নিজস্ব ছবি এই সময়
Published on
:
3 min read
পিনাকী চক্রবর্তী, বক্সা
শিলাদিত্য সাহা, কলকাতা
ট্র্যাভেলিং টু অসম। ফিলিং এক্সাইটেড!
বিহারের বাল্মীকি টাইগার রিজ়ার্ভ থেকে মাত্র দিন কুড়ি আগে উত্তরবঙ্গের বক্সায় উড়িয়ে আনা বাঘিনির যদি একখানা সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট থাকত, তবে শুক্রবার রাত সাড়ে সাতটা নাগাদ নির্ঘাত এমন একটা পোস্ট থেকে বঞ্চিত হতেন না নেট–নাগরিকরা। উৎসাহীরা প্রোফাইল চেক করতে গিয়ে দেখতেন লেখা রয়েছে — ম্যারিটাল স্টেটাস, সিঙ্গল। রিলেশনশিপ স্টেটাস, কমপ্লিকেটেড! হবে না–ই বা কেন? বক্সার বিশাল জঙ্গলে শিকারের জন্য বুনো শুয়োর আছে, চিতল হরিণও আছে। কিন্তু ভাব–ভালোবাসার জন্য পুরুষ সঙ্গী কই?
আর সেই কারণেই হয়তো বক্সার বাঘিনি (বিটিআর টিএফ১) রাজ্য ছেড়ে আচমকা পা রাখল পড়শি অসমের কোকরাঝাড়ে, রায়মোনা টাইগার রিজ়ার্ভের কাছে। পশ্চিমবঙ্গ বন দপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, এনক্লোজ়ার থেকে মুক্ত জঙ্গলে পা রাখার পরে গত তিন সপ্তাহে বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের পঁচিশ মাইল টাওয়ার থেকে ক্রমশই পূর্বদিকে এগিয়েছে বছর তিনেকের বাঘিনি। তাতে সে রেকি করেছে প্রায় ৩৯০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা।
শেষে জয়ন্তী পার করে সে পৌঁছে গিয়েছে চুনিয়া হয়ে আরও পূর্বদিকে, সঙ্কোশ নদীর পাড়ে। বাংলা–অসম সীমানায় ওই নদীর পূর্বপাড়েই রয়েছে মানস টাইগার রিজার্ভের পশ্চিম দিকের কোর ও বাফার জ়োন লাগোয়া ৪২২ বর্গ কিমি বিস্তৃত রায়মোনা টাইগার রিজার্ভ। ২০২১–এ টাইগার রিজ়ার্ভ তকমা পাওয়ার সময়ে রায়মোনায় ছিল একটি বাঘ, আপাতত সেই জঙ্গলে বাঘ–বাঘিনি মিলিয়ে অন্তত ৬টি ডোরাকাটার রাজত্ব।
অসম বন দপ্তর সূত্রে জানা যাচ্ছে, শুক্রবার রাতেই তাদের কাছে বার্তা আসে, বিহার থেকে বক্সায় এনে ছাড়া বাঘিনিটি সঙ্কোশের আশপাশে রয়েছে। যে কোনও সময়ে সে নদী পার করে রায়মোনা জঙ্গল এলাকায় চলে যেতে পারে। শনিবার কোকরাঝাড়ের কচুগাঁও বন বিভাগের ডিএফও মুস্তাফা আলি আহমেদ বলেন, ‘বক্সার বাঘিনির মুভমেন্ট রায়মোনার জঙ্গলের দিকে — এই খবর আমরা পেয়েছি। তবে জঙ্গলে তার উপস্থিতির প্রামাণ্য ছবি এখনও হাতে আসেনি।’
এমনিতেই বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্প থেকে রায়মোনা হয়ে অসমের মানস টাইগার রিজ়ার্ভ ছুঁয়ে উত্তর দিকে ভুটানের ফিবসু, জিগমে সিংগে এবং রয়্যাল মানস অভয়ারণ্যে যাতায়াতের উপযোগী প্রায় ২৪০০ বর্গ কিলোমিটার বিস্তৃত ‘টাইগার করিডর’ রয়েছে, যা ব্যবহার করে একাধিক বার ভুটান, অসম ও পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে বাঘের চলাফেরার প্রমাণ মিলেছে। যেমন ২০২৩–এর জানুয়ারিতে যে পুরুষ বাঘ মানসের জঙ্গলে ছিল, সে–ই ২০২৪–এর জানুয়ারিতে হাজির হয় বক্সায়।
তবে এ বার যা ঘটছে, তা একেবারেই উলটপুরাণ।
বক্সায় টাইগার রিইন্ট্রোডাকশনের প্রথম ধাপে একটি বাঘিনি আনার সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় বন মন্ত্রকের আধিকারিকরা জানিয়েছিলেন, ওই বাঘিনিটির টানে যদি ফি বছর শীতকালে বক্সা ঘুরে যাওয়া ‘পরিযায়ী’ বাঘেদের কেউ পাকাপাকি ভাবে উত্তরবঙ্গের ওই জঙ্গলে থেকে যায় — সেই আশাতেই এমন পরিকল্পনা। তবে বাঘিনির সঙ্গী হিসেবে শুধু পরিযায়ী বাঘই ভরসা নয়। বিহারের বাল্মীকির জঙ্গল থেকে আগামী নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপে একটি পুরুষ বাঘ বক্সায় আনার প্রাথমিক পরিকল্পনা রয়েছে। তার পরের ধাপে আসবে আরও একটি বাঘিনি। বনকর্তাদের ভাবনায় রয়েছে ২:১ অনুপাত — যেখানে বক্সার জঙ্গলে দুটি বাঘিনি ও একটি বাঘের মিলমিশে জন্ম নেবে আগামী প্রজন্ম।
তবে এ সব পরিকল্পনা বাঘিনি জানলে তো!
প্রায় চারশো বর্গ কিমি চষে একটিও সঙ্গী না–পেয়ে তার অসমের দিকে হাঁটা দেওয়ার ঘটনায় তাই অবাক হচ্ছেন না বন্যপ্রাণ বিশেষজ্ঞরা। বরং তাঁদের একাংশ প্রশ্ন তুলছেন, কেন প্রথমেই বাঘ–বাঘিনি জোড়ায় ছাড়া হলো না বক্সায়। হাই ফ্রিকোয়েন্সি গ্রাউন্ড ট্র্যাকিং এবং স্যাটেলাইট ট্র্যাকিংয়ের সুবিধাযুক্ত কলার পরানো বাঘিনি যে ক্রমশ অসম সীমানার দিকে যাচ্ছে, সেটা কি ট্র্যাকিং টিমের নজরে পড়েনি? মুক্ত জঙ্গলে বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক গতিবিধি রুদ্ধ না–করেও কি তাকে বক্সার দিকে কিছুটা ‘ডাইভার্ট’ করা যেত না?
বক্সার বাঘিনির গতিপথ বোঝার জন্য জিপিএস লোকেশন দেখে তৈরি করা হয়েছিল ভার্চুয়াল ট্রায়াঙ্গল। ওই কাজে যুক্ত ৬০ জন প্রশিক্ষিত বনকর্মী — সঙ্গে ন্যাশনাল টাইগার কনজ়ারভেশন অথরিটি এবং ওয়াইল্ডলাইফ ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডিয়ার বিশেষজ্ঞরা।
গ্রাউন্ড ট্র্যাকিংয়ে ১–২ কিমি ব্যাসার্ধের মধ্যে বাঘের ‘রিয়েল টাইম’ অবস্থান জানা যায়। স্যাটেলাইট তথ্যের ক্ষেত্রে সেটাই ‘নিয়ার রিয়েল টাইম’ — অর্থাৎ বাঘের রেডিয়ো কলারে স্টোর হওয়া লোকেশন ডেটা স্যাটেলাইট আপলিঙ্কিংয়ের মাধ্যমে নির্দিষ্ট পোর্টালে আপলোড হতে যে কয়েক ঘণ্টা সময় লাগে, তাতে হামেশাই বাঘের বাস্তব অবস্থান পাল্টে যায়। এ ক্ষেত্রে কী হয়েছে? বাংলার বন দপ্তর বাঘিনির পড়শি রাজ্যে পাড়ি দেওয়ার বিষয়ে সরাসরি মুখ খোলেনি। তারা বিবৃতিতে জানিয়েছে, বাঘিনিটি পুরোপুরি সুস্থ আছে এবং সে বক্সা এবং তার সংলগ্ন জঙ্গলে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে অনেকেরই মনে পড়ছে ‘জ়িনাত’–এর কথা। ঠিক দু’বছর আগে বক্সার মতোই একটি ‘টাইগার রিইন্ট্রোডাকশন’ প্রকল্পে মহারাষ্ট্রের তাডোবা থেকে ওডিশার সিমলিপালে উড়িয়ে এনে মুক্ত জঙ্গলে ছাড়া হয়েছিল বাঘিনি জ়িনাতকে। তার ক’দিন পরেই সে সিমলিপালের জঙ্গল ছেড়ে পড়শি রাজ্য ঝাড়খণ্ড চষে জঙ্গলমহল দিয়ে ঢুকে পড়ে পশ্চিমবঙ্গ। এক মাস ধরে ঝাড়গ্রাম, বাঁকুড়া, পুরুলিয়ার জঙ্গল ঘোরার পরে জ়িনাতকে ট্র্যাঙ্কুইলাইজ় করে বিশেষ অ্যাম্বুল্যান্সে চাপিয়ে ফেরত পাঠানো হয় ওডিশায়। এখন সেই জ়িনাতের চার শাবক ঘুরে বেড়াচ্ছে সিমলিপালের জঙ্গলে। বক্সার বাঘিনির ক্ষেত্রেও কি এমনটা ঘটবে? নাকি রায়মোনার জঙ্গলেই পছন্দের পুরুষ সঙ্গী জুটে যাবে তার?
সত্যিই সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট থাকলে আজ ‘ভাইরাল’ হতো বাঘিনি।
লাইক, কমেন্ট, শেয়ার...!
