বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ ক্যাম্পাসে নির্মাণাধীন ভবনটি শুধু বই পড়ার জায়গা নয়; বরং পাঠ, গবেষণা, প্রযুক্তি, শিল্প-সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতার সমন্বিত কেন্দ্র হিসেবে পরিকল্পিত। স্থাপত্যের দিক থেকেও ভবনটির নকশায় রয়েছে ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য। বৃত্তাকার অবয়ব ও বিশাল কাঠামোয় রোমান স্থাপত্যের ঐতিহাসিক কলোসিয়ামের নকশার সঙ্গে সাদৃশ্যের কথা উঠে এসেছে।
এক ভবনে হাজারো শিক্ষার্থীর পাঠপরিসর
বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে আসনসংকট শিক্ষার্থীদের জন্য দীর্ঘদিনের সমস্যা। বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৪ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করলেও পুরনো গ্রন্থাগারে আসন রয়েছে মাত্র ৪৪৭টি। ফলে পরীক্ষার সময় কিংবা নিয়মিত পড়াশোনার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা পাওয়া অনেক শিক্ষার্থীর জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। আবাসিক হলের রিডিং রুমের সীমাবদ্ধতা ও গণরুমের ভিড়ও এই চাপ বাড়ায়।
নতুন গ্রন্থাগারে একসঙ্গে ছয়-সাত হাজার শিক্ষার্থীর বসার ব্যবস্থা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের পাঠের পরিবেশ উন্নত হওয়ার পাশাপাশি দলগত আলোচনা, গবেষণা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের জন্যও তৈরি হবে পৃথক পরিসর।
গ্রন্থাগারটিতে দেশি-বিদেশি রেফারেন্স বই, গবেষণা জার্নাল, সাময়িকী, সংবাদপত্র ও দুর্লভ প্রকাশনা সংরক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে। পাঠকদের প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন বিভাগে বই ও গবেষণাসামগ্রী সাজানো হবে। পাশাপাশি শিশুদের জন্য বিশেষ পাঠ কর্নার এবং প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের উপযোগী সুযোগ-সুবিধা রাখার উদ্যোগও রয়েছে। এর ফলে বিভিন্ন বয়স ও সক্ষমতার পাঠকের জন্য একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হবে।
প্রযুক্তিনির্ভর গবেষণা ও ডিজিটাল জ্ঞানভাণ্ডার
নতুন গ্রন্থাগারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে প্রযুক্তিনির্ভর পাঠ ও গবেষণার ব্যবস্থা। পরিকল্পনা অনুযায়ী এখানে থাকবে অডিও-ভিজ্যুয়াল সেন্টার, ভিডিও রেফারেন্স বিভাগ, ভিডিও রেকর্ডিং স্টুডিও, ভার্চ্যুয়াল রিয়েলিটি স্টুডিও এবং রেফারেন্স কিয়স্ক। এসব সুবিধা শিক্ষার্থীদের প্রচলিত বইয়ের পাশাপাশি ডিজিটাল মাধ্যমে জ্ঞান অর্জনের সুযোগ বাড়াবে।
আন্তর্জাতিক গ্রন্থাগার ও গবেষণা ডেটাবেইসের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে শিক্ষার্থীরা বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাসামগ্রী ও বৈজ্ঞানিক প্রকাশনা ব্যবহারের সুযোগ পাবেন। গবেষণাপত্র লেখা, তথ্যসূত্র ব্যবস্থাপনা এবং একাডেমিক কাজের জন্য এন্ডনোট ও জোটেরোর মতো সফটওয়্যার ব্যবহারের সুবিধাও রাখার কথা রয়েছে।
বিশেষায়িত গবেষণার জন্য থাকবে ডিজিটাল ম্যাপিং ও ভৌগোলিক তথ্যব্যবস্থা (জিআইএস) ল্যাব। এতে ভূগোল, পরিবেশবিজ্ঞান, নগর ও আঞ্চলিক পরিকল্পনাসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে গবেষণার সুযোগ আরও সম্প্রসারিত হতে পারে। পাশাপাশি অডিও-ভিডিও স্টুডিও এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত সুবিধা শিক্ষার্থীদের প্রেজেন্টেশন, তথ্যচিত্র নির্মাণ ও বহুমাধ্যমভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রমে সহায়তা করবে।
গবেষণা, আর্কাইভ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস
ভবনটির বিভিন্ন তলায় পাঠ ও গবেষণার জন্য আলাদা ব্যবস্থা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। নিচতলায় কেন্দ্রীয় সার্ভিস বিভাগ, প্রশিক্ষণকেন্দ্র ও জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটি প্রেসের জন্য স্থান নির্ধারণের কথা রয়েছে। দ্বিতীয় তলায় পাঠ্যবই, ম্যাগাজিন, সংবাদপত্র, রেফারেন্স বই এবং শিশু ও প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সংগ্রহ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
তৃতীয় তলায় গবেষণা পরামর্শকক্ষ, সাহিত্য বিভাগ, ভিডিও রেফারেন্স সেকশন এবং ডিজিটাল গবেষণার সুবিধা থাকবে। বিশেষ করে ডিজিটাল ম্যাপিং ও জিআইএস ল্যাব গবেষকদের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। চতুর্থ তলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস, গবেষণাপত্র, গুরুত্বপূর্ণ দলিল ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য আর্কাইভ গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া গ্রুপ ডিসকাশন রুম, সেমিনার হল ও আর্ট গ্যালারির মতো সুবিধা গ্রন্থাগারটিকে পাঠের গণ্ডি ছাড়িয়ে বহুমাত্রিক জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রে পরিণত করতে পারে। শিক্ষার্থীরা সেখানে দলগতভাবে কাজ করতে পারবেন, গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করতে পারবেন এবং শিল্প-সাহিত্যভিত্তিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারবেন।
পাঠের পাশাপাশি স্বস্তির পরিবেশ
একটি আধুনিক গ্রন্থাগারে শুধু বই ও আসনের ব্যবস্থা থাকলেই চলে না; প্রয়োজন দীর্ঘ সময় পড়াশোনার উপযোগী স্বস্তিদায়ক পরিবেশও। সে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নতুন ভবনে ক্যাফে, লাউঞ্জ ও ৩০টি বিশ্রামকক্ষ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ওপেন রিডিং স্পেসসহ এমন কিছু সুবিধা থাকবে, যা শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ সময় অবস্থান ও পড়াশোনাকে আরও সহজ করতে পারে।
পুরনো সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে নতুন প্রত্যাশা
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরনো কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার ভবনের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৮৫ সালে। সময়ের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ও গবেষণার পরিধি বাড়লেও গ্রন্থাগারের আসনসংখ্যা ও অবকাঠামো সেই চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। নতুন কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার নির্মাণের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের সেই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
