চোখের পলক ফেলতে না ফেলতেই যে সময়টুকু পার হয়ে যায়, তা নিয়ে কি আপনি কখনো মাথা ঘামান? আপনার-আমার কাছে এক সেকেন্ডের হয়তো তেমন কোনো দাম নেই। ঘড়ির কাঁটার একটা ‘টিক’ শব্দই তো মাত্র! কিন্তু এই আপাত তুচ্ছ এক সেকেন্ড নিয়েই গত তিন দশক ধরে বিশ্বের বাঘা বাঘা বিজ্ঞানীদের মধ্যে রীতিমতো তুমুল তর্কবিতর্ক ও চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছিল! অবশেষে সেই তর্কের অবসান ঘটতে চলেছে। বিজ্ঞানীদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আমাদের ক্যালেন্ডার বা সময়ের খাতা থেকে চিরতরে বিদায় নিচ্ছে লিপ সেকেন্ড।
ভাবছেন, লিপ সেকেন্ড আবার কী জিনিস? আর এটি বাদ দিলেই বা কার কী আসে যায়! আপনার হয়তো মনে হতে পারে, এটি বিজ্ঞানের কোনো খটমটে তাত্ত্বিক বিষয় যা নিয়ে সাধারণ মানুষের না ভাবলেও চলবে। কিন্তু সত্যি বলতে কী, এই একটি মাত্র সেকেন্ড বাতিল করার এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে আপনার প্রতিদিনের ব্যবহার করা স্মার্টফোন, ইন্টারনেট, জিপিএস থেকে শুরু করে পুরো বিশ্বের প্রযুক্তি ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ! সবচেয়ে বড় কথা হলো, এই ঘোষণার মাধ্যমে মানবসভ্যতাকে এমন এক অদ্ভুত বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচানো হয়েছে, যাকে বিজ্ঞানীরা বলছিলেন ‘নেগেটিভ লিপ সেকেন্ড’।
লিপ সেকেন্ড বাতিল করার এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে আপনার প্রতিদিনের ব্যবহার করা স্মার্টফোন, ইন্টারনেট, জিপিএস থেকে শুরু করে পুরো বিশ্বের প্রযুক্তি ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ!
ইন্টারন্যাশনাল ব্যুরো অফ ওয়েটস অ্যান্ড মেজারমেন্টস সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছে, ২০২৭ সালের মে মাসের পর থেকে ঘড়ির কাঁটায় আর কোনো লিপ সেকেন্ড যোগ করা হবে না। ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, ১৯৭২ সালে এই প্রথা চালুর পর থেকে এ পর্যন্ত মোট ৩২ বার আমাদের বৈশ্বিক সময়ের সঙ্গে অতিরিক্ত এক সেকেন্ড যোগ করা হয়েছে।
কেন এই এক সেকেন্ড যোগ করতে হতো, তা আপনাকে একদম বাস্তব জীবনের একটি উদাহরণ দিয়ে বোঝাই। ধরুন, একজন মানুষ ও একটা রোবট পাশাপাশি ট্র্যাকে দৌড়াচ্ছে। এদের মধ্যে রোবটটি বছরের পর বছর একেবারে একই গতিতে দৌড়াতে পারে। এর সময়ের কোনো নড়চড় হয় না। আর সাধারণ মানুষের দৌড়ের গতি একেক সময় একেক রকম হয়। এখন, মানুষ ও রোবটকে সবসময় একদম পাশাপাশি রাখতে হলে, মাঝেমধ্যেই ওই নিখুঁত রোবটটিকে এক মুহূর্তের জন্য দাঁড় করিয়ে মানুষের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। ঠিক এই ‘অপেক্ষা’ করার কাজটাই করে লিপ সেকেন্ড।
চাঁদ এবং পৃথিবীর জোয়ার-ভাটার ঘর্ষণ আর পৃথিবীর ভেতরের গলিত লাভার কারণে পৃথিবীর লাটিমের মতো ঘোরার গতি ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছিল। তাই পারমাণবিক ঘড়ির সঙ্গে পৃথিবীর মহাজাগতিক সময়ের তাল মেলাতে মাঝেমধ্যেই এক সেকেন্ড যোগ করতে হতো।
গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের কারণে মেরু অঞ্চলের বিশাল সব বরফখণ্ড গলে পৃথিবীর বুকে ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তিতে এক অদ্ভুত পরিবর্তন এসেছে যে, পৃথিবী এখন আগের চেয়ে দ্রুত ঘুরছে।
সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল। তাহলে হঠাৎ করে এই লিপ সেকেন্ড প্রথা বাতিল করার কারণ কী? কারণ এতকাল পৃথিবী ধীরে ঘুরছিল বলে আমরা এক সেকেন্ড করে যোগ করছিলাম। কিন্তু বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি খেয়াল করে দেখলেন, পৃথিবীর ঘূর্ণন ধীর হওয়ার বদলে উল্টো আরও দ্রুত হতে শুরু করেছে! আর এর পেছনেও আছে জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াল থাবা।
গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের কারণে মেরু অঞ্চলের বিশাল সব বরফখণ্ড গলে পৃথিবীর বুকে ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তিতে এমন এক অদ্ভুত পরিবর্তন এসেছে যে, পৃথিবী এখন আগের চেয়ে দ্রুত ঘুরছে। ব্যাপারটি অনেকটা আইস স্কেটিং করা খেলোয়াড়দের মতো। তারা যখন হাত গুটিয়ে নেয়, তখন তাদের ঘোরার গতি যেমন হঠাৎ বেড়ে যায়, গলিত বরফের কারণে পৃথিবীর দশাও হয়েছে ঠিক তেমন! ২০২৪ সালে নেচার ম্যাগাজিনের একটি গবেষণা বলছে, পৃথিবী এতই দ্রুত ঘুরছে যে, ২০২৯ সালের মধ্যেই আমাদের হয়তো ‘নেগেটিভ লিপ সেকেন্ড’ প্রয়োগ করতে হতো। অর্থাৎ, ঘড়িতে এক সেকেন্ড যোগ করার বদলে, ঘড়ি থেকে এক সেকেন্ড গায়েব করে দিতে হতো!
২০২৪ সালে নেচার ম্যাগাজিনের একটি গবেষণা বলছে, পৃথিবী এতই দ্রুত ঘুরছে যে, ২০২৯ সালের মধ্যেই আমাদের হয়তো নেগেটিভ লিপ সেকেন্ড প্রয়োগ করতে হতো।
আর এখানেই বেঁধেছে আসল বিপত্তি। ঘড়িতে এক সেকেন্ড যোগ করাতেই সারা বিশ্বের টেক কোম্পানিগুলোর ঘাম ছুটে যায়। গুগল বা মেটার মতো বড় বড় কোম্পানিগুলো এই এক সেকেন্ডকে চুইংগামের মতো টেনে টেনে সারা দিনের সময়ের সঙ্গে মিশিয়ে দেয়, যাতে তাদের সার্ভার ক্র্যাশ না করে। ২০১২ সালে মাত্র এক সেকেন্ড যোগ করার কারণে বিখ্যাত এয়ারলাইন্স কোয়ান্টাসের পুরো বুকিং সিস্টেম ধসে পড়েছিল! সেখানে যদি হঠাৎ করে এক সেকেন্ড গায়েব করে দেওয়া হয়, তবে সেটি পুরো বিশ্বের ইন্টারনেট, স্যাটেলাইট ও ব্যাংকিং ব্যবস্থায় কেমন ধস নামাবে, তার কোনো পরীক্ষিত ধারণাই কারও কাছে নেই। তাই বিজ্ঞানীরা সিদ্ধান্ত নিলেন, এই ভয়ংকর ঝুঁকির পথে হাঁটার চেয়ে লিপ সেকেন্ড প্রথা চিরতরে বাতিল করে দেওয়াই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, যেহেতু এক সেকেন্ড করে জমতে জমতে বিশাল কোনো সময়ের পার্থক্য তৈরি হতে কয়েক হাজার বছর লেগে যাবে, তাই এটি নিয়ে আমাদের প্রজন্মের মাথা ঘামানোর কোনো দরকার নেই!
হাজার বছর পরের এক লিপ আওয়ার
বিআইপিএমের টাইম ডিপার্টমেন্টের ডিরেক্টর প্যাট্রিজিয়া তাভেলা নিশ্চিত করেছেন, নেগেটিভ লিপ সেকেন্ডের এই অজানা ভয় থেকেই তারা এই প্রথা বাতিলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ২০২৭ সালের ২০ মে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে।
এখন প্রশ্ন হলো, আমরা যদি লিপ সেকেন্ড যোগ করা বন্ধই করে দিই, তাহলে আমাদের নিখুঁত পারমাণবিক ঘড়ির সঙ্গে পৃথিবীর নিজস্ব সময়ের যে দূরত্ব তৈরি হতে থাকবে, তার কী হবে? বিজ্ঞানীরা বলছেন, যেহেতু এক সেকেন্ড করে জমতে জমতে বিশাল কোনো সময়ের পার্থক্য তৈরি হতে কয়েক হাজার বছর লেগে যাবে, তাই এটি নিয়ে আমাদের প্রজন্মের আর মাথা ঘামানোর কোনো দরকার নেই! হাজার বছর পর যখন এই সময়ের ব্যবধান জমতে জমতে পুরো এক ঘণ্টায় গিয়ে ঠেকবে, তখন হয়তো ভবিষ্যতের মানুষদের একটি লিপ আওয়ার বা অতিরিক্ত এক ঘণ্টা যোগ করতে হবে।
সোজা কথায় বলতে গেলে, আজকের বিজ্ঞানীরা হাজার বছর পরের ভবিষ্যতের বিজ্ঞানীদের জন্য একটি বিশাল ধাঁধা রেখে বেশ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছেন! সবচেয়ে ভালো ব্যাপার হলো, আমাদের এখন আর কিছু করতে হবে না! আমাদের রোজকার জীবনে এক সেকেন্ডের হিসাব না মেলাতে পারার যে বিরক্তিকর ঝামেলা ছিল, তা অন্তত চিরতরে দূর হলো!
