সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা–বাণিজ্য, জ্ঞানচর্চা, মানবিক সহযোগিতা ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির অন্যতম হাতিয়ার। প্রবাসে থাকা প্রিয়জনের সঙ্গে যোগাযোগ, অসহায় মানুষের চিকিৎসায় সহায়তা সংগ্রহ কিংবা দুর্যোগের সময়ে জরুরি তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রেও এর ভূমিকা অনস্বীকার্য। সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে এই মাধ্যম মানুষের মধ্যে দূরত্ব কমিয়ে পারস্পরিক সম্পর্ক ও সমপ্রীতির বন্ধন সুদৃঢ় করতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যে প্রযুক্তি মানুষের কল্যাণের জন্য তৈরি, সেই প্রযুক্তিই কেন কখনো অশান্তি ও বিভেদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়?
এর প্রধান কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার। গুজব ছড়ানো, যাচাইবিহীন তথ্য প্রচার, ব্যক্তিগত আক্রমণ, নারীর ছবি বা ভিডিও অনুমতি ছাড়া প্রকাশ, সাইবার হয়রানি এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়ে অপতথ্য ছড়ানোর মতো ঘটনা ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। একটি মিথ্যা তথ্য মুহূর্তেই হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে গিয়ে কারও সম্মানহানি, পারিবারিক অশান্তি কিংবা সামাজিক বিভেদের কারণ হতে পারে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কখনো অন্যের মর্যাদা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ক্ষুণ্ন করার অধিকার দেয় না। আমরা অনেক সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের প্রতি ভালোবাসা ও সহমর্মিতা প্রকাশ করি অথচ বাস্তব জীবনে বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে ভুলে যাই। ভার্চ্যুয়াল জগতে অসংখ্য বন্ধু থাকা মানেই মানবিক সম্পর্কের গভীরতা থাকা নয়। প্রকৃত মানবিকতা প্রকাশ পায় অন্যের সুখ–দুঃখ উপলব্ধি করা, মতপার্থক্য সত্ত্বেও শ্রদ্ধাশীল থাকা এবং প্রয়োজনে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে আমাদের আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। কোনো সংবাদ যাচাই না করে শেয়ার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। অন্যের মতামতকে সম্মান করতে হবে এবং ব্যক্তিগত বিরোধকে অপপ্রচার কিংবা হয়রানির মাধ্যমে প্রকাশ করা যাবে না। একই সঙ্গে ইতিবাচক সংবাদ, শিক্ষামূলক তথ্য ও মানবিক উদ্যোগ ছড়িয়ে দিয়ে এই মাধ্যমকে সমাজের কল্যাণে কাজে লাগাতে হবে। পরিশেষে বলা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিজে ভালো কিংবা মন্দ নয়, এর ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রভাব নির্ভর করে আমাদের ব্যবহার ও উদ্দেশ্যের ওপর। যে মানুষ তার জ্ঞান ও মেধা দিয়ে বিজ্ঞানের বিস্ময়কর আবিষ্কার করেছে, সেই মানুষেরই দায়িত্ব এসব আবিষ্কারকে মানবকল্যাণে ব্যবহার করা।
আসুন– আমরা গুজব নয় সত্য প্রচার করি, বিদ্বেষ নয় ভালোবাসা ছড়িয়ে দিই, বিভেদ নয় সমপ্রীতির বন্ধন গড়ে তুলি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যক্তিগত আক্রোশের হাতিয়ার না বানিয়ে পারস্পরিক সৌহার্দ্য, মানবিকতা ও শান্তিপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করি।

