১৯৬০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানভিত্তিক বিখ্যাত সাময়িকী ‘সায়েন্স’–এ প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে এমন কথা বলা হয়। গবেষণাপত্রে লেখা হয়, ২০২৬ সালের ১৩ নভেম্বর পৃথিবী এক বড় সংকটে পড়বে। সেখান থেকে মানবজাতি বিলুপ্তির দিকে যাবে। তবে কোনো জ্যোতিষশাস্ত্র বা অলৌকিক ধারণার ওপর ভিত্তি করে এই তারিখ বের করা হয়নি। কিন্তু বিজ্ঞানীদের দেওয়া সেই তারিখ কাকতালীয়ভাবে, ‘ফ্রাইডে দ্য থার্টিনথ’ বা ১৩ তারিখের এক শুক্রবারে পরে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয়ের পদার্থবিজ্ঞানী হেইঞ্জ ভন ফোরস্টার এবং তাঁর সহকারীরা মানবজাতির জনসংখ্যা বৃদ্ধির একটি গাণিতিক সূত্র বা মডেল তৈরি করেছিলেন। গত কয়েক শ বছরের পৃথিবীর জনসংখ্যার তথ্য পর্যালোচনা করে তাঁরা গণিতের এই মডেল বানান। সেখানে তাঁরা দেখেন, জনসংখ্যা যদি একইভাবে দ্রুতগতিতে বাড়তে থাকে, তবে ২০২৬ সালের শেষ দিকে তা প্রায় অসীমের কাছাকাছি পৌঁছে যাবে।
বর্তমান সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে উদ্বেগের কারণে পৃথিবী ধ্বংসের এই পুরোনো বৈজ্ঞানিক আলোচনাটি নতুন করে আবার ইন্টারনেটে বেশ ভাইরাল হয়। তবে ভন ফোরস্টারের ভাবনায় এআই ছিল না। বরং সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সামাজিক ও বৈজ্ঞানিক বিপর্যয়ের কথা ছিল।

১৭৬৬ থেকে ১৮৩৪ সালের বিখ্যাত ইংরেজ অর্থনীতিবিদ টমাস ম্যালথাসের সময় থেকেই অনেকে বিশ্বাস করতেন, জনসংখ্যা যে হারে বাড়বে, সেই হারে খাদ্যের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হবে না। ফলে খাদ্যের অভাবে মানুষ দুর্ভিক্ষে মারা যাবে। কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানী হেইঞ্জ ভন ফোরস্টার এই ম্যালথাসীয় তত্ত্ব বা ধারণার সঙ্গে একমত ছিলেন না।
ভন ফোরস্টার ধরে নিয়েছিলেন, আধুনিক বিজ্ঞান ও কৃষিপ্রযুক্তির উন্নতির ফলে পৃথিবী সব মানুষের জন্য পর্যাপ্ত খাবার ঠিকই তৈরি করতে পারবে, যা পরবর্তী সময়ে সত্যি প্রমাণিত হয়েছে। তাঁর মতে, আসল সমস্যাটি খাদ্যের অভাব নয়। বরং জনসংখ্যা এমন এক অনিয়ন্ত্রিত পর্যায় বা সীমার দিকে ধাবিত হবে, যাকে আর কোনোভাবেই সামলানো সম্ভব হবে না।
ভন ফোরস্টার ও তাঁর সহলেখকেরা তখন একটি আলোচিত পর্যবেক্ষণ প্রকাশ করেন। সেখানে তাঁরা বলেন, ‘ভবিষ্যতের মানুষেরা না খেয়ে মারা যাবে না। বরং অতিরিক্ত জনসংখ্যার কারণে তৈরি হওয়া ভিড় ও স্বাভাবিক বাসস্থানের অভাবে তাদের অস্তিত্ব–সংকট দেখা দেবে।’ তাঁদের সেই গাণিতিক মডেলের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শেষের দিকে মানবজাতির অস্তিত্বের এই চূড়ান্ত সংকটের সময় নির্ধারিত হয়েছিল।
কেন ভুল ছিল জনসংখ্যা বৃদ্ধির সেই ভবিষ্যদ্বাণী?
বিজ্ঞানী ভন ফোরস্টারের আশঙ্কাজনক ভবিষ্যদ্বাণীটি শেষ পর্যন্ত ভুল প্রমাণিত হয়েছে। বর্তমানে বিশ্বের জনসংখ্যা প্রায় ৮৩০ কোটি। তবে সেটা আগের মতো দ্রুত বাড়ছে না। বরং জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া বা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জন্মহার কমে যাওয়াটাই প্রধান দুশ্চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভন ফোরস্টার তৎকালীন পাওয়া গাণিতিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তাঁর হিসাব করেছিলেন, কিন্তু ভবিষ্যতের পরিবর্তনের বিষয়টি তিনি চিন্তা করেননি। গাণিতিক জীববিজ্ঞানী জোয়েল কোহেনের মতে, ভন ফোরস্টার যখন ১৯৬০-এর দশকে এই গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন, ঠিক তখনই বিশ্বে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছে কমতে শুরু করেছিল। বিজ্ঞানীদের কাছে তৎকালীন তথ্য সঠিক হলেও তা পুরো বৈশ্বিক পরিস্থিতির একটি আংশিক চিত্র মাত্র ছিল।

কেন ২০২৬ সালের ১৩ নভেম্বর পৃথিবী ধ্বংসের কথা বলা হয়েছিল
১৯৬০ সালে পদার্থবিজ্ঞানী হেইঞ্জ ভন ফোরস্টার গত ২ হাজার বছরের জনসংখ্যা বিশ্লেষণ করে একটি গাণিতিক সমীকরণ তৈরি করেন। তাঁর মতে, মানুষ একতাবদ্ধ হয়ে কাজ করতে পারে বলে জনসংখ্যা দিন দিন আরও দ্রুতগতিতে বাড়ে। এই হিসাব ধরে তিনি দাবি করেন, ২০২৬ সালের ১৩ নভেম্বর নাগাদ পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা এতটাই বাড়বে যে গাণিতিকভাবে আর থাকার জায়গা থাকবে না। ১৯৬৮ সালে জীববিজ্ঞানী পল আর. এরলিচও ‘দ্য পপুলেশন বম্ব’ বইয়ে অতিরিক্ত জনসংখ্যা নিয়ে একই ভয় দেখান।
তবে গাণিতিক জীববিজ্ঞানী জোয়েল কোহেন জানান, তাঁদের অতীতের হিসাব সঠিক হলেও ভবিষ্যতের পূর্বাভাস ভুল ছিল।
জনসংখ্যা বৃদ্ধির আসল কারণ কী ছিল
১৮০০ সালে পৃথিবীর জনসংখ্যা ছিল ১০০ কোটি। ১৯২৭ সালে তা ২০০ কোটি, ১৯৭৪ সালে ৪০০ কোটি, ১৯৮৭ সালে ৫০০ কোটি এবং ২০২২ সালে তা ৮০০ কোটিতে পৌঁছায়।
জনসংখ্যা বৃদ্ধির মূল কারণ কিন্তু বেশি শিশু জন্ম নেওয়া ছিল না। বরং চিকিৎসা বিজ্ঞান, বিশুদ্ধ পানি ও উন্নত স্বাস্থ্যবিধির কারণে শিশু মৃত্যুর হার অনেক কমে যাওয়া। ফলে জন্ম নেওয়া শিশুরা অকালে মারা না গিয়ে বেঁচে থাকতে পেরেছে।
তবে এই জনসংখ্যা বৃদ্ধি একটি নির্দিষ্ট সময়ের উল্লম্ফন মাত্র। শিশুমৃত্যুর হার কমে আসার পর এখন মানুষ আগের চেয়ে কম সন্তান নিচ্ছে, যার ফলে জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতিও আবার কমে এসেছে।

অতিরিক্ত জনসংখ্যা নিয়ে ভীতি কি ভুল ধারণা থেকে এসেছিল
জনসংখ্যাবিশেষজ্ঞ ডিন স্পিয়ার্সের মতে, অতিরিক্ত জনসংখ্যা নিয়ে ভীতি আসলে একটি ভুল ধারণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল। ভন ফোরস্টার বা পল এরলিচের মতো গবেষকেরা গণমাধ্যম ও জনমানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারলেও, তাঁরা কেউ জনসংখ্যা বিজ্ঞানের বিশেষজ্ঞ ছিলেন না। ভন ফোরস্টার ছিলেন পদার্থবিজ্ঞানী ও দার্শনিক, আর এরলিচ ছিলেন প্রজাপতিবিষয়ক জীববিজ্ঞানী।
১৯৬০ সালে ‘সায়েন্স’ সাময়িকীতে ওই গবেষণাপত্র প্রকাশের পর তৎকালীন আসল বিশেষজ্ঞরা বিজ্ঞানচিন্তার জায়গা থেকেই তীব্র প্রতিবাদ জানান। তাঁরা লিখেছিলেন, বিশ্ব জনসংখ্যা যে একইভাবে বাড়তেই থাকবে—এমনটা ভাবার কোনো বৈজ্ঞানিক কারণ নেই।
