ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে রাজধানীসহ সারা দেশে পরিচ্ছন্নতা অভিযান, মশার ওষুধ ছিটানো, এডিস মশার লার্ভা ধ্বংস এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা প্রস্তুতি জোরদারের পাশাপাশি চিকিৎসকদেরও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তবে, এসব উদ্যোগের পরও ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও মৃত্যু কমছে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত মশকনিধন কার্যক্রমের পাশাপাশি এডিস মশার প্রকৃত প্রজননস্থল শনাক্ত ও ধ্বংস, ব্যবহৃত কীটনাশকের কার্যকারিতা নিয়মিত যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা না গেলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করা কঠিন হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ২২ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ১৮ হাজার ৫০২ জন। এ সময়ে মৃত্যু হয়েছে ৩৬৮ জনের। যার মধ্যে সেপ্টেম্বর মাসে আক্রান্ত হয়েছেন ৪৩ হাজার ৭৭৪ জন ও মৃত্যু হয়েছে ১৪৮ জনের। আর অক্টোবর মাসে এ পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন ৩৮ হাজার ৮৮২ জন ও মৃত্যু হয়েছে ১২৩ জনের। এমন পরিস্থিতিতে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ ও মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
তিন মাসের বিশেষ কর্মসূচি
ডেঙ্গু প্রতিরোধে সেপ্টেম্বরে দেশব্যাপী তিন মাসের বিশেষ পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি উদ্বোধন করা হয়। এতে সরকারি সংস্থার পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবক, শিক্ষার্থী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সম্পৃক্ত করা হয়েছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এলাকায় লার্ভিসাইডিং, ফগিং, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, জনসচেতনতামূলক প্রচার এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের কার্যক্রম চলছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন তাদের ৭৫টি ওয়ার্ডকে ১০টি অঞ্চলে ভাগ করে সমন্বিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বর্ষার আগের জরিপে এসব ওয়ার্ডের মধ্যে ৬৩টিকে ডেঙ্গুর ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। অন্যদিকে, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনও নিয়মিত মশার ওষুধ ছিটানো, লার্ভা ধ্বংস ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করার কাজ করছে।
তবে, এসব কার্যক্রমের পাশাপাশি মশার ঘনত্ব কতটা কমছে, ব্যবহৃত ওষুধ কতটা কার্যকর হচ্ছে এবং কোন এলাকায় নতুন করে প্রজননস্থল তৈরি হচ্ছে, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রজননস্থল ধ্বংসে গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা
এডিস মশা শুধু নালা বা সড়কের পাশে জন্মায় না। বাড়ির ছাদ ও বারান্দায় জমে থাকা পানি, ফুলের টব, পানির ট্যাংক, নির্মাণাধীন ভবন, বেজমেন্ট ও গাড়ি রাখার জায়গায়ও মশার প্রজনন হতে পারে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বলেন, অক্টোবর ও নভেম্বরে ডেঙ্গু পরিস্থিতি উদ্বেগজনক থাকতে পারে। গত কয়েকবছর এসময়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যু বেশি ছিল। পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতির জন্য ডিসেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে।
তিনি বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে প্রথম কাজ হলো এডিস মশার প্রজননস্থল শনাক্ত করা। কোথায় মশা বংশবিস্তার করছে, কোন ধরনের স্থানে লার্ভা বেশি পাওয়া যাচ্ছে এবং ব্যবহৃত কীটনাশক কতটা কার্যকর এসব বিষয়ে নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন। প্রজননস্থল শনাক্ত না করে নির্বিচারে কীটনাশক ছিটালে সুফল মিলবে না।
তিনি আরও বলেন, এডিস মশা শুধু নালা বা সড়কের পাশে জন্মায় না। বাড়ির ছাদ ও বারান্দায় জমে থাকা পানি, ফুলের টব, পানির ট্যাংক, নির্মাণাধীন ভবন, বেজমেন্ট ও গাড়ি রাখার জায়গায়ও মশার প্রজনন হতে পারে। এসব স্থানে নজর না দিলে রাস্তা ও নালা পরিষ্কার করার পরও মশার বিস্তার অব্যাহত থাকতে পারে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ফগিং, মৌসুমি পরিদর্শন কিংবা কারও বাসায় পানি জমে থাকলে জরিমানা করার ওপর নির্ভর করে এডিস মশা পুরোপুরি নির্মূল করা যাবে না। নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত যানবাহন, খোলা ড্রাম, ভাঙা পাত্র ও ছাদে জমে থাকা পানিতে নিয়মিত লার্ভা ধ্বংস করতে হবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলছেন, সরকার ব্যর্থ হয়নি
সরকার সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে; তবে ডেঙ্গু সম্পূর্ণ নির্মূল হয়ে গেছে এমন দাবি সরকার কখনো করেনি: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন ডেঙ্গু পরিস্থিতির বিষয়ে বলেন, ডেঙ্গু ভাইরাসের ধরনে পরিবর্তন এসেছে এবং কিছু রোগীর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হচ্ছে। চিকিৎসকদের প্লাজমা লিকেজের বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সরকার ব্যর্থ হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, চিকিৎসকেরা নির্ধারিত চিকিৎসা নির্দেশিকা অনুসরণ করছেন। প্রতি শনিবার পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো হচ্ছে, পূর্ণবয়স্ক মশা মারতে ওষুধ ছিটানো হচ্ছে এবং লার্ভা ধ্বংসে ওষুধ প্রয়োগ করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, জনঘনত্ব এবং মানুষের অসচেতনতার কারণে বিভিন্ন স্থানে পানি জমে এডিস মশার প্রজননস্থল তৈরি হচ্ছে। ছাদে ফুলের টবসহ বিভিন্ন পাত্রে জমে থাকা পানি এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে। সরকার সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে; তবে ডেঙ্গু সম্পূর্ণ নির্মূল হয়ে গেছে এমন দাবি সরকার কখনো করেনি।
