ইরান যুদ্ধ ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি ঘিরে তীব্র অনিশ্চয়তার কারণে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেল পরিবহনের গড় ভাড়া রেকর্ড পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। বছর ব্যবধানে ব্যারেলপ্রতি তেলের পরিবহন খরচ ৩ ডলার থেকে লাফিয়ে ২০ ডলারে গিয়ে পৌঁছেছে অর্থাৎ নিছক পরিবহন বাবদই অতিরিক্ত ব্যয় বেড়েছে ১৭ ডলার।
মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে জাহাজ চলাচলে চরম ঝুঁকি, তেলের ট্যাংকারে উপর্যুপরি হামলা এবং সার্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সার্বিক পরিবহন ব্যয় অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী বিনিয়োগ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান স্যাকস এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ভূরাজনৈতিক সংকটের লক্ষণীয় উন্নতি না হওয়ায় স্বল্প মেয়াদে তেলের এই চড়া পরিবহন মাশুল বজায় থাকতে পারে, যা বিশ্ববাজারে সার্বিক জ্বালানির মূল্যে নতুন করে তীব্র চাপ তৈরি করবে।
গোল্ডম্যান স্যাকসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের বিশেষ কিছু রুটে বর্তমানে তেল পরিবহনের ব্যয় ব্যারেলপ্রতি সর্বোচ্চ ৩৫ ডলারে ঠেকেছে। এর মধ্যে শুধু হরমুজ প্রণালিতে সম্ভাব্য যুদ্ধঝুঁকি বাবদ ব্যারেলপ্রতি অতিরিক্ত ৭ ডলার, চালানি জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির কারণে ৪ ডলার এবং ওমান উপসাগরে এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে নিরাপদ তেল স্থানান্তরের (শিপ-টু-শিপ ট্রান্সফার) দরুন আরও ৪ ডলার বাড়তি খরচ যোগ হচ্ছে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বৈশ্বিক অপরিশোধিত তেলের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড 'ব্রেন্ট ক্রুড'-এর দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৯ দশমিক ৩৪ ডলারে লেনদেন হয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দাম পৌঁছেছে ৯৮ দশমিক ৪৭ ডলারে। গোল্ডম্যান স্যাকস পূর্বাভাস দিয়েছে যে, আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের গড় দাম ৯০ ডলারের মধ্যে রাখার পরিকল্পনা থাকলেও অবকাঠামোগত ক্ষতি ও চলমান ঝুকির কারণে বছর শেষে প্রকৃত দাম এই সীমা ছাড়িয়ে অনেক উপরে উঠে যেতে পারে।
যুদ্ধের কারণে মহাসাগরে চলাচলকারী বিশাল আকৃতির তেলবাহী 'সুপারট্যাংকার'-এর দৈনিক ভাড়াও ইতিহাসের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেছে। গত সেপ্টেম্বর মাসে পারস্য উপসাগর থেকে চীন পর্যন্ত তেল পরিবহনে একটি সুপারট্যাংকারের দৈনিক ভাড়া ছিল ১০ লাখ ডলার, যা অক্টোবর মাসের শুরুতে ১৪ লাখ ডলার ছাড়িয়ে যায়।
বৈশ্বিক জ্বালানি সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান 'কেপলার'-এর সাম্প্রতিক উপাত্ত অনুযায়ী, শেষ দুই সপ্তাহে অন্তত ১৮টি ভাসমান তেলের ট্যাংকারে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে সরবরাহে; চলতি সপ্তাহের শুরুতে পারস্য উপসাগর থেকে দৈনিক তেলের যোগান কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৮৫ লাখ ব্যারেলে, যা পক্ষকাল আগেও ছিল প্রতিদিন ২ কোটি ব্যারেলের ওপরে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, সমুদ্রপথে তেল সরবরাহের এই ভয়াবহ স্থবিরতা ও পরিবহন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশসহ জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর চরম আর্থিক চাপ সৃষ্টি হবে। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে অভ্যন্তরীণ পরিবহন খাত, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানার সার্বিক পরিচালন খরচে।
জেএইচআর
