শ্রীপর্ণা পোদ্দার এবং শুভাঙ্গী রায়।
Published on
:
2 min read
ছোটবেলার বন্ধু দু’জনে। প্রতি বছর পুজোয় একসঙ্গে ঘুরতে বেরোন তাঁরা। এ বছরও কলকাতায় দুগ্গাঠাকুর দেখতে এসেছিলেন। শনিবার তাঁরা গিয়েছিলেন চোরাবাগান সর্বজনীনে। সেখানেই ছোটবেলার বন্ধুকে হারিয়ে ফেললেন বৈদ্যবাটির শুভাঙ্গী রায়।
চোরবাগান বিপর্যয়ে বৈদ্যবাটির মালির বাগানের বাসিন্দা শ্রীপর্ণা পোদ্দারের মৃত্যু হয়েছে। শ্রীপর্ণা এবং শুভাঙ্গী ক্লাস এইট থেকে একসঙ্গে পড়াশোনা করেছেন বৈদ্যবাটির সুরেন্দ্রনাথ বালিকা বিদ্যালয়ে। শুভাঙ্গী এখন তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থায় কর্মরত। আর শ্রীপর্ণা একটি বেসরকারি হাসপাতালে কাজ করতেন। দু’জনেরই অফিস নিউ টাউনে। প্রায়ই শুভাঙ্গীর বাড়িতে আসতে শ্রীপর্ণা। গল্প করতেন। এমন বন্ধুকে হারিয়ে স্বাভাবিক ভাবেই বিধ্বস্ত শুভাঙ্গী। নিজে ঘরে ফিরেছেন বটে। কিন্তু শোকে-আতঙ্কে এমন অবস্থা যে, কথা বলার শক্তিটুকুও নেই তরুণীর!
শনিবার সকালে শুভাঙ্গী এবং শ্রীপর্ণারা মোট আট জন গিয়েছিলেন ঠাকুর দেখতে। সারাদিন ঘোরাঘুরির পর সন্ধ্যায় তাঁরা পৌঁছন চোরবাগানে। সেখানে একটি রেস্তোরাঁয় খাওয়াদাওয়া করেন। তার পরে চার জন চলে যান টালা পার্কের ঠাকুর দেখতে। আর শুভাঙ্গী-শ্রীপর্ণারা যান চোরবাগান সর্বজনীনে। সেই সময়ে তাঁদের সঙ্গে তাঁদের বন্ধু ঋষি এবং দোয়েল ছিলেন। সামনেই তাঁদের বিয়ে। বিয়ের নিমন্ত্রণ করতেই হায়দরাবাদ থেকে বৈদ্যবাটিতে ফিরেছেন ঋষি। চোরবাগানে শুভাঙ্গী-শ্রীপর্ণা একটু এগিয়ে গিয়েছিলেন। আগে মণ্ডপে প্রবেশ করেছিলেন। ঋষি-দোয়েল একটু পিছনে ছিলেন। সেই সময়েই মণ্ডপে হুড়োহুড়ি লেগে পদপিষ্টের ঘটনা ঘটে।
শুভাঙ্গীর বাবা শোভন রায় জানান, চোরবাগানের মণ্ডপের ভিতরে প্রবেশ করে শুভাঙ্গী-শ্রীপর্ণার ঠাকুর দেখা হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ঠিক বেরোনোর সময়ে হুড়োহুড়ি শুরু হয়। কয়েক জন নীচে পড়ে যান। শুভাঙ্গীর ঠিক পিছনেই ছিলেন শ্রীপর্ণা। শুভাঙ্গী পড়ে গেলে তাঁকে হাত ধরে টেনে সরিয়ে নেন দু’জন। তার পরেই ভিড়ের ধাক্কায় মাটিতে পড়ে যান শ্রীপর্ণা। তার পরে আর তাঁকে দেখতেই পাননি শুভাঙ্গী। সব ঘটে যাওয়ার পরে যখন বন্ধুকে খুঁজতে গিয়েছিলেন, দেখেন মাটিতে শ্রীপর্ণার নিথর দেহ পড়ে রয়েছে। তত ক্ষণে দোয়েল-ঋষি এসে পড়েন। এর পরে তিন জনে মিলে পুলিশের গাড়িতে করে শ্রীপর্ণাকে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে শ্রীপর্ণাকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক। শুভাঙ্গীর মামা সেই সময়ে কলকাতাতেই ছিলেন। দিদির কাছ থেকে খবর পেয়ে মেডিক্যাল কলেজে পৌঁছে যান তিনি। সেখান থেকে ভাগ্নিকে নিয়ে বৈদ্যবাটিতে ফেরেন।
চোরবাগানের ঘটনার ব্যাপারে জানতে চাওয়া হতেই কেঁদে ফেলেন শুভাঙ্গী। কথা বলতেই চাইছিলেন না। পরে কোনও রকমে তিনি বলেন, ‘আগেও ঠাকুর দেখতে গিয়েছি কলকাতায়। অনেক বড় পুজোয় ঘুরেছি। কিন্তু এ রকম অব্যবস্থা চোখে পড়েনি। আমরা যখন মণ্ডপে ঢুকছিলাম, তখন ঝিরঝিরি বৃষ্টি শুরু হয়েছিল। মণ্ডপের ভিতরে একসঙ্গে অনেক লোক ঢুকে যাওয়ায় আমাদের বের করার জন্য পিছন থেকে ঠেলাঠেলি হচ্ছিল। আর সেই ধাক্কাধাক্কিতেই কিছু লোক পড়ে যান।’
শুভাঙ্গীর বাবা শোভন বলেন, ‘মেয়েকে আর কোনও দিন কলকাতায় ঠাকুর দেখতে পাঠাব না। গতকাল রাত থেকে ঘুমোতে পারিনি দুশ্চিন্তায়। আমারই মেয়ের মতো ছিল শ্রীপর্ণা। ওর জন্য কী মন খারাপ, বলে বোঝাতে পারব না।’
