যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, বাংলাদেশে গমভিত্তিক খাদ্যের মোট চাহিদার ৮০ শতাংশেরও বেশি আমদানির মাধ্যমে পূরণ হয়। গত বিপণন বছরে দেশে প্রায় ৭৪ লাখ টন গম আমদানি হয়েছিল।
দেশের জনসংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। এতে ভূমির ব্যবহার ও এর ওপর চাপও বাড়ছে। এতে এরই মধ্যে কৃষিজমির পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। কমেছে জমির পুষ্টিগুণও। তার পরও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, উচ্চফলনশীল বীজ, সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন করে সীমিত জমিতে বিপুল পরিমাণ ফসল উৎপাদন করা সম্ভব। এক্ষেত্রে দেশ অনেকটা এগোলেও আজও কিছু কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় এগুলোর ব্যবহার বাড়ানো যায়নি; বহু সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। অন্যদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ শস্য নষ্ট হয়, যার অন্যতম উদাহরণ হলো প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে হাওরাঞ্চলের ধান তলিয়ে যাওয়া। অর্থাৎ ফসল উৎপাদনের সঙ্গে দুর্যোগ মোকাবেলা ব্যবস্থাপনাকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হয়নি। ফলে স্বাভাবিকভাবে সময়ের পরিক্রমায় কৃষি উৎপাদন বাড়লেও তা কমই রয়ে গেছে। বাড়তি চাহিদা পূরণে আমদানিনির্ভর হতে হয়েছে। তাছাড়া যুগে যুগে জনগণের চাহিদা তথা খাদ্যাভ্যাসেও ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। সুতরাং পর্যাপ্ত উৎপাদন নিশ্চিত করতে হলে এমন কৌশল প্রয়োজন যেখানে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, কৃষিজমির পরিস্থিতি, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকির পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাসের ধরন এসব কেন্দ্রে থাকবে। কিন্তু বাংলাদেশের খাদ্য উৎপাদন পরিকল্পনায় এগুলোর ঘাটতি রয়ে গেছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, বাংলাদেশে গমভিত্তিক খাদ্যের মোট চাহিদার ৮০ শতাংশেরও বেশি আমদানির মাধ্যমে পূরণ হয়। গত বিপণন বছরে দেশে প্রায় ৭৪ লাখ টন গম আমদানি হয়েছিল। এছাড়া জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্যও বলছে, ২০২৬-২৭ বিপণন বছরে (জুলাই-জুন) বাংলাদেশে মোট খাদ্যশস্য আমদানির প্রয়োজন হতে পারে ৯১ লাখ টন। এর মধ্যে গম আমদানির পরিমাণ ৬৮ লাখ টন এবং ভুট্টা ১৮ লাখ টন হতে পারে। মানুষের খাদ্য ও পশুখাদ্য—উভয় ক্ষেত্রের চাহিদা পূরণে এগুলো আমদানির প্রয়োজন রয়েছে। এর অর্থ হলো, বিপুল পরিমাণ চাহিদা থাকার পরও দেশে গম বা ভুট্টার মতো খাদ্যশস্যের উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেই।
অথচ ক্রমেই দেশে খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। চলতি বছর সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরে তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সংখ্যা দাঁড়াতে পারে ১ কোটি ৮১ লাখ, যা বছরের শুরুর তুলনায় ২৮ লাখ বেশি বলে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) তথ্য জানাচ্ছে। এছাড়া চলতি বছরের গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্সের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ১২২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৪তম। এ সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ১৯ দশমিক ২। এ অনুযায়ী দেশে ক্ষুধার মাত্রা ‘মাঝারি’ পর্যায়ে রয়েছে।
আরো উদ্বেগের বিষয় হলো দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি। খাদ্য উৎপাদন বা আমদানি করাই যথেষ্ট না, যদি তা জনগণের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে থাকে। খাদ্যের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও পুষ্টির চাহিদাও বিবেচনায় নিতে হবে। উৎপাদন বাড়লেও খাদ্যপণ্য সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে থাকলে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না।
এ বাস্তবতায় উৎপাদন কৌশলে পরিবর্তন জরুরি। কোন এলাকায় কোন ফসলের চাহিদা বেশি, কোথায় কোন ফসল উৎপাদন উপযোগী এবং জলবায়ুর ঝুঁকি কী ধরনের—এসব বিবেচনায় অঞ্চলভিত্তিক পরিকল্পনা করতে হবে। বন্যাপ্রবণ এলাকায় স্বল্পমেয়াদি ও জলমগ্নতা সহনশীল জাত, উপকূলে লবণাক্ততাসহিষ্ণু জাত এবং খরাপ্রবণ এলাকায় পানিসাশ্রয়ী প্রযুক্তির সম্প্রসারণ প্রয়োজন। পাশাপাশি কৃষকের কাছে আবহাওয়ার পূর্বাভাস পৌঁছানো, দ্রুত ফসল কাটার যন্ত্রের প্রাপ্যতা, কৃষি বীমার কার্যকর ব্যবস্থা এবং দুর্যোগের পর পুনরায় চাষের জন্য আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
তবে উৎপাদন পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে জনগণের প্রকৃত চাহিদা। চালের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি গম, ভুট্টা, ডাল, তেলবীজ, শাকসবজি ও ফলের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে ফসলের বৈচিত্র্য বাড়ানো জরুরি। পোলট্রি ও প্রাণিসম্পদ খাতের সম্প্রসারণের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পশুখাদ্যের সরবরাহ পরিকল্পনা করতে হবে। এছাড়া একই জমিতে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি ফসলের বৈচিত্র্য, মাটির উর্বরতা ও পানিসম্পদের টেকসই ব্যবহারে গুরুত্ব দিতে হবে।
কৃষি উৎপাদনের জন্য জলবায়ু পরিবর্তন আরেকটি বড় ঝুঁকি। বন্যা, আকস্মিক বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও লবণাক্ততা সরাসরি ফসলের উৎপাদনকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ২০২৪ সালে ঘূর্ণিঝড় রেমাল ও পরবর্তী বন্যায় ১ লাখ ৯১ হাজার হেক্টরের বেশি জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বলে এফএও জানিয়েছে। এর মধ্যে রেমালের প্রভাবে উপকূলীয় আট জেলায় ৬২ হাজার ৭৮৩ হেক্টর কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আবার ২০২৬ সালের মে মাসে অতিবৃষ্টি ও উজানের পানিতে হাওরাঞ্চলে ৪৬ হাজার হেক্টরের বেশি জমির বোরো ধান তলিয়ে যাওয়ার কথা জানা যায়। এ ধরনের দুর্যোগ শুধু এক মৌসুমের উৎপাদন কমায় না; কৃষকের আয়, পরবর্তী মৌসুমে চাষের সম্ভাবনা এবং বাজারে খাদ্য সরবরাহকেও প্রভাবিত করে।
খাদ্যশস্য উৎপাদনে বাংলাদেশের অর্জন গুরুত্বপূর্ণ হলেও ভবিষ্যতের চাহিদা পূরণে শুধু অতীতের সাফল্যের ওপর নির্ভর করার সুযোগ নেই। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, কৃষিজমির সংকোচন ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে কৃষি গবেষণা, উৎপাদন পরিকল্পনা, বাজার ব্যবস্থাপনা এবং দুর্যোগ মোকাবেলার মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থাপনাকে জনগণের খাদ্য ও পুষ্টির চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবেলায় সক্ষম করে তুলতে পারলেই আমদানিনির্ভরতা কমবে। পাশাপাশি খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার পথ সুগম হবে।
