কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা কেলেঙ্কারিতে কোটি কোটি ব্যবহারকারীর তথ্য সম্মতি ছাড়া ব্যবহারের মামলায় মেটাকে ২৫০০ কোটি ডলার জরিমানার নির্দেশ দিয়েছে নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের এক আদালত।
গ্রাহকদের বিভ্রান্ত করা ও ভোক্তা সুরক্ষা আইন লঙ্ঘনের দায়ে বুধবার দেওয়া রায়ে জুরি বোর্ড মেটাকে দোষী সাব্যস্তের পর ফেইসবুকের মূল কোম্পানিটির বিরুদ্ধে এই কঠোর শাস্তিমূলক আদেশ জারি করা হল বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান।
ডনাল্ড ট্রাম্পের ২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন প্রচারাভিযানের সঙ্গে যুক্ত যুক্তরাজ্যভিত্তিক রাজনৈতিক পরামর্শক কোম্পানি কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা সম্মতি ছাড়াই কোটি কোটি গ্রাহকের তথ্য হাতিয়ে নিয়েছিল।
রায়ের পর আদেশে বিচারক ফ্রান্সিস ম্যাথিউ বলেছেন, “ফেইসবুকের অপকর্ম, যা বছরের পর বছর ধরে চলেছে ও ধারাবাহিকভাবে জনগণের সামনে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে তা কোম্পানিটির মূল ব্যবসায়িক কার্যক্রমের নৈতিক ভিত্তিকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।”
মার্কিন অঙ্গরাজ্যটির আইন অনুসারে মেটার এ অপরাধের জন্য জরিমানা ২১,৯০০ কোটি ডলারেরও বেশি হওয়া উচিত ছিল। তবে বিচারিক বিবেচনা থেকে তিনি সেই জরিমানার পরিমাণ কমিয়ে ২৫০০ কোটি ডলারে নির্ধারণ করেছেন।
আদালতের রায় নিয়ে গার্ডিয়ানের মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি মেটা।
সামাজিক মাধ্যমের নিরাপত্তা নিশ্চিতে গাফিলতি সংক্রান্ত বিভিন্ন মামলা নিষ্পত্তিতে জরিমানার অংক এখন এত বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, মেটার মূল ব্যবসায়িক মুনাফায় তা স্পষ্ট প্রভাব ফেলছে।
বিচারকের আদেশ পাওয়ার পর দিনই প্রকাশ পাওয়া মেটার ত্রৈমাসিক আয় প্রতিবেদনে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে ৯৯০ কোটি ডলারের এক মামলা নিষ্পত্তির ধাক্কায় তাদের নিট মুনাফা ওয়াল স্ট্রিট বিশ্লেষকদের পূর্বাভাসের চেয়ে অনেকটাই কমেছে।
এর আগে, গেল অগাস্টে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে দায়ের হওয়া একগুচ্ছ মামলা নিষ্পত্তিতে ১৭০০ কোটি ডলার জরিমানা করা হয়েছিল প্রযুক্তি জায়ান্টটিকে।
ডজন খানেক অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেলরা সেই মামলায় অভিযোগ তুলেছিলেন, মেটা জেনেশুনে এমন ক্ষতিকর ও আসক্তিকর ফিচার তৈরি করেছে, যা শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করেছে।
এত বিপুল অংকের অর্থ পরিশোধের ধকলের পরও মেটা তাদের ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পেরেছে। এ প্রান্তিকে কোম্পানিটির রাজস্ব আয় ২৬ শতাংশ বেড়ে ৬ হাজার ৪৬০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে।
কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা নামে থার্ড পার্টির তৈরি এক মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করে প্রায় ৮ কোটি ৭০ লাখ ফেইসবুক ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নিয়েছিল– এমন তথ্য প্রকাশের পর ২০২১ সালে নিউ মেক্সিকোর অ্যাটর্নি জেনারেল মেটার বিরুদ্ধে এই আইনি লড়াই শুরু করেন।
ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্যে কাদের প্রবেশাধিকার ছিল, প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়া বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও ভুয়া তথ্য কীভাবে সামলানো হয় এবং মেটার অন্যান্য অভ্যন্তরীণ নীতি সম্পর্কে নিউ মেক্সিকোর ফেইসবুক ব্যবহারকারীদের কাছে মিথ্যা তথ্য দেওয়ার অভিযোগ এনেছে অঙ্গরাজ্য কর্তৃপক্ষ।
নিউ মেক্সিকোর দাবি, থার্ড পার্টির হাতে ব্যবহারকারীদের তথ্যের অবাধ প্রবেশাধিকার থাকার বিষয়টি মেটার জানা ছিল। কোম্পানির আর্থিক লাভের কারণে তারা বিদ্বেষমূলক বক্তব্য বা ক্ষতিকর কনটেন্ট ছড়ানো এড়িয়ে চলেছে।
সামাজিক মাধ্যমের নিরাপত্তার বিষয়ে বছরজুড়েই মামলার মুখে পড়েছে মেটা। একাধিক মামলার এই পরিণতিকে সামাজিক মাধ্যমের জন্য তামাক শিল্পের মতো বড় এক ধাক্কা বা ‘বিগ টোব্যাকো মোমেন্ট’ হিসেবে দেখছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
২৫ সেপ্টেম্বর আদালতের জুরি বোর্ড সিদ্ধান্তে বলেছে, এসব বিষয়ে কোম্পানি ও এর শীর্ষ কর্মকর্তাদের দেওয়া ২৯টি বক্তব্যের মধ্যে ২৬টিই ছিল বিভ্রান্তিকর।
জুরিদের মতে, প্রতিটি বিভ্রান্তিকর বক্তব্যের দর্শক হওয়া ফেইসবুক ব্যবহারকারী বা নিউ মেক্সিকোবাসীদের সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে কোম্পানিটি অঙ্গরাজ্যের ভোক্তা সুরক্ষা আইনের ৪ কোটি ৩০ লাখেরও বেশিবার লঙ্ঘন ঘটিয়েছে।
রায়ের পর নিউ মেক্সিকোর অ্যাটর্নি জেনারেল রাউল তোরেস বলেছেন, অঙ্গরাজ্যের আইন অনুসারে প্রতি লঙ্ঘনে সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার ডলার পর্যন্ত জরিমানার সুযোগ রয়েছে ও এর পুরো অর্থ নিউ মেক্সিকোর স্কুল ব্যবস্থার তহবিলে যাবে।
১ অক্টোবর এক শুনানিতে নিউ মেক্সিকোর পক্ষের আইনজীবী র্যান্ডি ম্যাকগিন বিচারক ম্যাথিউর কাছে অঙ্গরাজ্যের জন্য ৩ হাজার ৫০০ কোটি থেকে চার হাজার কোটি ডলার অর্থ বরাদ্দের অনুরোধ জানান।
সংবিধান নির্দেশিত আইনের প্রক্রিয়া ও জুরি বোর্ডের রায়ের ভিত্তিতে এই দাবি যুক্তিসঙ্গত বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।
“মেটা একমাত্র অর্থ ও তাদের শেয়ারের বাজারদরের ভাষায় বোঝে, আদালতের উচিত সেই ভাষাতেই তাদের সঙ্গে কথা বলা।”
অন্যদিকে, আদালত নথিতে বিচারক ম্যাথিউকে জরিমানার পরিমাণ সর্বোচ্চ ৩৪৫ কোটি ডলারে সীমিত রাখার অনুরোধ জানায় মেটা।
কোম্পানিটি যুক্তি, এর চেয়ে বেশি জরিমানা করা হলে তা অন্যান্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে অঙ্গরাজ্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করার ঝুঁকি তৈরি করবে।
আদালত নথিতে মেটা দাবি করেছে, তারা কোনো ব্যবহারকারীর তথ্য বিক্রি করে না ও কোনো ভোক্তা যে বাস্তবে বিভ্রান্ত হয়েছেন নিউ মেক্সিকো তা প্রমাণ করতে পারেনি।
নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের দায়ের করা মামলায় গত ছয় মাসের মধ্যে সান্তা ফে জুরি বোর্ডের দেওয়া এটা দ্বিতীয় রায়।
এর আগে, মার্চে শেষ হওয়া প্রথম বিচারে সান্তা ফে জুরি বোর্ড মেটাকে ফেইসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপে তরুণ ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তার বিষয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে ৩৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার দেওয়ানি জরিমানার নির্দেশ দিয়েছেন।
সেই বিচারের দ্বিতীয় পর্যায় শেষে বিচারক মেটাকে নিউ মেক্সিকোর তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত তহবিলে ৫৬ কোটি ৭০ লাখ ডলার জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন।
একইসঙ্গে মেটাকে নিউ মেক্সিকোর টিনএজার ফেইসবুক ও ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারীদের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ বাস্তবায়নের আদেশ দিয়েছেন বিচারক।
