নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন ও সিনিয়র রিপোর্টার শাহনাজ পারভীন এলিস। ছবি: খবরের কাগজ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সফলভাবে সম্পন্ন করার পর এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আগামী বছরের শুরুতে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়ে ধাপে ধাপে এসব নির্বাচন হবে। এ বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন দৈনিক খবরের কাগজকে বলেছেন, স্থানীয় নির্বাচনেও গ্রহণযোগ্য মানদণ্ড বজায় রাখা হবে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সিনিয়র রিপোর্টার শাহনাজ পারভীন এলিস।
খবরের কাগজ: চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছে। সামনের বছর হবে অসংখ্য স্থানীয় সরকার নির্বাচন। এসব নির্বাচন নিয়ে নির্বাচন কমিশনের পরিকল্পনা কী?
নাসির উদ্দিন: আপনি যে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কথা বললেন, সেটি আমরা সফলভাবে সম্পন্ন করতে পেরেছি। তবে এর কৃতিত্ব শুধু নির্বাচন কমিশনের একার নয়। সব অংশীজনের সহযোগিতা নিয়ে আমরা এ কাজ করতে পেরেছি। সেখানে সাংবাদিকদের সহযোগিতাও ছিল। স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও আমরা একই ধরনের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি। রাজনৈতিক দল, ভোটার, প্রার্থী, সাংবাদিক—সবাই গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন। সবার সহযোগিতা প্রয়োজন এবং আমরা সবার কাছ থেকেই সেই সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, আমরা নির্বাচনের গ্রহণযোগ্য যে মানদণ্ড নিজেদের জন্য নির্ধারণ করেছি, তার নিচে আমরা নামতে চাই না। সম্ভব হলে আরও ভালো করার চেষ্টা থাকবে। কিন্তু যদি কোনো কারণে আরও ভালো করা সম্ভব না-ও হয়, অন্তত যে মানদণ্ড আমরা নির্ধারণ করেছি, সেটি ধরে রাখতে হবে। সেই লক্ষ্যেই আমাদের সার্বিক প্রস্তুতি চলছে।
খবরের কাগজ: স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে সরকারের সঙ্গে আপনাদের সমন্বয় হয়েছে?
নাসির উদ্দিন: সরকারের সঙ্গে আমাদের সহযোগিতামূলক যোগাযোগ সব সময়ই ছিল, এখনো আছে। এ নিয়ে কিছু ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে, নানা কারণে হয়েছে। আমরা সব সময় সরকারের কাছ থেকে তথ্য চেয়েছি—নির্বাচনের জন্য কোথায় কী ধরনের সমন্বয় বা প্রস্তুতি প্রয়োজন, সে বিষয়ে। সরকারও আমাদের তথ্য দিয়েছে। আমরা সেই তথ্যের ভিত্তিতেই কাজ করছি।
সরকারের সহযোগিতা ছাড়া আসলে কোনো নির্বাচনই ইসির পক্ষে করা সম্ভব নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থেকে শুরু করে প্রিজাইডিং কর্মকর্তা, পোলিং কর্মকর্তা, ম্যাজিস্ট্রেসি, বিচার বিভাগ—অনেক ক্ষেত্রেই সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও সদস্যদের সহযোগিতা প্রয়োজন। তাদের সঙ্গে নিয়েই আমাদের এগোতে হবে। সুতরাং সরকারের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের সহযোগিতামূলক যোগাযোগ থাকা স্বাভাবিক এবং নির্বাচন আয়োজনের জন্য এটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
খবরের কাগজ: জাতীয় নির্বাচনের মতো স্থানীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে আইন ও বিধিবিধানে যেসব পরিবর্তন আনা হয়েছে, সেগুলোকে কীভাবে দেখছেন?
নাসির উদ্দিন: এ ক্ষেত্রে আমরা ইতিবাচক কিছু পরিবর্তন এনেছি। তবে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এমন যে সব সময় সবাইকে খুশি করা সম্ভব নয়। কারও প্রত্যাশার বিপরীতে কোনো সিদ্ধান্ত গেলে কেউ হয়তো মন খারাপ করতে পারেন। সেটি স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের অবস্থান পরিষ্কার। আমরা আইন ও সংবিধান অনুযায়ী চলছি এবং চলব। এটি আমাদের শপথ। আইন ও সংবিধানের মধ্যে থেকে যা যা করা প্রয়োজন, আমরা সেটিই করব। আইনের বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এটাই আমাদের অঙ্গীকার।
খবরের কাগজ: দেশের অধিকাংশ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান বর্তমানে প্রশাসকের মাধ্যমে চলছে। গণতান্ত্রিক এসব প্রতিষ্ঠানে নির্বাচন আয়োজনে আপনাদের কী ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে?
নাসির উদ্দিন: এটি নিয়ে একাডেমিক বিতর্ক থাকতেই পারে। তবে আমাদের বর্তমান পরিস্থিতিটা বুঝতে হবে। অতীতে কীভাবে নির্বাচন হয়েছে, সেটিও দেখতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতি অতীতের মতো নয়। একটি বড় গণঅভ্যুত্থানের পর পরিস্থিতিতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। একই সময়ে অনেকগুলো স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এখন প্রশাসকের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। ইউনিয়ন পরিষদ ছাড়া প্রায় সব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানেই বিভিন্ন পর্যায়ে এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
অতীতে একসঙ্গে এতগুলো স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন করার পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। আগে একটি বা দুটি সিটি করপোরেশন নির্বাচন হয়েছে, তারপর অন্য নির্বাচন হয়েছে। এখন একসঙ্গে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদসহ বিভিন্ন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন করতে হবে। এটি অবশ্যই বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার জন্যই তো আমরা আছি। তাই হাল ছেড়ে দিলে হবে না। আমরা আমাদের সার্বিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছি। আইন ও সংবিধান অনুযায়ী কাজ করছি। ইনশাআল্লাহ, যথাসময়ে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।
খবরের কাগজ: স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে আপনি কতটা আশাবাদী?
নাসির উদ্দিন: আমরা আশাবাদী। জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমরা যে মানদণ্ড নির্ধারণ করেছি, স্থানীয় নির্বাচনেও সেই মানদণ্ড বজায় রাখার চেষ্টা থাকবে। আমরা চাই, নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্যভাবে সম্পন্ন হোক। এ জন্য সব অংশীজনের সহযোগিতা প্রয়োজন। রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, ভোটার, গণমাধ্যম—সবার সহযোগিতা নিয়ে আমরা এগিয়ে যেতে চাই।
খবরের কাগজ: দৈনিক খবরের কাগজ তিন বছর পূর্ণ করে চতুর্থ বছরে পা দিয়েছে। পত্রিকাটির সাংবাদিকতার মান কেমন এবং এর ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে আপনার প্রত্যাশা কী?
নাসির উদ্দিন: আমি আপনাদের পত্রিকা পড়ি। অনলাইনেও পড়ি। গুরুত্বপূর্ণ কোনো সংবাদ থাকলে অনেকে আবার আমাকে পাঠান, তখনও পড়ার সুযোগ হয়। আপনাদের পত্রিকা তিন বছর পূর্ণ করে চতুর্থ বছরে পদার্পণ করছে। এ উপলক্ষে খবরের কাগজের প্রকাশক, সম্পাদক, সাংবাদিক, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং অগণিত পাঠককে আমার আন্তরিক অভিনন্দন ও ধন্যবাদ জানাই।
খবরের কাগজে দেখেছি, আপনারা মোটামুটিভাবে সত্য, বস্তুনিষ্ঠ এবং জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী বিভিন্ন খবর পরিবেশন করেন। এটি অত্যন্ত ইতিবাচক এবং প্রশংসার দাবি রাখে। সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি আমাকে আকৃষ্ট করেছে, সেটি হলো এবার আপনাদের স্লোগান—‘চির উন্নত শির’। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত কবিতা থেকে নেওয়া এই স্লোগানকে যদি সত্যিকার অর্থে ধারণ করতে হয়, তাহলে সত্য, ন্যায়নিষ্ঠ, বস্তুনিষ্ঠ ও দায়িত্বশীল সংবাদ পরিবেশনের কোনো বিকল্প নেই। এই ধারা বজায় রাখতে পারলে এই স্লোগানের প্রতি যথাযথ সম্মান দেখানো হবে।
আপনারা জানেন, আমরা একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উত্তরণ ঘটিয়েছি। এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সুসংহত করতে হলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী ও কার্যকর করতে হবে। সেখানে গণমাধ্যমের বিশাল ভূমিকা রয়েছে। নির্বাচনসংশ্লিষ্ট এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে আপনারা অতীতে যে ভূমিকা রেখেছেন, আমি প্রত্যাশা করব ভবিষ্যতেও সেই ভূমিকা অব্যাহত থাকবে। মাত্র তিন বছরের মধ্যে আপনারা যে সুনাম ও পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করেছেন, সেটি প্রশংসার যোগ্য। তথ্য যাচাই করে সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের ধারাটি অব্যাহত থাকলে আপনাদের পথ আরও সহজ, ফলপ্রসূ ও সাফল্যমণ্ডিত হবে বলেই মনে করি।
খবরের কাগজ: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
নাসির উদ্দিন: আপনাদেরও ধন্যবাদ। দৈনিক খবরের কাগজের সবাইকে আমি আবারও আন্তরিক অভিনন্দন জানাই। পত্রিকাটির সত্য, বস্তুনিষ্ঠ ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার এই ধারা অব্যাহত থাকুক—এটাই প্রত্যাশা।
