স্বপ্নের পথে দুইবার থমকে দাঁড়ালেও হাল ছাড়েননি শরিফুল ইসলাম। দুইবার ভাইভা দিয়েও কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ার পর তৃতীয়বার আবারও বসেন একই ভাইভা বোর্ডে। এবার তাঁর অপেক্ষার অবসান হয়, পান সাফল্য। ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় সিভিল জজ পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন তিনি। তাঁর এই অর্জন নিয়ে লিখেছেন শাহ বিলিয়া জুলফিকার।
শৈশব ও শিক্ষাজীবন
শরিফুল ইসলাম ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলার সিংহেশ্বর ইউনিয়নের চাতুলিয়াকান্দা গ্রামের সন্তান। তিনি ২০১৫ সালে এসএসসি এবং ২০১৭ সালে এইচএসসি পাস করেন। এরপর জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।
ব্যর্থতা থেকে সাফল্য
আইন পড়ার সময় থেকে বিচার বিভাগে কাজ করার স্বপ্ন দেখতেন শরিফুল ইসলাম। স্নাতকের তৃতীয় বর্ষ থেকে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসকে লক্ষ্য করে শুরু করেন পরিকল্পিত প্রস্তুতি। এরপর শুরু হয় অপেক্ষা, পরিশ্রম ও লড়াইয়ের অধ্যায়।
১৬তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস পরীক্ষায় ভাইভা দিয়েও সুপারিশপ্রাপ্ত হননি শরিফুল। ১৭তম পরীক্ষাতেও একই হাল। পরপর দুইবার কাঙ্ক্ষিত ফল না পেলেও হাল ছাড়েননি। তৃতীয়বারের চেষ্টায় ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস পরীক্ষায় এসে মেলে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য। সিভিল জজ পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হন তিনি।
প্রিলিমিনারি প্রস্তুতি
প্রিলিমিনারি পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সাধারণ ও আইন—উভয় অংশেই নির্দিষ্ট বইয়ের পাশাপাশি বিসিএস ও বিজেএসের বিগত বছরের প্রশ্নকে গুরুত্ব দিয়েছেন শরিফুল। বাংলা অংশের জন্য এমপি থ্রি ও নবম-দশম শ্রেণির বোর্ড বই, ইংরেজির জন্য মৌলিক ব্যাকরণ, ইংলিশ ফর কম্পিটিটিভ এক্সাম এবং সংগৃহীত শিট অনুসরণ করেছেন। গণিত ও বিজ্ঞানের প্রস্তুতিতে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির বোর্ড বই এবং সাধারণ জ্ঞানের জন্য মিহির’স ও আলাল’স পড়েছেন। আইন অংশে বেয়ার অ্যাক্টকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। প্রতিটি ধারার উপাদান, ব্যতিক্রম ও প্রয়োগ বুঝে পড়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বিধানের উদ্দেশ্য এবং আদালতে এর প্রয়োগ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এ ছাড়া বিগত বছরের প্রশ্ন বিশ্লেষণ এবং আইনবিষয়ক বহুনির্বাচনী প্রশ্ন নিয়মিত অনুশীলন ও পুনরাবৃত্তি করেছেন।
প্রস্তুতির কৌশল সম্পর্কে তাঁর পরামর্শ, ‘নোট করে পড়া ও বিগত বছরের প্রশ্ন বিশ্লেষণের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী মিনি ল স্কুলের প্রিলি মাস্টার, বিজেএস প্রিলি মাস্টার, রিভিশন মাস্টার ও লিগ্যাল হোমের বিজেএস স্পেশাল বুলেটিন সহায়ক হিসেবে নেওয়া যেতে পারে।’
লিখিত পরীক্ষার প্রস্তুতি
শরিফুলের মতে, প্রিলিমিনারি পরীক্ষার প্রস্তুতির মাধ্যমেই লিখিত পরীক্ষার প্রায় ৬০ শতাংশ প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়ে যায়। বাকি অংশের জন্য বিগত বছরের প্রশ্ন বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো পড়লে ভালো প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব।
লিখিত পরীক্ষার প্রস্তুতিতে বেয়ার অ্যাক্টভিত্তিক পড়াশোনার পাশাপাশি সহায়ক উপকরণ হিসেবে মিনি ল স্কুলের লিখিত মাস্টার ও বিজেএস লিখিত মাস্টার অনুসরণ করেছেন তিনি। তাঁর মতে, শুধু মুখস্থ করার পরিবর্তে আইনের প্রয়োগ বুঝে পড়া এবং নিয়মিত উত্তর লেখার অনুশীলন করা জরুরি। পড়ার সময় নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে ‘এই বিধানটি আদালতে কীভাবে প্রয়োগ হবে?’ এ ছাড়া সাম্প্রতিক আইন, গুরুত্বপূর্ণ রায় ও সাংবিধানিক বিষয়ে হালনাগাদ থাকার পরামর্শ দেন তিনি। অন্যের পড়ার পদ্ধতির সঙ্গে নিজের প্রস্তুতির তুলনা না করে নিজের জন্য কার্যকর একটি রুটিন তৈরি করার ওপরও গুরুত্ব দেন শরিফুল।
ভাইভা প্রস্তুতি
দুইবার ভাইভা দিয়েও সুপারিশপ্রাপ্ত হননি শরিফুল। তবে সেই ব্যর্থতা তাঁকে দমিয়ে না দিয়ে আরও ধৈর্যশীল ও পরিশীলিত করেছে। ভাইভায় আত্মবিশ্বাস, ধৈর্য ও নিজের প্রস্তুতির ওপর আস্থা রাখার পাশাপাশি মহান আল্লাহর ওপর ভরসা তাঁকে এগিয়ে যেতে শক্তি জুগিয়েছে। ভাইভা প্রস্তুতি নিয়ে তিনি বলেন, প্রস্তুতিতে ভাইভা বোর্ডের প্রশ্নের ধরন ও অনুশীলনের গুরুত্ব অপরিসীম। তাঁর মতে, ‘ভাইভা বুস্টার’ বইটি অনুসরণ করলে একজন শিক্ষার্থী সহজেই ভাইভার প্রস্তুতি নিতে পারেন।
নতুনদের উদ্দেশ্যে তাঁর পরামর্শ
নতুনদের উদ্দেশ্যে শরিফুলের পরামর্শ, ‘নিজের ওপর বিশ্বাস রেখে ধারাবাহিক থাকতে হবে এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে হবে। মূল আইনগ্রন্থকে গুরুত্ব দিয়ে ধারার উপাদান, ব্যতিক্রম ও প্রয়োগ বুঝে পড়া, বিগত বছরের প্রশ্ন বিশ্লেষণ, নিয়মিত লিখিত অনুশীলন এবং সাম্প্রতিক আইন, গুরুত্বপূর্ণ রায় ও সাংবিধানিক বিষয়ে হালনাগাদ থাকা জরুরি। অন্যের সঙ্গে তুলনা না করে নিজের উপযোগী রুটিন তৈরি করতে হবে। তাঁর মতে, বিজেএস দীর্ঘমেয়াদি যাত্রা; ব্যর্থ হলে হতাশ না হয়ে ভুল চিহ্নিত করে আবার শুরু করতে হবে।’
