সন্তান আল্লাহর দেওয়া আমানত। কোরআনে মুমিনদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে নিজেকে ও পরিবারকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করতে (সুরা আত-তাহরিম, ৬)। আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। কাজেই প্রত্যেকেই নিজ অধীনস্থদের বিষয়ে জিজ্ঞাসার সম্মুখীন হবে। একজন পুরুষ তার পরিবার-পরিজনের দায়িত্বশীল, কাজেই সে তাদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। স্ত্রী স্বামীর ঘরের এবং তার সন্তানের দায়িত্বশীল, কাজেই সে তাদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। শোনো! তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। কাজেই প্রত্যেকেই আপন অধীনস্থদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। (বুখারি, ২৩৮৬)
এই দায়িত্ব পালনের একটি জনপ্রিয় কাঠামো হলো ‘৭-৭-৭ নীতি’। এতে সন্তানের প্রথম ২১ বছরকে সাত বছরের তিনটি ধাপে ভাগ করা হয়। প্রতিটি ধাপে অভিভাবকের ভূমিকা ভিন্ন। এই নীতিটির মূল কথা, ইসলামি উৎসের সঙ্গে এর সম্পর্ক এবং আধুনিক শিশু-মনোবিজ্ঞানের আলোকে এর বাস্তব প্রয়োগ আলোচনা করা হয়েছে।
আরও পড়ুন
উৎস সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
নীতিটি সাধারণত হজরত আলি (রা.)-এর নামে বর্ণিত হয়। প্রচলিত ভাষ্যটি এ রকম–সন্তান প্রথম সাত বছর ‘সর্দার’, পরের সাত বছর ‘অনুগত’, আর তার পরের সাত বছর ‘উপদেষ্টা বা সহযোগী’। এটি মুসলিম সমাজে প্রচলিত একটি লালন-পালন-দর্শন। যার মূল ভাব ইসলামের সাধারণ শিক্ষার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।
আরও পড়ুন
যে বিষয়গুলো প্রমাণিত, তা হলো সাত বছর বয়সে নামাজের নির্দেশ দেওয়া, ১০ বছরে এ বিষয়ে কঠোর হওয়া এবং শয্যা আলাদা করা (আবু দাউদ, ৪৯৫)। এছাড়া রাসুল (সা.)-এর শিশুদের প্রতি অপরিসীম স্নেহ সহিহ বর্ণনায় বারবার এসেছে।
তিন ধাপের বিশ্লেষণ
প্রথম ধাপ: ০-৭ বছর, স্নেহ ও নিরাপত্তার সময়। এ সময় শিশুর সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ভালোবাসা, নিরাপত্তা ও খেলাধুলার সুযোগ। রাসুল (সা.) নাতি হাসান (রা.)-কে চুমু খেলে এক সাহাবি বলেছিলেন, তার ১০টি সন্তান থাকলেও তিনি কাউকে চুমু খাননি। রাসুল (সা.) উত্তরে বলেন, যে দয়া করে না, তাকে দয়া করা হয় না (বুখারি, ৬১৩)।
তিনি সিজদায় থাকা অবস্থায় নাতিরা পিঠে উঠলে সিজদা দীর্ঘ করতেন, যাতে তাদের আনন্দে বিঘ্ন না ঘটে।
মনোবিজ্ঞানের মতে, আবেগ-বিকাশের গবেষণায় প্রথম কয়েক বছরের নিরাপদ বন্ধন ভবিষ্যৎ আত্মবিশ্বাস ও সম্পর্ক গড়ার ভিত্তি বলে বিবেচিত। এই বয়সে শিশু খেলার মাধ্যমেই শেখে। তাই তাদের নিয়ে করণীয় হলো–ক. নিয়মিত কোলে নেওয়া, গল্প বলা ও একসঙ্গে খেলা। খ. সহজ দোয়া, ছোট সুরা ও আল্লাহর নাম সুন্দর ও সহজ ভাষায় শেখানো।
গ. ভালো আচরণ নিজে করে দেখানো। কারণ শিশু উপদেশের চেয়ে অনুকরণ করে বেশি শেখে।
এখানে লক্ষণীয় হলো, ‘সর্দার’ কথাটির অর্থ সীমাহীন প্রশ্রয় নয়। স্নেহের সঙ্গে ন্যূনতম সীমারেখা (যেমন–নিরাপত্তা, সত্য বলা) থাকা দরকার।
দ্বিতীয় ধাপ: ৭-১৪ বছর, শিক্ষা ও শৃঙ্খলার সময়
এ সময় ইবাদত, আদব, দায়িত্ববোধ ও নৈতিকতার প্রশিক্ষণ শুরু হয়। সাত বছরে নামাজের নির্দেশ এবং ১০ বছরে এ বিষয়ে কঠোরতা ও শয্যা আলাদা করার নির্দেশনা এই ধাপের স্পষ্ট ভিত্তি। এর উদ্দেশ্য অভ্যাস গঠন, নিপীড়ন নয়। এছাড়া রাসুল (সা.) তরুণ সাহাবিদের আদব শেখাতেন। যেমন তিনি ছোট্ট উমর ইবনে আবু সালামা (রা.)-কে বলেছিলেন, ‘বিসমিল্লাহ বলো, ডান হাতে খাও, নিজের সামনে থেকে খাও।’ (বুখারি, ৫৩৭৬)
মনোবিজ্ঞানের মতে, মধ্য-শৈশবে শিশুর মধ্যে নিয়ম বোঝা, কাজে দক্ষতা অর্জন ও সামাজিক তুলনার প্রবণতা তৈরি হয়। এ সময় সুস্পষ্ট প্রত্যাশা ও সহায়ক নির্দেশনা সবচেয়ে কার্যকর। তাই তাদের জন্য করণীয় হলো–ক. সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে মসজিদে যাওয়া, কোরআন শেখানো ও পারিবারিক ইবাদতের পরিবেশ তৈরি করা। খ. ছোট দায়িত্ব দেওয়া, যেমন–নিজের জিনিস গোছানো, সময়মতো কাজ শেষ করা। গ. ভুলের পরিণতি শান্তভাবে বুঝিয়ে দেওয়া। শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন ইসলামের শিক্ষা ও শিশুর বিকাশ, দুটোরই পরিপন্থী। ঘ. প্রশংসা ও উৎসাহকে শাস্তির চেয়ে বেশি ব্যবহার করা।
তৃতীয় ধাপ: ১৪-২১ বছর, পরামর্শ ও বন্ধুত্বের সময়
কৈশোর ও তারুণ্যে সন্তান স্বাধীনসত্তা গড়ে তোলে। তাই নির্দেশদাতার চেয়ে পরামর্শদাতা ও সহযাত্রীর ভূমিকাই বেশি কার্যকর। রাসুল (সা.) তরুণদের দায়িত্ব ও মর্যাদা দিতেন। উসামা ইবনে জায়েদ (রা.)-কে অল্প বয়সে সেনাপতি করা তার দৃষ্টান্ত।
ইবনে আব্বাস (রা.) কিশোর বয়সে রাসুল (সা.)-এর পেছনে বসে গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ পেয়েছিলেন, ‘আল্লাহকে স্মরণ রাখো, তিনি তোমাকে রক্ষা করবেন।’ (তিরমিজি, ২৫১৬)। আল্লাহতায়ালা কোরআনে লুকমান (আ.)-এর নসিহত বর্ণনা করেছেন, যা পিতার মমতাপূর্ণ উপদেশের এক আদর্শ রূপ (সুরা লুকমান, ১২-১৯)।
মনোবিজ্ঞানী এরিক এরিকসনের মতে, কৈশোরের মূল কাজ পরিচয় গঠন। বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, যে অভিভাবক উষ্ণতা ও স্পষ্ট সীমারেখা একসঙ্গে বজায় রাখেন, তার সন্তানরা সাধারণত ভালো ফল করে। তাই এই বয়সে তাদের জন্য করণীয়–ক. সিদ্ধান্তের আগে সন্তানের মত শোনা এবং যুক্তিসহ নিজের মত জানানো। খ. বন্ধু, ইন্টারনেট ও ক্যারিয়ার নিয়ে খোলামেলা আলোচনার পরিবেশ রাখা। গ. ভুল করলে লজ্জা না দিয়ে শুধরে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া। ঘ. দায়িত্ব ধীরে ধীরে বাড়ানো এবং আস্থা প্রকাশ করা।
আমাদের সমাজের সাধারণ ভুল ধারণা
প্রথম সাত বছর শাসন করা যাবে না। ভুল। এর মানে নিয়মহীনতা নয়। এর মানে হলো শিশুর বয়স অনুযায়ী মমতাপূর্ণ ও সহজ সীমারেখা।
দ্বিতীয় ধাপে কঠোরতাই মূল। ভুল। শৃঙ্খলার উদ্দেশ্য অভ্যাস তৈরি, ভয় তৈরি নয়।
তৃতীয় ধাপে অভিভাবকের ভূমিকা শেষ। ভুল। ভূমিকা বদলায়, দায়িত্ব শেষ হয় না।
বয়সের সীমা কঠোরভাবে মানতে হবে। ভুল। প্রতিটি শিশুর বিকাশ আলাদা। সংখ্যাগুলো আনুমানিক নির্দেশনা মাত্র।
বাস্তব প্রয়োগে পরামর্শ
দম্পতির ঐকমত্য: বাবা-মা একই নীতিতে চললে সন্তান বিভ্রান্ত হয় না।
নিজে আদর্শ হওয়া: রাসুল (সা.) বলেছেন, কেউ শিশুকে ‘এসো, তোমাকে কিছু দেব’ বলে ডেকে তা না দিলে সেটি মিথ্যা বলার শামিল (মুসনাদে আহমাদ,৯৮৩৬)। কথা ও কাজের মিল শিশুর চরিত্র গঠনে সবচেয়ে কার্যকর।
দোয়া: সন্তানের জন্য নিয়মিত দোয়া ইসলামি শিক্ষারই অংশ, যেমন–‘রব্বি হাবলি মিনাস সালিহিন’ (সুরা সাফফাত, ১০০)।
সময় ও ধৈর্য: চরিত্র গড়তে সময় লাগে। দ্রুত ফলের আশা করলে হতাশা আসে।
প্রয়োজনে পরামর্শ নেওয়া: আচরণগত বা মানসিক সমস্যা দেখা দিলে শিশু-মনোবিদ বা অভিজ্ঞ আলেমের সহায়তা নেওয়া দুর্বলতা নয়, বিচক্ষণতা।
‘৭-৭-৭ নীতি’ একটি ভারসাম্যপূর্ণ ধারণা: শৈশবে ভালোবাসা, কৈশোরের আগে প্রশিক্ষণ এবং তারুণ্যে বিশ্বাস ও পরামর্শ। এর সনদগত অবস্থান নিয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন, কিন্তু এর মূল শিক্ষা কোরআন-সুন্নাহর স্নেহ, শিক্ষা ও দায়িত্ববোধের নীতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ এবং আধুনিক গবেষণাও এর অনেক দিককে সমর্থন করে। অভিভাবক যদি প্রতিটি ধাপে সন্তানের প্রয়োজন বুঝে নিজের ভূমিকা বদলাতে পারেন, তাহলে সন্তান কেবল সফল নয়, আল্লাহভীরু, দায়িত্বশীল ও সুস্থ মনের মানুষ হয়ে উঠবে ইনশাআল্লাহ।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক
