দারিদ্র্য ও পারিবারিক অসচ্ছলতার সুযোগ নিয়ে সাতক্ষীরার বিভিন্ন উপজেলা থেকে শিশুদের দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ইটভাটায় ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত করার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, মৌসুমি শ্রমের জন্য অগ্রিম টাকা দিয়ে শিশুদের কাজে নিতে উৎসাহিত করছেন ইটভাটাসংশ্লিষ্ট দালালরা। এতে শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে শিশুরা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সাতক্ষীরার আশাশুনি, শ্যামনগর, কালিগঞ্জ ও দেবহাটা উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকার শিশুদের প্রতিবছর কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাসে ইটভাটায় কাজের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। খুলনা, যশোর ও সাতক্ষীরার স্থানীয় ইটভাটার পাশাপাশি ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও শরীয়তপুরের বিভিন্ন ইটভাটায়ও তাদের পাঠানো হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার ভাষ্য, ইটভাটার মালিকদের হয়ে স্থানীয় সর্দার বা দালালরা শিশুদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরিবারের হাতে ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত অগ্রিম বা দাদন দিয়ে শিশুদের কাজে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়।
দারিদ্র্য ও আর্থিক সংকটের কারণে অনেক অভিভাবক সন্তানদের এ ধরনের কাজে পাঠাতে বাধ্য হন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। ইটভাটায় এসব শিশুকে মাটি বহন, কাঁচা ইট সাজানো ও ইট শুকানোর মতো পরিশ্রমসাধ্য কাজে নিয়োজিত করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা কাজ করেও তারা তুলনামূলক কম মজুরি পায়।
মৌসুমি শ্রমের কারণে সাতক্ষীরার প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিভিন্ন প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যালয়ের বাইরে থাকায় অনেক শিশুর পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে এবং ঝরে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে।
অন্যদিকে, ইটভাটার ধোঁয়া, কয়লার গুঁড়া ও অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রমের কারণে শিশুদের শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা, চর্মরোগ ও অপুষ্টিসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, শৈশবে ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে যুক্ত হলে শিশুদের স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে ভবিষ্যতে কর্মসংস্থান ও আর্থসামাজিক উন্নয়নের সুযোগও সীমিত হয়ে যায়।
বাংলাদেশের শ্রম আইন অনুযায়ী, নির্ধারিত শর্ত ছাড়া ১৪ বছরের কম বয়সী শিশুকে কাজে নিয়োগ নিষিদ্ধ। এ ছাড়া ১৮ বছরের কম বয়সী কিশোরদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োগের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কিন্তু সাতক্ষীরার পরিবহন টার্মিনালগুলো দিয়ে শিশুদের বিভিন্ন জেলায় নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠলেও এ বিষয়ে কার্যকর নজরদারি ও আইন প্রয়োগের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্থানীয় মানবাধিকারকর্মীদের মতে, দারিদ্র্যকে পুঁজি করে শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে নিয়োজিত করার প্রবণতা বন্ধে দালালদের শনাক্ত করা, শিশুদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনা এবং তাদের পরিবারের বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। জেলা শিশু বিষয়ক কার্যালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ইটভাটায় শিশুশ্রম বন্ধে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সচেতন করা হচ্ছে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে দালাল ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানানো হয়েছে।
তবে স্থানীয়দের দাবি, শুধু সচেতনতামূলক কার্যক্রম বা আশ্বাসে সমস্যার সমাধান হবে না। শিশুদের অন্য জেলায় নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ, ইটভাটায় নিয়মিত অভিযান এবং শিশুশ্রমে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য আর্থিক সহায়তা, সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষাবৃত্তি ও বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সচেতন মহল।
তাঁদের মতে, দারিদ্র্যের কারণে কোনো শিশুকে যেন বিদ্যালয় ছেড়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নামতে না হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি। শিশুদের সুরক্ষা, শিক্ষা ও স্বাভাবিক বিকাশ নিশ্চিত করতে প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও পরিবারগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
The post সাতক্ষীরা থেকে হাজারো শিশুকে ইটভাটায় নেওয়ার অভিযোগ, ঝুঁকিতে শৈশব appeared first on ভোরের চেতনা.
