সিলেট থেকে ঢাকার পথে চলে কালনী, জয়ন্তিকা, পারাবত ও উপবন এবং চট্টগ্রামের পথে চলাচল করে পাহাড়িকা ও উদয়ন একপ্রেস। দুই জেলার এই ছয় আন্তঃনগর ট্রেনের টিকিট বুকিং দিতে হয় অনলাইন অ্যাপ ‘সহজ’ এ। তবে, সহজে কোনো ট্রেনেরই টিকিট পাওয়া যায় না— এমন অভিযোগ শুধু সাধারণ মানুষেরই নয়, চলতি মাসে এ নিয়ে স্বপ্রণোদিত হয়ে মামলা করেছেন সিলেট জেলার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল্লাহ আল নোমান। বিষয়টি পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। ৭ অক্টোবর মামলার নথিপত্র পিবিআইয়ের কাছে পৌঁছে।
মামলার নথিতে বলা হয়েছে, একটি চক্র টিকিট কালোবাজারির সঙ্গে জড়িত। তারা কৌশলে ট্রেনের টিকিট সরিয়ে নিয়ে পরে তা বেশি দামে সাধারণ যাত্রীদের কাছে বিক্রি করে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড সাধারণ যাত্রীদের হয়রানির পাশাপাশি সিলেটের পর্যটন শিল্পেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
জানা গেছে, সিলেট রুটের সব ট্রেনেই আসন সংখ্যার দ্বিগুণ যাত্রী নিয়ে
অস্বস্তিকর যাত্রা করতে হয়। রেল ও রেলপথের জরাজীর্ণ দশার সঙ্গে ঘন ঘন দুর্ঘটনা, বনে-জঙ্গলে আটকে থাকা আর শিডিউল বিপর্যয় এ রুটে নিয়মিত ঘটনা। এত বিপত্তির পরও মুহূর্তে ট্রেনের টিকিট ‘নাই’ হয়ে যাওয়ার বিষয়ে নজরদারি করছে জেলা প্রশাসন। কালোবাজারি ঠেকাতে যাত্রীরা নিজের এনআইডি দিয়ে টিকিট কাটছেন কিনা, ১২ অক্টোবর থেকে তা-ও যাচাই করা হচ্ছে।
রেলসংশ্লিষ্টরা বলছেন, চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ সীমিত হওয়ায় এমন ঘটনা ঘটছে। সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের অবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই নাজুক। সড়কের দুরবস্থার মধ্যে রেলের এই টিকিট সংকট যাত্রীদের মধ্যে তৈরি করেছে চরম ভোগান্তি।
গতকাল এক ঘণ্টা দেরিতে দুপুর একটায় সিলেট থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যায় জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস। ট্রেনটির সাড়ে সাতশ আসনের মধ্যে সিলেট থেকে বিভিন্ন গন্তব্যে বরাদ্দ ছিল মাত্র ২৩০টি আসন। তবে, স্ট্যান্ডিং টিকিট নিয়ে শুরুর স্টেশনেই যাত্রী ছিল উপচে পড়া।
১০ দিন আগে অনেকটা যুদ্ধ করে একটি টিকিট বুকিং দিতে পেরেছিলেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী জয় আহমেদ। তিনি বলেন, রেলওয়ের অনলাইন বুকিং অ্যাপ সহজকে নিয়ে প্রশ্ন আছে। হয় এর অ্যাপ হ্যাক হচ্ছে অথবা যারা অ্যাপ চালান তারা টিকিট কালোবাজারির সঙ্গে জড়িত। বৈধভাবে পাওয়া না গেলেও অনেকে বেশি টাকায় বাইরে থেকে ঠিকই টিকিট কিনছেন।
তিনি বলেন, আমার বাড়ি মাদারীপুরে। ঢাকা পর্যন্ত রেলেই যাতায়াত করি। ৮টায় অনলাইনে টিকিট ছাড়ে, ঠিক সময়ে লগইন করা অ্যাপ অটো লগআউট হয়ে যায়। তারপর যাত্রার নির্ধারিত তারিখের ১০ দিন আগে ছাড়া টিকিট কয়েক মিনিটেই শেষ হয়ে যায়।
সিলেট থেকে বিভিন্ন গন্তব্যে ট্রেনের টিকিটের চাহিদা অন্তত ১০ হাজার। বিপরীতে ছয়টি ট্রেনে সিলেট থেকে ঢাকার উদ্দেশে ভিআইপি-ভিভিআইপিসহ যাত্রা করতে পারেন সর্বোচ্চ ১ হাজার ২০০ জনের মতো যাত্রী। তারা নিজেদের আইডি দিয়ে টিকিট কিনেছেন কিনা তা যাচাই করছে জেলা প্রশাসন। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, এই সংকট সমাধানে রেল, রেলের কামরা বা আসন বরাদ্দ বাড়ানোর কোনো বিকল্প আপাতত নেই।
সপরিবারে সিলেট বেড়ানো শেষে জয়ন্তিকা এক্সপ্রেসে ফিরে যাচ্ছিলেন আবদুল আহাদ। তিনি বলেন, আমার বাড়ি কুষ্টিয়ায়। আমাদের ওখানে এসি কামরায় অযাচিত কাউকে ঢুকতে দেখি না; কিন্তু সিলেটে কালনীতে এলাম, জয়ন্তিকায় যাচ্ছি— এই দুই ট্রেনেই এসি কামরার সিটের হাতলের মধ্যেও মানুষ বসে থাকে। তাদের টিকিট থাকে কিনা তা-ও জানি না।
অনেকেই স্ট্যান্ডিং টিকিট করেন জানিয়ে সিলেট রেলওয়ে স্টেশনের ম্যানেজার নুরুল ইসলাম বলেন, রেলের টিকিট অনলাইনে কিনতে হয়। কেউ কেউ সরাসরি কাউন্টার থেকেও কেনেন। টিকিট বিক্রিতে স্টেশন কর্তৃপক্ষের কোনো হাত নেই।
তিনি বলেন, সাতশ থেকে সাড়ে সাতশ যাত্রী নিয়ে যাত্রা করে ট্রেনগুলো। সিলেট থেকে রেজিস্ট্রেশনকৃত যাত্রী আছেন ৪০ হাজারের ওপরে। অন্যদিকে প্রতিদিন টিকিট আছে হাজার থেকে ১২শ। সংকট খুবই স্বাভাবিক। প্রতি যাত্রায় অতিরিক্ত কামরা যোগ করার চেষ্টা করি আমরা। তবে, সেটাও খুব সামান্য।
বাংলাদেশ রেলওয়ের অনুমোদিত মাধ্যম ছাড়া অন্য কোনো ওয়েবসাইট, অ্যাপ, ফেসবুক পেজ, ব্যক্তি বা তৃতীয় পক্ষের কাছ থেকে ট্রেনের টিকিট না কিনতে সতর্ক করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। সম্প্রতি সংস্থাটির ওয়েবসাইটে সতর্কবার্তায় বলা হয়, ‘রেল সেবা’ অ্যাপ অথবা অনুমোদিত টিকিট কাউন্টার ছাড়া টিকিট কিনে প্রতারিত বা ক্ষতির শিকার হলে তার দায় নেবে না বাংলাদেশ রেলওয়ে। এ ছাড়া যাত্রীদের পাসওয়ার্ড, ওয়ান-টাইম পাসওয়ার্ড (ওটিপি), জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্যসহ অন্যান্য গোপনীয় তথ্য কারও সঙ্গে শেয়ার না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
