ফকিরহাট প্রতিনিধি।।
ভোরের আলো ফোটার আগেই ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে শুরু হয় যানবাহনের ছুটে চলা। বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান আর মোটরসাইকেলের সেই স্রোতের পাশেই জেগে ওঠে সড়কঘেঁষা জনপদ। দোকানি খোলেন ঝাঁপ, শিক্ষার্থীরা মাদ্রাসা-স্কুলের পথে নামে, কৃষক ভ্যানে তোলেন সবজি। কিন্তু এই চেনা দৃশ্যের নিচে চাপা পড়ে আছে এক নিরন্তর শঙ্কা, কখন কোন মোড়ে ঘটে যায় প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা।
ঢাকা থেকে ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ ও বাগেরহাট হয়ে খুলনায় পৌঁছানো এই মহাসড়ক দক্ষিণাঞ্চলের জীবনরেখা। খুলনা বিভাগ, মোংলা বন্দর ও আশপাশের জেলার পণ্য আর যাত্রী চলাচলের প্রধান পথ এটি। অথচ সেই সড়কেই এখন প্রায় প্রতিদিন ঝরছে প্রাণ। বাস-ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ, পেছন থেকে মোটরসাইকেলকে চাপা দেওয়া কিংবা সড়ক পার হতে গিয়ে পথচারীর প্রাণ হারানোর খবর এ অঞ্চলের মানুষের কাছে আর নতুন কিছু নয়।
সমপ্রতি বাগেরহাটের ফকিরহাট এলাকা ঘুরে দেখা যায়, দূরপাল্লার বাস, ভারী ট্রাক, মাইক্রোবাস, প্রাইভেট কার সহ অসংখ্য ভারী যানবাহন ছুটছে প্রবল গতিতে। বাজার বা মোড়ে এলেও গতি কমানোর লক্ষণ নেই। সড়কের পাশে নেই পর্যাপ্ত সার্ভিস লেন কিংবা নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ধীরগতির যান আর দ্রুতগতির বাস একই লেনে চলার কারণে ওভারটেকের প্রবণতা বাড়ছে, আর সেটাই ডেকে আনছে বড় বড় দুর্ঘটনা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সড়কঘেঁষা অপরিকল্পিত স্থাপনা, অবৈধ সংযোগ সড়ক, চালকদের বেপরোয়া গতি, দীর্ঘ পথ চালানোর ক্লান্তি এবং রাতে অপর্যাপ্ত আলো। সব মিলিয়ে সড়কটি পরিণত হয়েছে এক ঝুঁকিপূর্ণ পথে।
এই আতঙ্কের কথা শোনা গেল এলাকার বাসিন্দা সাংবাদিক মাসুম বিল্লাহ এর কণ্ঠে। তিনি বলেন, “সড়কটি অনেক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার আশঙ্কা নিয়ে আমরা চলাচল করি।”
শুধু আশঙ্কাই নয়, সড়কটির উন্নয়ন নিয়ে অনিশ্চয়তাও বাড়ছে মানুষের মনে। স্থানীয় বাসিন্দা মো. মোফাজ্জেল হোসেন মনা বলেন, “আমরা শুনেছি সড়কটির কাজ শুরু হওয়ার কথা, কিন্তু এখনো কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। প্রতিনিয়ত ঝরে যাচ্ছে তাজা প্রাণ।”
এলাকাবাসীর দাবি স্পষ্ট। তাঁরা চান মহাসড়কটি দ্রুত ৬ লেনে উন্নীত করা হোক, জনবহুল মোড় ও হাটবাজারে নির্মিত হোক আন্ডারপাস ও ওভারপাস, আর চালকদের জন্য নিশ্চিত করা হোক নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও কঠোর নজরদারি। তাঁদের মতে, শুধু লেন বাড়ালেই হবে না, ধীর ও দ্রুতগতির যান আলাদা করার ব্যবস্থাও রাখতে হবে।
দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতি, কৃষিপণ্যের সরবরাহ ও বন্দরের কার্যক্রম অনেকটাই নির্ভর করছে এই সড়কের ওপর। যানবাহনের চাপ যে হারে বাড়ছে, তাতে বর্তমান কাঠামো দিয়ে আর চলা সম্ভব নয়। প্রতিটি দুর্ঘটনার পেছনে লুকিয়ে থাকে একটি পরিবারের হাহাকার, একটি অসমাপ্ত স্বপ্নের গল্প। তাই ৬ লেনের দাবি এখন আর শুধু উন্নয়নের প্রশ্ন নয়, এটি মানুষের নিরাপদে বাড়ি ফেরার দাবি।
