বাজারে ঢুকে একের পর এক পণ্যের দাম জানতে চাইছেন ক্রেতারা। দাম শুনে কেউ প্রয়োজনের তুলনায় কম কিনছেন, কেউ আবার তালিকা থেকে বাদ দিচ্ছেন কিছু পণ্য। সবজি, মাছ, মুরগি ও ডিম—প্রায় সবকিছু কিনতেই খরচ করতে হচ্ছে বাড়তি টাকা। চাল-ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয় মেটাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন সীমিত আয়ের মানুষ। আয় না বাড়লেও প্রতিদিনের বাজার খরচ বেড়ে যাওয়ায় পরিবারের খাবারের তালিকায় হচ্ছে কাটছাঁট।
বুধবার (২১ অক্টোবর) সিলেট নগরের বিভিন্ন বাজার ঘুরে ক্রেতাদের এমন চিত্র দেখা গেছে।
ক্রেতাদের অভিযোগ, সংসারের আয় আগের মতো থাকলেও বাজার করতে গিয়ে আগের চেয়ে বেশি টাকা খরচ করতে হচ্ছে। মাছ কিনলে সবজি কম নিতে হচ্ছে, আবার অন্য প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে গেলে খাবারের বাজেট কমাতে হচ্ছে।
নগরের বাজারগুলোতে সবজির দামে রয়েছে ভিন্নতা। মঙ্গলবার বাজার ঘুরে দেখা যায়, প্রতি কেজি বেগুন ৮০ থেকে ১২০ টাকা, গাজর ১০০ থেকে ১২০ টাকা এবং টমেটো ১৮০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পটল, ঢ্যাঁড়শ ও চিচিঙ্গার দাম ৬০ থেকে ৮০ টাকা। বরবটি ৮০ থেকে ১০০ টাকা এবং কচুর লতি ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। নতুন শিমের দাম ১৮০ থেকে ২০০ টাকা। তবে আলু ৩০ টাকা ও পেঁপে ১৫ থেকে ২০ টাকা কেজি দরে পাওয়া যাচ্ছে। বাজার ও মানভেদে এসব পণ্যের দামে পার্থক্য রয়েছে।
সবজির পাশাপাশি মাছ-মাংস ও ডিম কিনতেও গুনতে হচ্ছে বাড়তি টাকা। প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি ১৮০ টাকা, সোনালি মুরগি ২৯০ থেকে ৩২০ টাকা এবং লাল লেয়ার মুরগি ৩৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ফার্মের লাল ডিমের ডজন ১৫০ থেকে ১৫৫ টাকা। গরুর মাংস প্রতি কেজি ৭৮০ থেকে ৮০০ টাকা এবং খাসির মাংস ১ হাজার ৩০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
মাছের বাজারেও স্বস্তি নেই ক্রেতাদের। আকার ও মানভেদে প্রতি কেজি রুই ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকা, কাতলা ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকা এবং মৃগেল ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। চাষের পাঙাশের দাম ১৮০ থেকে ২২০ টাকা এবং তেলাপিয়া ২২০ থেকে ২৪০ টাকা কেজি।
বন্দরবাজারে বাজার করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী আলী রায়হান বলেন, প্রতিদিন বাজারে এসে নতুন দামের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। যে সবজি আগে এক কেজি কিনতাম, এখন দাম বেশি হওয়ায় আধা কেজি কিনতে হচ্ছে। চাল, মাছ, মুরগি—সবকিছু মিলিয়ে সংসারের খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। আয় তো আর বাজারদরের সঙ্গে বাড়ছে না।
সিলেট নগরের বাজারগুলোতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি দামে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন সীমিত আয়ের মানুষ। আয় না বাড়লেও প্রতিদিনের খাবারের খরচ বেড়ে যাওয়ায় সংসারের বাজেট সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাঁদের। আগে যে পরিমাণ মাছ, মাংস ও সবজি কেনা সম্ভব হতো, এখন তা কমিয়ে আনতে হচ্ছে। কেউ মাছ কিনলে সবজি কম নিচ্ছেন, আবার কেউ দাম বেশি হওয়ায় মাংস কেনা থেকে বিরত থাকছেন। এতে পরিবারের দৈনন্দিন খাবারের তালিকায়ও পরিবর্তন আনতে হচ্ছে। ক্রেতাদের মতে, বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আয় না বাড়ায় জীবনযাত্রার ব্যয় সামলানো কঠিন হয়ে উঠেছে। নিয়মিত বাজার তদারকি এবং নিত্যপণ্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখার দাবি জানিয়েছেন তারা।
তিনি আরো বলেন, একটি পরিবারের প্রতিদিনই কিছু না কিছু কেনার প্রয়োজন হয়। সব পণ্যের দাম একসঙ্গে বেশি থাকলে খরচ কমানোর সুযোগও সীমিত হয়ে যায়। মাছ কিনলে সবজি কম কিনতে হয়, আবার অন্য প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে গেলে খাবারের খরচে টান দিতে হয়।
আম্বরখানা বাজারে কেনাকাটা করতে আসা গৃহিণী নুরুন্নাহার আক্তার বলেন, বাজারে এসে সবকিছুর দাম জিজ্ঞেস করতে হয়। যে সবজির দাম তুলনামূলক কম, সেটাই কিনতে হচ্ছে। মাছ কিনতে গেলে দাম বেশি, মাংস তো নিয়মিত কেনা সম্ভব হয় না। এভাবে চললে পরিবারের খাবারের খরচ সামলানো কঠিন হয়ে যাবে।
রিকাবিবাজার এলাকায় বাজার করতে আসা সরকারি চাকরিজীবী আশরাফুল ইসলাম বলেন, আগে কিছু মাছ কিনে সঙ্গে সবজি নিলে সপ্তাহের বাজার মোটামুটি হয়ে যেত। এখন মাছের দাম বেশি হওয়ায় পরিমাণ কমাতে হচ্ছে। সাধারণ মানুষকে বাজারের খরচের হিসাব মেলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। দাম নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত তদারকি দরকার।
খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, পাইকারি বাজার থেকে বেশি দামে পণ্য কিনতে হচ্ছে। এর সঙ্গে পরিবহন ও দোকান পরিচালনার খরচ যুক্ত হওয়ায় ক্রেতাদের কাছে কম দামে পণ্য বিক্রি করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
বন্দরবাজারের সবজি বিক্রেতা শাহজাহান আলী বলেন, পাইকারি বাজার থেকে বেশি দামে সবজি কিনতে হচ্ছে। পরিবহন খরচ ও কেনার দামের সঙ্গে দোকানের খরচও যোগ হয়। তাই কম দামে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে সব সবজির দাম এক রকম নয়। সরবরাহ ও মানের ওপর নির্ভর করে দাম কমবেশি হচ্ছে।
বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সহনীয় রাখতে উৎপাদন থেকে খুচরা বিক্রি পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে নজরদারি বাড়ানোর প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিক্রেতাদের ভাষ্য, পাইকারি বাজারে পণ্যের দাম বাড়লে পরিবহন ও দোকান পরিচালনার খরচ যুক্ত হয়ে খুচরা বাজারেও তার প্রভাব পড়ে। তবে পণ্যের সরবরাহ, মান ও বাজারভেদে দামের পার্থক্য থাকায় মূল্যবৃদ্ধির প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে উৎপাদন এলাকা, পাইকারি আড়ত ও খুচরা বাজারের দামের মধ্যে সামঞ্জস্য যাচাই করা প্রয়োজন। পাশাপাশি সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা, বাজারে নিয়মিত তদারকি এবং অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে ক্রেতাদের ওপর চাপ কিছুটা কমতে পারে। এতে সীমিত আয়ের মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার সক্ষমতা ধরে রাখতেও সহায়তা মিলবে।
তার মতে, সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে এবং পাইকারি বাজারে দাম কমলে খুচরা বাজারেও তার প্রভাব পড়তে পারে। তবে বাজারের পরিস্থিতি বুঝতে উৎপাদন এলাকা থেকে পণ্য সংগ্রহ, পরিবহন ও পাইকারি বিক্রির বিভিন্ন পর্যায়ের দামও যাচাই করা প্রয়োজন।
আম্বরখানা এলাকার মাছ বিক্রেতা রুকন বলেন, আড়ত থেকে মাছ কিনতে আগের চেয়ে বেশি টাকা লাগছে। মাছের ধরন, আকার ও সরবরাহের ওপর দাম নির্ভর করে। বেশি দামে কিনলে কম দামে বিক্রি করা কঠিন। আবার দাম বেশি হলে ক্রেতারাও আগের মতো মাছ কিনছেন না।
মুরগি ও ডিমের বাজারেও বাড়তি দামের প্রভাব পড়ছে বলে জানান বিক্রেতারা। আম্বরখানা বাজারের মুরগি বিক্রেতা শামছুল ইসলাম বলেন, দাম বাড়লে ক্রেতারা পরিমাণ কমিয়ে দেন। আগে কেউ দুই কেজি মুরগি কিনলে এখন এক কেজি কিনছেন, কেউ আবার দাম শুনে না কিনেই চলে যাচ্ছেন। পাইকারি দামের ওঠানামার কারণে প্রতিদিন একই দামে বিক্রি করাও সম্ভব হয় না।
