ছবির ক্যাপশন: ঢাকা জেলা উত্তর ডিবি পুলিশের ক্লোজড দুই কর্মকর্তা এসআই মতিউর রহমান ও এএসআই মেহেদী।
নিজস্ব প্রতিবেদক : সাভার-আশুলিয়ায় ঢাকা জেলা উত্তর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি দলের বিরুদ্ধে মাদক কারবারিদের আটক করে টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া, উদ্ধার করা মাদকের পরিমাণ কম দেখিয়ে মামলা দায়েরসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে জাতীয় দৈনিক বাংলাদেশ সমাচারে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর ক্লোজড হয়েছেন উপপরিদর্শক (এসআই) মতিউর রহমান ও সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মেহেদী। পুলিশ সুপারের নির্দেশে তাঁদের ক্লোজ করে পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা জেলা উত্তর ডিবির অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সাইদুল ইসলাম।
‘টাকা দিলেই মাদককারবারিকে মুক্তি, এসআই মতিউরের পকেটে দুই মাসেই ৩৮ লাখ!’ শিরোনামে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেন জাতীয় দৈনিক বাংলাদেশ সমাচারের বিশেষ প্রতিবেদক সাব্বির আহম্মেদ। প্রতিবেদনে সাভার-আশুলিয়ায় ডিবির ওই দলের বিরুদ্ধে গত দুই মাসে প্রায় ৩৮ লাখ টাকা আদায়সহ একাধিক গুরুতর অভিযোগ তুলে ধরা হয়।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, বিভিন্ন এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে আটক ব্যক্তিদের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে ছেড়ে দেওয়া এবং উদ্ধার করা মাদকের পরিমাণ পরিবর্তন করে মামলা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে এসআই মতিউর ও এএসআই মেহেদীর নেতৃত্বাধীন দলের বিরুদ্ধে।
দুই মাসে ৩৮ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগ
প্রতিবেদনে উঠে আসে, গত ২০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর মডেল হাইস্কুলের পেছন থেকে এক নারীকে আটকের পর হেরোইন দিয়ে মামলা দেওয়ার ভয় দেখিয়ে অর্থ দাবি করা হয়। ওই নারীর অভিযোগ, শেষ পর্যন্ত ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা দেওয়ার পর তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। ঘটনাস্থলের এক ঝালমুড়ি বিক্রেতাও দাবি করেন, তাঁর সামনে ওই নারীকে নিয়ে যাওয়া হলেও তিনি কোনো মাদক উদ্ধার হতে দেখেননি।
এ ছাড়া গত ৩০ আগস্ট আশুলিয়ার কাইচাবাড়ি এলাকা থেকে ১ হাজার পিস ইয়াবা ও ৪ কেজি গাঁজাসহ জাফর ও নাছিমা নামের দুজনকে আটকের পর অর্থের বিনিময়ে নাছিমাকে ছেড়ে দেওয়া এবং জাফরের বিরুদ্ধে মাত্র আধা কেজি গাঁজা উদ্ধারের মামলা দেওয়ার অভিযোগ প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে এ ঘটনায় যথাক্রমে ৭ লাখ ও ৪ লাখ ৫৫ হাজার টাকা লেনদেনের অভিযোগও তুলে ধরা হয়।
অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আশুলিয়ার ভাদাইল এলাকায় ২০০ পিস ইয়াবাসহ জাফরকে আটকের পর ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। আমিনবাজারের বরদেশী এলাকায় ৫০০ পিস ইয়াবাসহ এক ব্যক্তিকে আটকের পর ১ লাখ ৮০ হাজার টাকার বিনিময়ে মাত্র ৫০ পিস ইয়াবা উদ্ধারের মামলা দেওয়ার অভিযোগও উঠে আসে।
এ ছাড়া আমিনবাজারে হেরোইন উদ্ধারের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও ইয়াবার মামলা দেওয়া, কাউন্দিয়ায় মাদক কারবারির পরিবারের দুই সদস্যকে আটকের পর অর্থের বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া, সাভারের মজিতপুরে দুই ভাইকে ইয়াবাসহ আটকের পর ছেড়ে দেওয়া এবং আশুলিয়ার শ্রীপুর ও ভাদাইল এলাকায় একই ধরনের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তুলে ধরা হয় প্রতিবেদনে।
এসব ঘটনায় অর্থ লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে বিকাশ এবং এটিএম বুথ থেকে টাকা উত্তোলনের তথ্যও প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল।
দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে, সোর্স নেটওয়ার্কের অভিযোগ
প্রতিবেদনে এএসআই মেহেদীর দীর্ঘদিন ঢাকা জেলা উত্তর ডিবিতে কর্মরত থাকা এবং এলাকায় নিজস্ব সোর্স নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার বিষয়টিও উঠে আসে। ওই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে মাদক কারবারিদের আটক এবং পরে অর্থের বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ করা হয়।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে এসআই মতিউর রহমান আগের প্রতিবেদনে অভিযোগগুলো মিথ্যা বলে দাবি করেন। অন্যদিকে, ঢাকা জেলা উত্তর ডিবির তৎকালীন ওসি সাইদুল ইসলাম জানিয়েছিলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পুলিশ সুপারের নির্দেশে ক্লোজড
এসআই মতিউর রহমান ও এএসআই মেহেদীকে ক্লোজড করার বিষয়ে ঢাকা জেলা উত্তর গোয়েন্দা পুলিশের অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সাইদুল ইসলাম বলেন, “পুলিশ সুপার মহোদয়ের নির্দেশে তাঁদের ক্লোজ করে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে।”
জাতীয় দৈনিক বাংলাদেশ সমাচারে সাব্বির আহম্মেদের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর দুই কর্মকর্তাকে ক্লোজড করে পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করার ঘটনা সাভার-আশুলিয়ায় আলোচনার জন্ম দিয়েছে। পুলিশের দায়িত্ব অপরাধ দমন, জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ করা। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, অর্থের বিনিময়ে অপরাধীদের ছেড়ে দেওয়া কিংবা মামলায় অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তা গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।
সাভার-আশুলিয়ায় ডিবির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিয়ে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এবং দুই কর্মকর্তাকে ক্লোজড করার ঘটনা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহির বিষয়টিকে সামনে নিয়ে এসেছে। দায়িত্বে থাকা অন্য সদস্যদের জন্যও এটি সততা, পেশাগত নৈতিকতা ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। জনস্বার্থে অনিয়ম তুলে ধরা এবং দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনার ক্ষেত্রে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
