সরকারের আচরণে ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলীয় ঐক্যের লিয়াজোঁ কমিটির সমন্বয়ক ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ।
তিনি বলেছেন, “সরকার যদি ক্ষমতায় থাকতে না চায়, তাহলে জোর করে ক্ষমতায় রাখা সম্ভব নয়।” একই সঙ্গে আসন্ন নির্বাচনে ‘মাগুরা মার্কা’ নির্বাচন করার কোনো অশুভ পরিকল্পনা থাকলে তা থেকে সরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে ১১ দলীয় ঐক্যের লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন ড. হামিদুর রহমান আযাদ।
তিনি বলেন, “সরকার যদি ক্ষমতায় থাকতে না চায়, তাহলে আমরা তো জোর করে ক্ষমতায় রাখতে পারব না। তাদের প্রতিটি আচরণ মনে হচ্ছে, ছেড়ে দে মা, কেঁদে বাঁচি। অজুহাত তৈরি করে পালিয়ে যাই। এরকম পরিস্থিতি তৈরি করে দিলে জনগণের কিছু বলার নাই। মাগুরার পুনরাবৃত্তি ঘটুক, আমরা চাই না। সেজন্য মাগুরা মার্কা নির্বাচন করার অশুভ পরিকল্পনা থাকলে তা থেকে সরে আসার আহ্বান জানাচ্ছি।”
হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, “গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারি বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধের দাবিতে তারা আন্দোলন ও লং মার্চ করছেন।”
তিনি বলেন, “দুর্নীতি বন্ধের দাবিতে তারা আন্দোলন করছেন। এজন্য অবিলম্বে দুর্নীতির পথগুলো বন্ধ করা উচিত। দুর্নীতি দমন কমিশনের পাশাপাশি মানবাধিকার কমিশন এবং গুম-খুন প্রতিরোধে স্বাধীন কমিশন গঠনের কথাও তারা বলেছেন।”
প্রশাসনের সর্বত্র নির্লজ্জভাবে দলীয়করণ করা হচ্ছে অভিযোগ করে জামায়াতের এই নেতা বলেন, “পিএসসির সদস্যদের চায়ের দাওয়াত দিয়ে পদত্যাগে বাধ্য করা হচ্ছে। মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ ও বৈষম্য দূর করার দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নেমেছিলেন। কোটা আন্দোলন ও জুলাই আন্দোলন অতীতের ফ্যাসিবাদী আমলে মেধা হত্যার বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দেয়।”
তিনি বলেন, “একই পথে হাঁটছে বর্তমান নব্য ফ্যাসিবাদ। সেজন্য মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ ও পদোন্নতি হচ্ছে না, হচ্ছে দলীয় বিবেচনায়।”
নির্বাচন কমিশনে অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদায় একজন দলীয় ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, “শামসুল আলমের নিয়োগ নির্লজ্জ দলীয়করণের উৎকৃষ্ট উদাহরণ।”
ঠাকুরগাঁওয়ে ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেনের পক্ষে গণজোয়ার তৈরি হয়েছে দাবি করে হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, “জনগণ ভোট দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে আগামী ২৯ অক্টোবরের উপনির্বাচনে ১২ ফেব্রুয়ারির মতো ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে তারা খবর পাচ্ছেন।”
তিনি বলেন, “এই ধরনের কিছু ঘটলে সরকারকে মাগুরার নির্বাচন থেকে শিক্ষা নিতে হবে।”
বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাসে মাগুরার নির্বাচন একটি কালো অধ্যায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, “ওই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সরকার পতনের আন্দোলন শুরু হয়েছিল, যা পরে চূড়ান্ত রূপ নেয়।”
আগামী ৩১ অক্টোবরের লং মার্চ শান্তিপূর্ণ, সুশৃঙ্খল, জনবান্ধব ও জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছেন হামিদুর রহমান আযাদ।
তিনি বলেন, “সরকার যেন দ্রুত জনগণের ভাষা বুঝতে পারে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদর দপ্তর থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আহ্বান থাকবে, তারা যেন প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। এটি সরকার ও প্রশাসনের দায়িত্ব।”
হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, “কর্মসূচিকে ঘিরে কেউ উসকানি দেওয়া বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করলে প্রশাসনকে আগেই ব্যবস্থা নিতে হবে। সরকার ও প্রশাসন তা না করলে তারা ধরে নেবেন, কর্মসূচিতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য প্রশাসনকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।”
তিনি বলেন, “আমরা আশা করি না, কোনো ষড়যন্ত্রকারী এ ধরনের ষড়যন্ত্রমূলক কাজে জড়িত হোক। প্রশাসন জনগণের এবং তারা জনগণের হয়ে কাজ করবে। জননিরাপত্তার জন্য কাজ করবে। শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালনে আমরা তাদের সহযোগিতা চাই, সহযোগিতা করবেন—এ প্রত্যাশা রাখছি।”
আগামী ৩১ অক্টোবর ঢাকা-খুলনা-কুষ্টিয়ামুখী লং মার্চের উদ্বোধনী সমাবেশ রাজধানীর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের দক্ষিণ গেটে সকাল ৭টায় অনুষ্ঠিত হবে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেবেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। এছাড়া ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতারা বক্তব্য দেবেন।
আয়োজকদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রায় ১ হাজার গাড়ির বহর নিয়ে সকাল ৮টায় লং মার্চ শুরু হবে। মাওয়া সড়ক হয়ে পদ্মা সেতু পার হয়ে শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ফরিদপুরের ভাঙ্গা, গোপালগঞ্জ, বাগেরহাটের ফকিরহাট ও রূপসা ব্রিজ হয়ে খুলনায় পৌঁছাবে বহর। এরপর যশোর ও ঝিনাইদহ হয়ে কুষ্টিয়া জিলা স্কুল মাঠের সমাপনী সমাবেশে যোগ দেবে লং মার্চের বহর।
এই পথযাত্রায় গণমাধ্যমকর্মী, চিকিৎসক, শিল্পী ও বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের সদস্যরা অংশ নেবেন।
লং মার্চের পথে কয়েকটি স্থানে পথসভা অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে সকাল ৯টায় শরীয়তপুরের জাজিরার নাওডোবা, সকাল ১১টায় বাগেরহাটের ফকিরহাটের কাঁটাখালীর মোড়, বেলা সাড়ে ১২টায় খুলনা মহানগরীর বাবরী চত্বর এবং দুপুর ২টায় ফুলতলার বাসস্ট্যান্ডের স্বাধীনতা চত্বরে পথসভা হওয়ার কথা রয়েছে।
এছাড়া বিকেল সাড়ে ৩টায় যশোরের মুড়লীর মোড় এবং বিকেল ৫টায় ঝিনাইদহ বাস টার্মিনালে পথসভা অনুষ্ঠিত হবে। সবশেষে রাত সাড়ে ৮টায় কুষ্টিয়া জিলা স্কুল মাঠে সমাপনী সমাবেশে যোগ দেবে লং মার্চের বহর।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব আতাউল্লাহ আমীন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট মুয়াযযম হোসাইন হেলাল, এলডিপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বিল্লাল হোসেন মিয়াজী, নেজামে ইসলাম পার্টির সিনিয়র নায়েবে আমির আব্দুল মাজেদ আতহারী, এবি পার্টির যুগ্ম মহাসচিব আব্দুল্লাহ আল মামুন রানা, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জাগপার মহাসচিব অধ্যাপক ইকবাল হোসাইন, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আনোয়ারুল ইসলাম চান এবং বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মুফতি ফখরুল ইসলাম।
