিয়ে পথ চলতে হয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের। স্কুলের গেটে যাত্রী আনা-নেওয়ার পর জটল করে দাঁড়িয়ে থাকে ইচ্ছেমত। এতে সৃষ্টি হয় যানজট। এসময় হরণের শব্দে পরিবেশ ও কান ভারি হয়ে উঠে।
চকবাজার এলাকার বাসিন্দা ও বেসরকারি চাকরিজীবি কাঞ্চন সুশীল বলেন, ‘প্রতিদিন বাসা থেকে আতঙ্ক নিয়ে বের হতে হয়। অসংখ্য ব্যাটারিচালিত রিকশা। বেপরোয়া চলাচলে প্রতিদিন দুর্ঘটনা ঘটছে। আবার নতুন নতুন রিকশা যুক্ত হচ্ছে লাইনে। এলাকায় বেড়েছে যানজট। ১০ মিনিটের পথ যেতে লাগছে আধা ঘণ্টার বেশি। মাননীয় পুলিশ কমিশনার কাছে গিয়ে সরাসারি গিয়ে অভিযোগ করেছি। তিনি থানা-পুলিশ ও ট্রাফিক বিভাগকে ব্যবস্থা নিতে বলেছিলেন। কিন্তু ফলাফল শূন্য। থানা-ট্রাফিক পুলিশও অদৃশ্য কারণে নীরব।
জামালখান এলাকার বাসিন্দা সৌরভ চৌধুরী বলেন, ‘ব্যাটারি রিকশার কারণে হেঁটে চলাচল করায় এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। ভোর থেকে স্কুল গেটের সামনে থাকে রিকশার জটলা। এছাড়া সন্ধ্যা থেকে আরও বাড়তে থাকে। শারদীয় দুর্গাপূজাতেও সড়কজুড়ে ছিল ব্যাটারিচালিত রিকশার দাপট। পূজামণ্ডপের সামনে তারা জটলা করিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত। হয়ত বড় কোনো দুর্ঘটনার পর প্রশাসনের টনক নড়বে।’
টেরীবাজার এলাকার বাসিন্দা মো. ফয়সাল বলেন, ‘ব্যাটারিচালিত রিকশা এতটাই নিয়ন্ত্রণহীন যে হাটাচলায় কঠিন হয়ে পড়েছে। অভিযোগ করেও কোনো সুফল নেই। মাঝেমধ্যে লোকদেখানো অভিযান চলে। পরে যে লাউ সেই কদুতে পরিণত হয়।’
এদিকে নগরে ব্যাটারিচালিত রিকশার বিরুদ্ধে অভিযান, আটক সবই চলছে। তবু সড়কজুড়ে ব্যাটারিচালিত রিকশার যেন কমতি নেই। মনসুরাবাদ ও সদরঘাট ডাম্পিং স্টেশন জব্দ করা ব্যাটারিচালিত রিকশায় ভরপুর।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ট্রাফিক পুলিশের সার্জেন্ট জানান, আগে ব্যাটারি রিকশার সরঞ্জাম আমদানি বন্ধ করতে হবে। আমদানি বন্ধ না করে টানা অভিযানেও সুফল মিলবে না। প্রতিদিন এখন নতুন নতুন ব্যাটারি রিকশা দেখা যাচ্ছে। এসব গাড়ির কোনো লাইসেন্স এবং চালকদের কোনো প্রশিক্ষণ নেই। ফলে নিজেদের ইচ্ছেমত গাড়ি চালিয়ে যানজট ও দুর্ভোগ সৃষ্টি করছে। বেপরোয়াভাবে চালিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে।
এসব বিষয়ে জানতে সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) হোসাইন মোহাম্মদ কবির ভূঁইয়ার মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
পরে সিএমপির ডিসি (ট্রাফিক-দক্ষিণ) মোহাম্মদ লিয়াকত আলী খানের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি সুপ্রভাতকে বলেন, ‘দুর্গাপূজা ও প্রধানমন্ত্রীর আগমনসহ শত ব্যস্ততার মধ্যেও ব্যাটারি রিকশা নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেছি।’
তিনি বলেন, ‘আপনারা হাইলাইটস করবেন আমাদের চেষ্টাটা। এই সমাজের সবাই মিলে জঞ্জাল এবং এইসব জিনিস ইমপোর্ট করে রাস্তার মধ্যে ছড়ায় দিবে আর জঞ্জাল পরিষ্কারের দায়িত্ব একমাত্র পুলিশকে দিয়ে দিবে।’
প্রতিবেদকের প্রশ্নে কষ্ট পাওয়ার কথা জানিয়ে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘ব্যাটারিচালিত রিকশা আটক করতে গিয়ে গত দেড় বছরে আমার ১৩ জন পুলিশ সদস আহত এবং একজন নিহত হয়েছেন। আহত একজনের মাথায় ১০টা সেলাই পড়েছে। নিহতের মাথার খুলি উড়ে গেছে। এই জিনিসটুকু একটু খেয়াল করবেন। আমরা কি পরিমাণ চেষ্টাটা করছি।’
তিনি আরও বলেন, দিনশেষে আপনি আমার কাছ থেকে রিপোর্ট নেবেন আমরা প্রতিদিন কয়টা ব্যাটারিচালিত রিকশা আটক করেছি। চারটা ডিভিশন মিলে কয়টা ধরেছি। আমরা প্রতিদিন ও প্রতিনিয়তিই ধরছি।’ তিনি রাস্তায় আছেন জানিয়ে বিস্তারিত জানতে অফিসে যেতে বলে ফোনকল কেটে দেন।
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য মতে, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান মিলিয়ে দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট। এর মধ্যে চট্টগ্রাম নগরে গড়ে প্রায় ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহার হয়।
জানতে চাইলে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের দক্ষিণাঞ্চলের (চট্টগ্রাম) প্রধান প্রকৌশলী মো. কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘অবৈধ লাইনের মাধ্যমে ব্যাটারি রিকশা চার্জ করা গুরুতর অপরাধ। কেউ যদি অনুমোদিত চার্জিং স্টেশন স্থাপন করে, তাহলে নির্ধারিত ট্যারিফে বিদ্যুৎ দেওয়া সম্ভব। এছাড়া অন্যসব অবৈধ।
সুপ্রভাত/এনএস/আরবি
The post নগরজুড়ে ব্যাটারি রিকশার দৌরাত্ম্য appeared first on সুপ্রভাত বাংলাদেশ.
