আন্তর্জাতিক অপরাধ গবেষণা সূচক ‘নমবিও’-এর প্রতিবেদনে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম অপরাধপ্রবণ ও অনিরাপদ শহর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা শুধুমাত্র লজ্জার নয়, অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আর একই সঙ্গে এটাও সত্য যে, গত ২০ বছরেও রাজধানীর সেই চিহ্নিত পুরাতন এলাকা বা ছিনতাইয়ের মানচিত্র ও হটস্পটগুলো বিশেষ কোনো পরিবর্তন হয়নি। ঢাকা মহানগর পুলিশ ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী রাজধানীর ৫০টি থানায় ৪৩২টি হটস্পটে এক হাজারেরও বেশি পেশাদার ছিনতাইকারী সক্রিয় রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৪০০টি স্থানই পুরোনো। দীর্ঘ প্রায় দুই যুগ ধরে একই এলাকায় একই ধরনের অপরাধের পুনরাবৃত্তি প্রমাণ করে যে, আমাদের নগর নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কাঠামোগত দুর্বলতা, প্রশাসনের নজরদারি ও সমন্বয়ের খুব বেশি অভাব রয়ে গেছে।
অপরাধ ও সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, যুগ যুগ ধরে এই পরিস্থিতি জিইয়ে থাকার পেছনে একাধিক কারণ দায়ী। প্রথমত, অনেক ক্ষেত্রে ছিনতাইয়ের ঘটনার পর মামলা না নিয়ে জিডি বা সাধারণ ডায়েরি করার প্রবণতা প্রকৃত অপরাধ চিত্রকে আড়াল করছে পুলিশ। পুলিশের অপরাধ কম দেখানোর কারণে বা কম নথিভুক্ত করার কারণে এটি দিনের পর দিন ঘটে চলেছে। অনেক ভুক্তভোগীও পুলিশি হয়রানির কারণে থানায় মামলা করেন না। দ্বিতীয়ত, আইনি ফাঁকফোকর ও দুর্বল তদন্তের কারণে আসামিরা দ্রুত জামিনে বেরিয়ে এসে পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। বাদী বা পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা আর অবহেলার কারণেই এমনটি ঘটে থাকে। এ ছাড়া অপর্যাপ্ত সড়কবাতি ও অন্ধকারাচ্ছন্ন সংযোগ সড়ক বা ফ্লাইওভারের নিচের অংশগুলোও ছিনতাইকারীদের অভয়ারণ্যে পরিণত করেছে। অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, পুলিশের জবাবদিহিতার অভাব এবং কিছু ক্ষেত্রে অসৎ ও প্রভাবশালী মহলের প্রশ্রয় এই অপরাধ চক্রকে আরও দীর্ঘায়িত করছে।
অপরাধ ও সমাজ বিশ্লেষকরা আরও বলছেন, কেবল হটস্পট চিহ্নিত করলেই চলবে না; বরং এর স্থায়ী সমাধানে কার্যকর বহুমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। অপরাধপ্রবণ স্থানগুলোতে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা, সিসিটিভি স্থাপন এবং প্রযুক্তিনির্ভর ও গতিশীল টহল জোরদার করা জরুরি। একই সঙ্গে থানাভিত্তিক মামলা ও জিডির নিখুঁত তথ্য বিশ্লেষণ করে অপরাধের কারণ উদ্ঘাটন করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, শুধু এসআরবি বা পুলিশের একার পক্ষে এই অপরাধ দমন সম্ভব নয়। ঢাকা মহানগর পুলিশ, এসআরবি, দুই সিটি করপোরেশন, পরিবহন কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় প্রশাসনকে নিয়ে একটি সমন্বিত উদ্যোগ গড়ে তুলতে হবে। প্রতিটি এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের নিয়ে বৈঠক করে এর সমাধানের পথ খুঁজে সেভাবে কাজ করতে হবে। এক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনের ভূমিকা সবচাইতে বেশি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে এই দুষ্টচক্র থেকে বের হয়ে ঢাকাকে সত্যিকারের নিরাপদ নগরীতে রূপান্তর করা সম্ভব নয়। আরেকটি কথা। রাতে টহল দেওয়ার ব্যাপারে পুলিশেরও জনবল সমস্যা, যানবাহন সমস্যা থাকতে পারে। সে বিষয়টিও নজরে এনে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।