বাংলাবাজারে পা রাখতেই ভেসে আসে ছাপাখানাগুলো থেকে প্রিন্টিং মেশিনের খটখট শব্দ। যেকোনো গলিতে হাঁটলেই বইয়ের চেনা গন্ধ পিছু ছাড়বে না। এক গলি গিয়ে মিশেছে অন্য গলিতে, আর এই গোলকধাঁধায় হারিয়ে যাওয়া যতটা সহজ, সেখান থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজে পাওয়া ততটাই কঠিন। সরু গলিগুলোর দুপাশে সারিবদ্ধ দোকান। সেলফের পর সেলফ সাজানো রয়েছে বিভিন্ন প্রকাশনীর বইয়ে।
দেশভাগের সমীকরণে গড়ে ওঠা এক বাজার
দেশের সর্ববৃহৎ বইয়ের বাজার 'বাংলাবাজার' মুঘল আমলের আগেই পুরান ঢাকার অংশ হিসেবে গড়ে উঠেছিল। তৎকালীন এই এলাকাটি ব্যবসা-বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। পরবর্তীতে, পশ্চিম দিকে শহর বাড়তে থাকলে চকবাজার একটি বড় বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। কিন্তু বইয়ের কেন্দ্র হিসেবে বাংলাবাজার তার স্বকীয় স্থান ধরে রাখে। ঐ সময়ের কয়েকজন পরিব্রাজক এই এলাকাটিকে 'বেঙ্গালা নগর' হিসেবে উল্লেখ করেন। প্রচলিত একটি ধারণা অনুযায়ী, এই 'বেঙ্গালা নগর' শব্দটি থেকেই পরবর্তীতে 'বাংলাবাজার' নামের উৎপত্তি হয়ে থাকতে পারে।
তবে লেখক মুনতাসীর মামুনসহ অন্যান্যদের মতে এর পেছনের ব্যাখ্যাটি ভিন্ন। প্রথম থেকেই এই এলাকায় বাঙালিরা বসবাস করতেন এবং সেখানে একটি বাজার গড়ে তুলেছিলেন—যার ওপর ভিত্তি করেই 'বাংলাবাজার' নামের উৎপত্তি। বাঙালিদের হাত ধরে গড়ে ওঠা এই বইয়ের বাজার বছরের পর বছর ধরে কলেবরে অনেকটাই বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে বইয়ের সাথে বাংলাবাজারের এই পথচলা হঠাৎ করে গড়ে ওঠেনি এর পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ ইতিহাস।
১৬১০ সালে মুঘল সুবাদার প্রথম ইসলাম খান বাংলা সুবার (প্রদেশ) রাজধানী রাজমহল থেকে ঢাকায় স্থানান্তর করেন। পরবর্তীতে ১৮৬০ সালে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় 'বাংলা যন্ত্র' নামে এক ছাপাখানা। ১৮৬৫ থেকে ১৯০০ সালের মধ্যে কলকাতার বটতলার পুথি সংস্কৃতির প্রভাবে বাংলাবাজারের পার্শ্ববর্তী চকবাজারে অগণিত মুসলিম পুথি আত্মপ্রকাশ করে এবং গড়ে ওঠে 'কেতাবপট্টি' নামে একটি স্বতন্ত্র বইয়ের কেন্দ্র। মূলত এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাই বইয়ের সাথে বাংলাবাজারের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল।
১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ এবং ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে যে জোয়ার তৈরি হয়েছিল, তার প্রভাব পড়েছিল বাংলাবাজারেও। লেখক ও সাহিত্যিকরা মতবিনিময় এবং আড্ডার জন্য এই এলাকায় জড়ো হতে শুরু করেন। ১৯২৫ সালে বাংলাবাজারের ২৬ নম্বর ভবন থেকে বুদ্ধদেব বসুর প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'মর্মবাণী' প্রকাশিত হয়েছিল।
পরবর্তী দশকগুলোতেও সাহিত্যিক আড্ডার সেই ঐতিহ্য বাংলাবাজারে অব্যাহত ছিল। 'স্টুডেন্ট ওয়েজ'-এর বর্তমান স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ লিয়াকত উল্লাহর ছেলে মাশফিকুল্লাহ তন্ময় জানান, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, সৈয়দ শামসুল হক, হুমায়ূন আহমেদসহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব বিভিন্ন সময়ে তাদের দোকানে আসতেন।
তবে ১৯৪৭ সালের দেশভাগই মূলত এই বইয়ের বাজারকে নতুন রূপ দিয়েছিল। অবিভক্ত ভারতে প্রকাশনা শিল্প ছিল মূলত কলকাতাকেন্দ্রিক, আর পূর্ব বাংলার মানুষ বিক্রির জন্য সেখান থেকেই বই নিয়ে আসতেন। কিন্তু দেশভাগের পর স্থানীয় প্রকাশনা শিল্প যেন এক নতুন প্রাণ খুঁজে পায়।
বাংলাবাজারের প্রকাশনা ব্যবসার বিকাশ
১৯৫০-এর দশকে নওরোজ কিতাবিস্তান, স্টুডেন্ট ওয়েজ, গ্রেট ইস্ট লাইব্রেরি, আল হামরা লাইব্রেরি এবং মালিক লাইব্রেরির মতো সৃজনশীল প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোর হাত ধরে বাংলাবাজারে বই ব্যবসার মূল ভিত তৈরি হয়। এসময় 'মল্লিক ব্রাদার্স' কলকাতা থেকে স্থানান্তরিত হয়ে পূর্ব পাকিস্তানে প্রকাশনা ব্যবসা শুরু করে।
সেসময় সৃজনশীল বইয়ের চেয়ে পাঠ্যবইয়ের বিক্রি বেশি হতো এবং বাংলাবাজারের প্রকাশনা ব্যবসা কলকাতার সাহিত্যকর্মের ওপর বেশি নির্ভরশীল ছিল। অনেক প্রকাশকেরাই ছিলেন স্বয়ং সাহিত্যিক। শিশুসাহিত্যিক মোহাম্মদ নাসির আলী 'নওরোজ কিতাবিস্তান'-এর দায়িত্বে ছিলেন, মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ ছিলেন 'স্টুডেন্ট ওয়েজ'-এর মালিক এবং কবি মঈনুদ্দিন পরিচালনা করতেন 'আল হামরা লাইব্রেরি'। এর মাধ্যমে প্রকাশনা এবং সাহিত্যের মধ্যে এক নিবিড় যোগসূত্র তৈরি হয়।
১৯৬০-এর দশকে পূর্ব পাকিস্তান পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের গঠন বাংলাবাজারের বিকাশকে আরও ত্বরান্বিত করে, বিশেষ করে পাঠ্যবই, ধর্মীয় প্রকাশনা এবং শিক্ষামূলক বইয়ের ক্ষেত্রে। সেসময় বাজারটিতে মূলত একতলা দোকান ছিল—যার কিছু টিনশেড এবং কিছু চুন, মাটি ও সুরকি দিয়ে তৈরি। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর রড-কংক্রিটের নির্মাণকাজ শুরু হয়। তখন শুধু প্রধান রাস্তার ধারেই দোকানগুলো ছিল, ভেতরের গলিগুলোতে কোনো স্থাপনা ছিল না। এমনকি মান্নান মার্কেট থেকে বুড়িগঙ্গা নদীও দেখা যেত।
সোনালী দিনের স্মৃতিচারণ
সময়ের পরিক্রমায় টিনশেড ও চৌচালা ঘরগুলোর জায়গা দখল করে নিয়েছে বহুতল মার্কেট। এক ও দুই তলা ভবনগুলো ধীরে ধীরে উঁচুতে উঠেছে, আর পুরো এলাকা জুড়ে গড়ে উঠেছে তিন-চার তলাসহ বড় বড় বাণিজ্যিক ভবন। এর মধ্যে মান্নান মার্কেট অন্যতম পরিচিত একটি নাম। এর পাশাপাশি রয়েছে ইসলামী টাওয়ার, গিয়াস গার্ডেন মার্কেট, কওমি মার্কেট, বই বিচিত্রা মার্কেট এবং আরও অনেক স্থাপনা।
বাংলাবাজারের প্রকাশনা ব্যবসা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মূলত বংশপরম্পরায় চলে আসছে। অনেকেই তাদের পারিবারিক ব্যবসা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন, আবার কেউ কেউ বিভিন্ন প্রকাশনা হাউসে কাজ করে দক্ষতা অর্জন করার পর নিজের দোকান দিয়েছেন। 'শাহ আলী (র.) লাইব্রেরি'র স্বত্বাধিকারী আমজাদ হোসেন ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই বই ব্যবসার সাথে যুক্ত আছেন। বাজারের ধুলোবালি আর বইয়ের ঘ্রাণেই কেটেছে তার জীবনের সিংহভাগ সময়।
১৯৭৫ সাল পর্যন্ত সাধারণ খুচরা ক্রেতারা নিয়মিত এখান থেকে বই কিনতেন। তবে বর্তমানে এই বাজারটি মূলত একটি পাইকারি বইয়ের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত, যেখান থেকে দেশের প্রতি কোণায় সহায়ক পাঠ্যবই ও সৃজনশীল বই সরবরাহ করা হয়। বাংলাবাজারের বেশ কয়েকজন সৃজনশীল প্রকাশকের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, একসময় এখানে প্রতিদিন প্রায় ৬ থেকে ৭ লক্ষ টাকার বই লেনদেন হতো।
বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির সহকারী হিসাবরক্ষক তুরাজ সাহা বলেন, 'চৈত্র সংক্রান্তি থেকে পহেলা বৈশাখ পর্যন্ত সময়ে বিক্রি কখনো কখনো প্রায় ৪০ লক্ষ টাকায় পৌঁছাতো।' তবে পাঠ্যবইয়ের বিক্রির সুনির্দিষ্ট কোনো হিসাব কেউ দিতে পারেননি। তারা কেবল এটুকু বলেছেন, 'প্রতিদিন ১ কোটি টাকারও বেশি।' আহমেদ পাবলিশিং হাউসের এক প্রবীণ কর্মী পুরনো দিনের কথা স্মরণ করে বলেন, 'আমাদের দম ফেলার ফুসরত ছিল না। কথা বলার সময়ও পেতাম না! আমরা প্রতিদিন ৬-৭ লক্ষ টাকার বেশি বই বিক্রি করতাম।'
বর্তমানে বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির সদস্য সংখ্যা ১ হাজারের বেশি। কম্পোজিশন, প্রিন্টিং, পেস্টিং, বাঁধাই ও ল্যামিনেশন—সব মিলিয়ে বাংলাবাজারের এই বিশাল বই শিল্প কেন্দ্র ও এর আশেপাশের এলাকায় ১ লক্ষেরও বেশি মানুষ জীবিকা নির্বাহ করছেন।
একসময় বাংলাবাজারের বইয়ের দোকানগুলো মূলত নর্থব্রুক হল রোডকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। সে দিনগুলো এখন আর নেই। সময়ের সাথে সাথে এই বাজারটি আরও বিস্তৃত হয়েছে এবং নর্থব্রুক হল রোড ও পরিদাস রোড ছাড়িয়ে হেমেন্দ্র চন্দ্র দাস রোড পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। তবে ক্রমবর্ধমান পাঠক সমাজ এখন অনলাইন বুকশপ থেকে বই কেনায় ঝুঁকছে, যার ফলে শতবর্ষী এই ঐতিহ্য এক কঠিন বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়েছে।
পরিবর্তনশীল বাজারের সাথে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা
অতীতে বাংলাবাজারের যে চেনা ব্যস্ততা ছিল, তার অনেকটাই এখন থমকে গেছে। পাইকারি ব্যবসায়ীদের কথা থেকে ফুটে ওঠে এক হতাশাজনক চিত্র। তাদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে কেনাবেচা প্রায় ৮০ শতাংশই কমে গেছে।
সারাদিন পার হয়ে গেলেও কিছু কিছু বইয়ের দোকানে একজন ক্রেতার দেখা পাওয়াও দুষ্কর হয়ে পড়েছে। একটানা বেশ কয়েকদিন কোনো বই বিক্রি না হওয়া যেন এখন স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনই এক নীরব দোকানে চারপাশে ছড়ানো-ছিটানো বইয়ের মাঝে এক বৃদ্ধ দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে বসে ছিলেন। তিনি 'কোরআন মহল'-এর স্বত্বাধিকারী, যিনি নিজের নাম প্রকাশ করতে চাননি। তিনি জানান, তার দোকানে টানা আট দিন ধরে একটি বইও বিক্রি হয়নি।
স্মার্টফোনের ব্যাপক ব্যবহার, বিনামূল্যে ই-বুক পাওয়ার সুযোগ, অনলাইনে সহজে বই কেনার সুবিধা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্রমাগত প্রসারও বাংলাবাজারের প্রথাগত বই বিক্রি আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ।
এই রূপান্তর বাংলাবাজারের শতবর্ষী প্রথাগত বই ব্যবসাকে পুরোপুরি মুছে দেয়নি, বরং ব্যবসার পরিচালনপদ্ধতিতে পরিবর্তন এনেছে। যে বাজারটি একসময় সম্পূর্ণভাবে এর সরু গলিগুলোতে ক্রেতাদের সরব উপস্থিতির ওপর নির্ভর করত, সেটি এখন গলির সীমানা ছাড়িয়ে দূর-দূরান্তের পাঠকদের কাছে পৌঁছাতে শিখছে।
