কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে পর্যটকদের ভিড় বাড়লেও বাড়েনি নিরাপত্তাব্যবস্থা। পর্যাপ্ত লাইফগার্ড ও নজরদারির অভাবে ঝুঁকি নিয়েই সাগরে নামছেন পর্যটকেরা। সম্প্রতি পেচারদ্বীপ সৈকতে সাগরে নেমে চার পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন আরও একজন। এ ঘটনায় আবারও প্রশ্ন উঠেছে, বিপুলসংখ্যক পর্যটকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা কতটা রয়েছে।
টানা ছুটিতে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড়। সবচেয়ে বেশি সমাগম সুগন্ধা পয়েন্টে। লাইফগার্ডদের হিসাবে, সেখানে সাগরে নামছেন লাখেরও বেশি পর্যটক। অথচ নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছেন মাত্র আটজন লাইফগার্ড। অর্থাৎ প্রতি ১২ হাজার ৫০০ পর্যটকের বিপরীতে দায়িত্ব পালন করছেন একজন লাইফগার্ড।
সী সেফ লাইফগার্ড সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ বছরে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে সাগরে নেমে ভেসে যাওয়ার সময় ১ হাজার ২০০ পর্যটককে উদ্ধার করা হয়েছে। এ সময়ে প্রাণ হারিয়েছেন ৮৫ জন।
পর্যাপ্ত লাইফগার্ড নেই, ঝুঁকিতে পর্যটকেরা
সৈকতের প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে পর্যটকদের বাড়তি চাপ রয়েছে। ভিড় রয়েছে অন্যান্য পয়েন্টেও। তবে পর্যটকদের অভিযোগ, সমুদ্রস্নানের সময় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয়সংখ্যক লাইফগার্ড ও নিরাপত্তাকর্মী নেই। কিছু এলাকায় প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থাও চোখে পড়ে না।
সী সেফ লাইফগার্ড সংস্থার জ্যেষ্ঠ কর্মী আব্দুর রশীদ বলেন, বর্তমানে সুগন্ধা বিচে আটজন লাইফগার্ড দায়িত্ব পালন করছেন। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক পর্যটকের সমাগম হলেও তাঁদের তুলনায় লাইফগার্ডের সংখ্যা অনেক কম। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে লাইফগার্ডের সংখ্যা বাড়ানো প্রয়োজন।
তিনি বলেন, দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রায়ই অসুস্থ পর্যটকদের হাসপাতালে নিতে হয়। এ সময় নানা প্রতিকূলতা ও মানুষের বিরূপ মন্তব্যের মুখেও পড়তে হয় তাঁদের। সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও লাইফগার্ডরা দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। পর্যটকদের নিরাপত্তার স্বার্থে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, বিশেষ করে সরকারের এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
পর্যটক রিয়াজ উদ্দিন বলেন, সমুদ্রে গোসল করতে নেমে অনেকের প্রাণহানি ঘটছে। অনেক ক্ষেত্রে নিখোঁজ ব্যক্তিদের মরদেহও উদ্ধার করা সম্ভব হয় না। তাই কক্সবাজারে বেড়াতে আসা পর্যটকদের সতর্ক থাকার পাশাপাশি নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়ে সচেতন হতে হবে।
পর্যটক সোয়েব ইফতিখারের অভিযোগ, সমুদ্রসৈকতের বিভিন্ন স্থানে পর্যাপ্ত লাইফগার্ড ও নিরাপত্তাকর্মী নেই। প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে পর্যটকদের নিরাপত্তা দেওয়া সহজ হতো। এ জন্য প্রশাসনের আরও নজরদারি প্রয়োজন।
পর্যটক হারুন অর রশিদ বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ কক্সবাজারে বেড়াতে আসেন। তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তাই সৈকতে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করার পাশাপাশি লাইফগার্ডের সংখ্যা বাড়ানো জরুরি।
পেচারদ্বীপে পাঁচ জনের মৃত্যু
এদিকে পেচারদ্বীপ সৈকতে সাগরে নেমে পাঁচ পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে।
সী সেফ লাইফগার্ড সংস্থার প্রকল্প কর্মকর্তা মো. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত থেকে প্রায় ১০ থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে হিমছড়ি পয়েন্টে দুই দলের কয়েকজন পর্যটক সাগরে গোসল করতে নেমে স্রোতে ভেসে যান। তাঁদের মধ্যে একজনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া বৃহস্পতিবার সকালে ও সন্ধ্যা ৬টায় নিখোঁজ বাকি দুইজনকে উদ্ধার করা হয়।
পর্যটকদের সাগরে নামার আগে লাইফগার্ডের নির্দেশনা মেনে চলার পরামর্শ দেন মো. ইমতিয়াজ আহমেদ। তিনি বলেন, যে স্থানে গোসল করতে নামবেন, সেখানে লাইফগার্ডের নিরাপত্তাসেবা রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হতে হবে। যেখানে এ সেবা নেই, সেখানে কোনোভাবেই সাগরে নামা উচিত নয়।
নিরাপত্তা বাড়ানোর দাবি ব্যবসায়ীদের
পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৈকতজুড়ে লাইফগার্ডের কার্যক্রম বিস্তৃত করার পাশাপাশি নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন পর্যটন ব্যবসায়ীরা।
হোটেল কক্স-টুডের মহাব্যবস্থাপক আবু তালেব শাহ বলেন, পর্যটকেরা মূলত সমুদ্রসৈকত উপভোগ করতেই কক্সবাজারে আসেন। তাই শৈবাল পয়েন্ট থেকে জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত পুরো সৈকত এলাকায় লাইফগার্ডের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসন, ট্যুরিস্ট পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি সৈকতে নিরাপত্তাবেষ্টনী ও প্রয়োজনীয় সুরক্ষাব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা না থাকলে পর্যটকদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়, যা তাঁদের ভ্রমণের অভিজ্ঞতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এতে কক্সবাজারের পর্যটনশিল্প সম্পর্কেও বিরূপ ধারণা তৈরি হতে পারে। তাই পর্যটকদের নির্বিঘ্নে সৈকত উপভোগের সুযোগ করে দিতে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি।
পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে লাইফগার্ডের সংখ্যা বাড়ানো, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নজরদারি জোরদার এবং সমুদ্রে নামার ক্ষেত্রে কার্যকর সতর্কতাব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন পর্যটক ও ব্যবসায়ীরা। তাঁদের মতে, শুধু দুর্ঘটনার পর উদ্ধার অভিযান চালানো নয়, দুর্ঘটনা প্রতিরোধে আগাম নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করাও জরুরি।
