নিজস্ব প্রতিবেদক, সুনামগঞ্জ · ১২ অক্টোবর, ২০২৬ ১:৪১ অপরাহ্ন
সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায় ইজারাবিহীন কাপনা খাল ও ধোপাজান নদী থেকে বালু উত্তোলন এবং সড়কপথে পরিবহনের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, রাতের আঁধারে ট্রলি, নসিমন ও পিকআপ ভ্যানে করে এসব বালু বিভিন্ন এলাকায় নেওয়া হচ্ছে। এতে মথুরকান্দি সড়ক, বসতভিটা ও কৃষিজমি ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বালু উত্তোলন ও পরিবহনের সঙ্গে জড়িত একটি চক্রের তৎপরতায় তারা প্রতিবাদ করতে সাহস পাচ্ছেন না। বালু পরিবহনের দৃশ্য ধারণ করতে গিয়ে এক সাংবাদিকের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পুলিশ জানিয়েছে, অবৈধ বালু উত্তোলন ও পরিবহনের তথ্য তাদের জানা নেই।
সরেজমিনে উপজেলার সলুকাবাদ ইউনিয়নের মথুরকান্দি-কাপনা এলাকায় গিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের চিত্র দেখা যায়। স্থানীয়দের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে বালু তোলার কারণে খাল ও জমির স্বাভাবিক আকৃতিতে পরিবর্তন এসেছে। এভাবে বালু উত্তোলন চলতে থাকলে মথুরকান্দি সড়কসহ আশপাশের বসতভিটা ও কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
মথুরকান্দির বাসিন্দা মো. শামসুল ইসলাম বলেন, রাত ১টার পর থেকে ট্রলি, নসিমন ও পিকআপ ভ্যানে করে কাপনা খাল থেকে বালু নেওয়া হয়। বারবার প্রতিবাদ করেও কোনো ফল হচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে এলাকার রাস্তাঘাট ধ্বংস হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
এলাকাবাসীর দাবি, চালবন, বাঘবেড়, মথুরকান্দি, কাপনা ও কারেন্টবাজার সড়ক দিয়ে দিন-রাত বালু পরিবহন করা হয়। দিনের তুলনায় রাতে বালুবোঝাই যানবাহনের সংখ্যা বেশি থাকে। রাতের বেলায় অর্ধশতাধিক যানবাহনে বালু পরিবহনের অভিযোগ করেছেন তারা।
অবৈধভাবে বালু পরিবহনের কথা স্বীকার করেছেন কয়েকজন চালকও। নাম প্রকাশ না করার শর্তে পলাশ বাজার এলাকার এক ট্রলিচালক বলেন, জীবিকার তাগিদে তিনি এ কাজে যুক্ত হয়েছেন। কাপনা এলাকার আরেক চালক জানান, তিনি খাল থেকে বালু বোঝাই করছিলেন। রুমেল ও সাকিল নামের দুই ব্যক্তি তাকে বালু পরিবহনের কথা বলেছেন বলে দাবি করেন তিনি। তবে এ বিষয়ে ওই দুই ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
কারেন্টবাজার এলাকার এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, রাতে মথুরকান্দি সড়ক দিয়ে অনেক বালুবোঝাই ট্রলি চলাচল করে। এর পেছনে একটি চক্র রয়েছে বলে দাবি করে তিনি বলেন, ভয়ে অনেকে প্রতিবাদ করেন না। কয়েক দিন আগে বালু পরিবহনের ভিডিও ধারণ করায় এক সাংবাদিকের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
পলাশ ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য শফিকুল ইসলাম বলেন, রাতে কিছু বালুবোঝাই ট্রলি চলাচল করে। তবে এর সঙ্গে তাদের কারও সম্পৃক্ততা নেই। এক সাংবাদিক বালু পরিবহনের ভিডিও ধারণ করায় তার ওপর চড়াও হওয়ার খবর তিনি পেয়েছেন। পরে বিষয়টি বসে মীমাংসা করে দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। তবে বালু কারা উত্তোলন ও পরিবহন করছেন, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট করে কিছু বলতে পারেননি এই জনপ্রতিনিধি।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, কারেন্টবাজার এলাকার ব্যবসায়ী রুমেল বালু পরিবহনের এ কার্যক্রমে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে রুমেল বলেন, তিনি কোনো অবৈধ বালু বিক্রির কার্যক্রম পরিচালনা করেন না।
সুনামগঞ্জ পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ফজলুল করিম সাইদ বলেন, বিশ্বম্ভরপুরের কাপনা খাল ও ছড়া এবং সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার ধোপাজান নদী থেকে বালু উত্তোলনের কারণে পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, ধোপাজান নদীতে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হলেও এর কার্যকারিতা ও নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বালু উত্তোলন বন্ধে প্রশাসন ও পুলিশকে কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।
এদিকে বালু উত্তোলন বন্ধে সংশ্লিষ্ট এলাকা পরিদর্শন করেছেন বিশ্বম্ভরপুরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সকিনা আক্তার। তিনি বলেন, চালবনে স্থাপন করা সিসি ক্যামেরাটি বর্তমানে অচল। ক্যামেরাটি পুনরায় চালু করে সেখানে পুলিশের ভূমিকা পর্যবেক্ষণ করা হবে।
ইউএনও আরও বলেন, স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে এলাকাবাসীকে সঙ্গে নিয়ে বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে বলা হবে। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদে সচেতনতামূলক কমিটি গঠনের বিষয়েও পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
বিশ্বম্ভরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আহাদ উল্যা ভূঁইয়া বলেন, বালু লুটের বিষয়ে তাদের কাছে তথ্য নেই। এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
গুগলে আমাদের খবর পেতে
