বর্ষা শেষ হতে না হতেই বিষাক্ত হয়ে উঠছে দেশের বাতাস। শুধু রাজধানী ঢাকা নয়, দূষণের বিস্তার ঘটছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও। কোথাও বাতাসে ভাসছে নির্মাণকাজের ধুলা, কোথাও যানবাহন ও শিল্পকারখানার ধোঁয়া, আবার কোথাও ইটভাটা ও বর্জ্য পোড়ানোর বিষাক্ত কণা। শীতের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে দূষণের মাত্রা। এর প্রভাব পড়ছে জনস্বাস্থ্যে। শিশু থেকে বৃদ্ধ, সব বয়সী মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন সর্দি-কাশি, শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি ও অ্যালার্জিসহ নানা শ্বাসতন্ত্রের রোগে। হাসপাতালগুলোতেও বাড়ছে রোগীর চাপ। বাতাসে থাকা অতি সূক্ষ্ম বস্তুকণা পিএম ২.৫-এর মাত্রা বৃদ্ধির পরিসংখ্যান পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট করে।
রাজধানী ঢাকায় আগস্টে প্রতি ঘনমিটার বাতাসে পিএম ২.৫-এর গড় ঘনত্ব ছিল ২৮.৪ মাইক্রোগ্রাম। সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪০.১ মাইক্রোগ্রামে। অক্টোবরের প্রথম ২৩ দিনের গড় ছিল ৭৪.২ মাইক্রোগ্রাম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্দেশিকা অনুযায়ী, বার্ষিক গড় পিএম ২.৫-এর মাত্রা প্রতি ঘনমিটারে ৫ মাইক্রোগ্রাম এবং ২৪ ঘণ্টার গড় ১৫ মাইক্রোগ্রাম হওয়া উচিত। সে হিসাবে অক্টোবরে ঢাকার বাতাসে এই দূষণকণার গড় মাত্রা বার্ষিক নির্দেশিকার প্রায় ১৫ গুণ।
আন্তর্জাতিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা আইকিউএয়ারের তথ্যেও দূষণের ঊর্ধ্বগতি দেখা যাচ্ছে। সংস্থাটির বায়ুমান সূচকে ঢাকার স্কোর আগস্টে ছিল ৮৭, সেপ্টেম্বরে ১১২ এবং অক্টোবরে ১৬৪। সূচকে ১৫১ থেকে ২০০ পর্যন্ত বায়ুমানকে অস্বাস্থ্যকর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অর্থাৎ, অক্টোবরের হিসাবে রাজধানীর বাতাস সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যের জন্যও উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। তবে উদ্বেগের বিষয়, বায়ুদূষণ আর কেবল রাজধানীকেন্দ্রিক সমস্যা নয়। দেশের মধ্যাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল এবং বিভিন্ন শিল্প ও নগর এলাকায়ও বাতাসের মান খারাপ হচ্ছে। ফলে দূষণের স্বাস্থ্যঝুঁকি ছড়িয়ে পড়ছে রাজধানীর বাইরেও।
ঢাকার বাইরে দূষণের বিস্তার : বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) কারিগরি সহযোগিতায় গুগল ম্যাপে দেশের বিভিন্ন এলাকার তাৎক্ষণিক বায়ুমানের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এসব তথ্য অনুযায়ী, বাগেরহাট, পিরোজপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী ও বরিশালের কিছু এলাকায় তুলনামূলক ভালো বাতাস থাকলেও নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, কিশোরগঞ্জ, ঢাকা ও মুন্সিগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় দূষণের মাত্রা বেশি। গতকাল বেলা সাড়ে ৩টার তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার বায়ুমান সূচক ছিল ১৭৬। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর ও কিশোরগঞ্জের ভৈরবে সূচক ছিল ২০২। নরসিংদী সদরে ছিল ২০১ এবং মুন্সিগঞ্জের সিরাজদীখান ও নারায়ণগঞ্জে ২০০।
চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ চ্যানেলে সূচক ছিল ১৮০, কক্সবাজারে ১৬৮ এবং মহেশখালীতে ১৮৭। ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, ঝিনাইদহ ও চট্টগ্রাম উপকূলের বিভিন্ন এলাকাতেও অস্বাস্থ্যকর বায়ুমানের তথ্য পাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব এলাকায় শিল্পকারখানা, যানবাহন, নির্মাণকাজ, সড়কের ধুলাবালি ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের প্রভাব রয়েছে। তবে কোনো এলাকার দূষণের প্রকৃত উৎস নির্ধারণে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, দূষণকণার রাসায়নিক বিশ্লেষণ এবং নির্ভরযোগ্য পরিমাপের প্রয়োজন। তাৎক্ষণিক বায়ুমান সূচক দূষণের মাত্রা সম্পর্কে ধারণা দিলেও একে দীর্ঘমেয়াদি গড় বা দূষণের উৎস নির্ধারণের একমাত্র ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও ক্যাপসের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার বলেন, আগে ঢাকার বাইরের অনেক এলাকার বায়ুমান সম্পর্কে জানার সুযোগ সীমিত ছিল। এখন পর্যবেক্ষণের সুযোগ বাড়ায় এসব এলাকার দূষণের চিত্রও সামনে আসছে। তিনি বলেন, অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে বৃষ্টি বন্ধ থাকায় ধুলাবালি ও বিভিন্ন উৎসের দূষিত উপাদান বাতাসে জমে থাকার প্রবণতা বাড়ছে। এ সময় ইটভাটা চালু হওয়া, বর্জ্য পোড়ানো, অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণকাজ, সড়কের ধুলাবালি, যানবাহন ও শিল্পকারখানার ধোঁয়া বায়ুদূষণ বাড়ায়। চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলে স্টিল রি-রোলিং মিলও দূষণের অন্যতম উৎস।
অধ্যাপক কামরুজ্জামান মজুমদারের মতে, শীতের সময় দেশের বাতাসের গতিপ্রকৃতি ও আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে আন্তসীমান্ত দূষণের প্রভাবও বাড়তে পারে। আন্তসীমান্ত দূষণ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হলেও দেশের অভ্যন্তরে দূষণের উৎসগুলো নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এ জন্য আইন প্রয়োগ, শিল্পকারখানার নির্গমন নিয়ন্ত্রণ, নির্মাণকাজে ধুলা ব্যবস্থাপনা এবং বর্জ্য পোড়ানো বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
দূষিত বাতাসে বাড়ছে রোগীর চাপ : বায়ুদূষণের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং আগে থেকে শ্বাসতন্ত্রের রোগে আক্রান্ত মানুষের ওপর। জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের ভিড় সেই উদ্বেগেরই প্রতিফলন। গত সোমবার হাসপাতালের বহির্বিভাগে দেখা যায়, চিকিৎসা নিতে রোগীদের দীর্ঘ সারি। নুসরাত নামের এক নারী জানান, তার দেড় বছর বয়সী শিশু ১৪ থেকে ১৫ দিন ধরে সর্দি-কাশিতে ভুগছে। ওষুধে সাময়িক উপশম হলেও পরে কাশি বেড়েছে। এখন কাশির সঙ্গে রক্ত আসছে, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে এবং বুকে সাঁই সাঁই শব্দ হচ্ছে। শিশুটির এসব লক্ষণ গুরুতর অসুস্থতার ইঙ্গিত হতে পারে।
কাশির সঙ্গে রক্ত আসা ও শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। যদিও একটি শিশুর অসুস্থতার কারণ শুধু বায়ুদূষণ কি না, তা পরীক্ষা ছাড়া নিশ্চিত করা যায় না, দূষিত বাতাস শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা বাড়াতে পারে। হাসপাতালের চিকিৎসকদের ভাষ্য, প্রতি বছর বর্ষা শেষ হওয়ার পর শ্বাসতন্ত্রের রোগীদের চাপ বাড়তে শুরু করে। শীতকালে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে ওঠে। তখন রোগীর চাপ সামাল দিতে হিমশিম খেতে হয়। শুধু ঢাকা নয়, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে রোগীরা এ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন।
হাসপাতালের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১ সালে রোগীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২৮ হাজার। ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ৬২ হাজারে। ২০২৩ সালে রোগীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৭৫ হাজার, ২০২৪ সালে ১ লাখ ৯২ হাজার এবং ২০২৫ সালে ১ লাখ ৯৫ হাজার। পাঁচ বছরে রোগীর সংখ্যা বেড়েছে ৬৭ হাজার, অর্থাৎ প্রায় ৫২ শতাংশ। তবে রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধির পেছনে বায়ুদূষণ ছাড়াও মৌসুমি সংক্রমণ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, চিকিৎসাসেবা গ্রহণের প্রবণতা এবং হাসপাতালের সেবার আওতা বাড়ার মতো বিষয় ভূমিকা রাখতে পারে। তাই বায়ুদূষণের সঙ্গে রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধির সম্পর্ক নির্দিষ্ট করতে আরো বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
ক্ষুদ্র কণা, বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি : জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, বায়ুদূষণ মানুষের শরীরে সংক্রামক ও অসংক্রামক উভয় ধরনের রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। সর্দি-কাশি, শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, অ্যালার্জি ও নিউমোনিয়ার মতো সমস্যার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে ফুসফুসের কার্যক্ষমতা কমে যেতে পারে। দূষিত বাতাসে দীর্ঘদিন বসবাসের ফলে ফুসফুসের ক্যানসারসহ গুরুতর রোগের ঝুঁকিও বাড়ে। তিনি বলেন, পিএম ২.৫-এর মতো অতি সূক্ষ্ম বস্তুকণা শ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসের গভীরে প্রবেশ করতে পারে। এসব কণার সংস্পর্শে শরীরে প্রদাহ ও অন্যান্য ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। এর প্রভাব শুধু শ্বাসতন্ত্রেই সীমাবদ্ধ থাকে না; হৃদ্?রোগ, স্ট্রোক এবং অন্যান্য অঙ্গের কার্যকারিতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
ডা. লেলিন চৌধুরীর মতে, বায়ুদূষণের কারণে মানুষের কর্মক্ষমতা কমে, কর্মঘণ্টা নষ্ট হয় এবং চিকিৎসাব্যয় বাড়ে। এতে পরিবার ও রাষ্ট্র উভয়ের ওপর আর্থিক চাপ সৃষ্টি হয়। মানুষের গড় আয়ু বাড়লেও সেই বাড়তি আয়ুর কতা সুস্থভাবে উপভোগ করা যাচ্ছে, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। বিশ্বব্যাপী বায়ুদূষণ এখন জনস্বাস্থ্যের অন্যতম বড় সংকট। আন্তর্জাতিক গবেষণায় বছরে প্রায় ৮১ লাখ মানুষের অকালমৃত্যুর সঙ্গে বায়ুদূষণের সম্পর্কের কথা উঠে এসেছে। আইকিউএয়ারের ২০২৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের দূষিত শহরের তালিকায় ঢাকা ছিল ৩২তম এবং দেশভিত্তিক দূষণের তালিকায় বাংলাদেশ ছিল দ্বিতীয় অবস্থানে। এসব পরিসংখ্যান বায়ুদূষণ মোকাবিলায় কার্যকর উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা আরো স্পষ্ট করে।
আইন আছে, কার্যকর উদ্যোগ কোথায়? : বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে আইন, নীতিমালা ও আদালতের নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবে দূষণের উৎসগুলো নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অপরিকল্পিত নির্মাণকাজ, খোলা জায়গায় বর্জ্য পোড়ানো, যানবাহনের কালো ধোঁয়া, শিল্পকারখানার নির্গমন এবং সড়কের ধুলাবালি নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত তদারকি ও জবাবদিহি প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বায়ুদূষণ কমাতে বিচ্ছিন্ন অভিযান যথেষ্ট নয়। দূষণের উৎস শনাক্ত করে এলাকাভিত্তিক পরিকল্পনা নিতে হবে। শিল্পকারখানার নির্গমন নিয়মিত পরীক্ষা, ইটভাটার পরিবেশগত মান নিশ্চিত করা, নির্মাণস্থলে ধুলা নিয়ন্ত্রণ, সড়ক পরিষ্কার ও ধুলামুক্ত রাখা, বর্জ্য পোড়ানো বন্ধ এবং দূষণকারী যানবাহনের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি ঢাকা ও ঢাকার বাইরের শিল্পাঞ্চল, জেলা শহর এবং গুরুত্বপূর্ণ সড়ক এলাকায় বায়ুমান পর্যবেক্ষণব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা জরুরি।
বিআলো/অর্নব