গঞ্জের আলীর স্ত্রী ও মেয়ে পেছনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন (বায়ে)। তাদের পাশে পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন রিফাজুল ইসলামের ভাই। সামনে চেয়ারে বসে আছেন বাবলু হোসেনের দুই ভাই। সম্প্রতি মেহেরপুরের গাংনীর রুইয়েরকান্দি গ্রামে। ছবি: খবরের কাগজ
পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন নিয়ে স্থানীয় দালালের মাধ্যমে ২০১২ সালে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে বাড়ি ছেড়েছিলেন মেহেরপুরের গাংনীর রুইয়েরকান্দি গ্রামের চার যুবক গঞ্জের আলী, আহাদ আলী, রিফাজুল ইসলাম ও বাবলু হোসেন। কিন্তু ঢাকায় পৌঁছানোর পর তাদের সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর ১৪ বছর পেরিয়ে গেলেও তাদের খোঁজ মেলেনি। স্বজনদের অভিযোগ, নিখোঁজদের সন্ধান চাইতে গিয়ে দালালদের হুমকি ও মারধরের শিকার হতে হয়েছে তাদের। দালালচক্রের সদস্যরা প্রভাবশালী হওয়ায় ভয়ে মুখ খুলতেও সাহস পাচ্ছেন না পরিবারের সদস্যরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১২ সালে মালয়েশিয়া পাঠানোর কথা বলে গাংনীর হেমায়েতপুর গ্রামের আবুল কাশেম ও চুয়াডাঙ্গার হাঁটুভাঙ্গা গ্রামের আকিম উদ্দিনের মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার উদ্যোগ নেন ওই চার যুবক।
নিখোঁজ আহাদ আলীর স্ত্রী শরিফা খাতুন বলেন, ‘আমার স্বামী পাশের গ্রামের কাশেমের মাধ্যমে ১৪ বছর আগে মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বের হন। এরপর আর কখনো তার সঙ্গে যোগাযোগ হয়নি। দীর্ঘদিন কষ্ট করে ছেলেমেয়েদের মানুষ করেছি। কাশেমের সঙ্গে যোগাযোগ করলে ভয়ভীতি দেখিয়েছে। থানায় গেলে ক্ষতি করার হুমকি দেওয়ায় সেখানেও যেতে পারিনি।’
আরও পড়ুন
নিখোঁজ রিফাজুল ইসলামের স্ত্রী আঁখি আক্তার বলেন, ‘১৪ বছর ধরে আমার স্বামীর কোনো খোঁজখবর পাইনি। বিদেশ যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর ফোন করে জানিয়েছিলেন, তিনি সমুদ্রপথে যাচ্ছেন। তাদের সঙ্গে ৩০০ থেকে ৩৫০ জন মানুষ ছিলেন। এরপর তাদের কারও কোনো খোঁজখবর পাওয়া যায়নি।’
নিখোঁজ গঞ্জের আলীর মেয়ে ফিরোজা খাতুন বলেন, ‘আমার বাবার নিখোঁজের ঘটনায় দালালের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিয়েছি। আদালতে মামলা চলছে। তবে দালাল নিখোঁজ থাকায় পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।’
স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত দালাল চক্রের সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় নেই। তাদের বাড়িঘর তালাবদ্ধ। কেউ সেখানে থাকেন না, তারাও আর এলাকায় আসেন না। যাদের বিদেশে পাঠানো হয়েছিল, তাদেরও কোনো খোঁজ নেই। যারা পাঠিয়েছেন, তাদেরও সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। তবে শুনেছি তারা ঢাকার দিকে থাকেন। ভয়ে গ্রামে আসেন না।’
মেহেরপুরে এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়। এর আগেও জেলার অনেক মানুষ বিদেশে পাঠানোর নামে দালালচক্রের প্রতারণার শিকার হয়েছেন। তবে দালালচক্রের প্রভাব ও ভয়ে অনেকে আইনি সহায়তা নিতে সাহস পাননি বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে গাংনী উপজেলার কাজিপুর গ্রামের ৬০ জনকে কম খরচে মালয়েশিয়া নেওয়ার স্বপ্ন দেখায় একটি দালাল চক্র। তাদের প্রলোভনে পড়ে কেউ শেষ সম্বল, কেউ ভিটেমাটি বিক্রি করেন। আবার কয়েকজন উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমান। সেখানে পৌঁছানোর পর তাদের জিম্মি করে আরও টাকা আদায় করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এভাবে মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে মালয়েশিয়া গিয়ে ফিরে আসা ব্যক্তিদের মধ্যে কাজিপুর গ্রামের নুরুজ্জামানের ছেলে শাহীন আলম, কাবের আলীর ছেলে রাজন আলী ও আনারুল ইসলামের ছেলে রেজাউল আলমের সঙ্গে আমরা কথা বলি।
শাহীন আলম বলেন, ‘মালয়েশিয়ায় নেওয়ার পর কোনো কাজ দেওয়া হয়নি। উল্টো একটি ঘরে আটকে রাখা হয়। প্রথমদিকে খাবার ও পানি দেওয়া হলেও পরে তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। খাবার চাইলে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হতো। আমাদের পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়ায় পালিয়েও যেতে পারিনি। পরে বাড়ি থেকে আবারও টাকা পাঠানোর পর আমাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। এখন দেশে ফিরে চাষাবাদ করে দিন পার করছি।’
রেজাউল আলম বলেন, ‘আমাদের অবৈধভাবে মালয়েশিয়ায় নেওয়া হয়েছিল। সেখানে যাওয়ার পর দালালরা কোনো কাজের ব্যবস্থা করতে পারেনি। উল্টো আমাদের জিম্মি করে রাখা হয়। পরে পরিবারের সদস্যরা আবারও টাকা পাঠানোর পর আমাদের মুক্তি দেওয়া হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা একেবারেই নিঃস্ব হয়ে গেছি। আমার অনুরোধ, কেউ যেন দালালদের মাধ্যমে অবৈধভাবে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করে আমাদের মতো নিঃস্ব না হন।’
এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সমাজের সচেতন ব্যক্তিরা। মেহেরপুরের সমাজসচেতক অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আল আমিন ধুমকেতু বলেন, ‘মানব পাচারকারীরা সব সময় অভাবগ্রস্ত মানুষদের লক্ষ্য করে। ভাগ্যের উন্নয়নে যারা কম খরচে বিদেশে যেতে চান, তাদেরই ফাঁদে ফেলেন তারা। কিন্তু কম খরচে বিদেশে যেতে গিয়ে ভাগ্যের উন্নয়নের বদলে অনেকেই মৃত্যুঝুঁকিতে পড়েন। আধুনিক এই যুগে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন উদ্যোগে মানুষকে সচেতন করতে হবে। মানবপাচার রোধে সচেতনতাই একমাত্র সমাধানের পথ দেখাতে পারে।’
মেহেরপুর জেলা পুলিশ সুপার আলী হায়দার চৌধুরী বলেন, ‘নিখোঁজের বিষয়ে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো সংশ্লিষ্ট থানায় লিখিত অভিযোগ করলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
