Published on
:
3 min read
রাত থেকেই পাড়ায় বন্ধ ঢাকের বোল। চারদিক থমথমে। রবিবার সপ্তমীর সকালে ঘোলা থানার উত্তর যোগেন্দ্রনগরের সমাদ্দার বাড়ির সামনে মানুষের জটলা। ভিতর থেকে ভেসে আসছে কান্নার রোল! গেটের সামনে গেলে স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে, থেকে থেকেই চিৎকার করে কেঁদে উঠছেন এক মহিলা, ‘ও সোনা তুই কোথায় গেলি। আমাকে আর কে মা ডাকবে?’ চোরবাগান সর্বজনীনের ঘটনা যে ১৯ জনের প্রাণ কেড়েছে, সেই তালিকায় নাম আছে ব্যারাকপুর-২ ব্লকের ঘোলা থানার অন্তর্গত বিলকান্দা-২ গ্রাম পঞ্চায়েতের উত্তর যোগেন্দ্রনগরের প্রিয়া সমাদ্দারেরও (১৮)।
এ বার পুজোয় দু’দিন সপ্তমী। প্রথম দিনই তাল কাটল। কলকাতার অন্যতম বড় পুজো চোরবাগান সর্বজনীনে ভিড়ে পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যু মিছিল। মুহূর্তে শেষ ১৯টি প্রাণ। এখনও হাসপাতালে যুঝছেন একাধিক। পুজোর শহরে এর আগেও এমন পরিস্থিতি হয়েছে যে প্যান্ডেল বন্ধ করে দিতে হয়েছে। দেশপ্রিয় পার্কের কথা নিশ্চয়ই মনে আছে? কিন্তু মৃত্যু মিছিল এই প্রথম!
এক নজরে
চোরবাগান পদপিষ্ট হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন উত্তর যোগেন্দ্রনগরের ১৮ বছরের প্রিয়া সমাদ্দার।
শনিবার দুপুর আড়াইটে নাগাদ পাঁচ-ছ’জন বন্ধুর সঙ্গে ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছিলেন প্রিয়া।
প্রথমে সন্তোষ মিত্র স্কোয়্যারের পুজো দেখে চোরবাগান সর্বজনীনে যান তিনি। পরিবারের দাবি, সেখানেই ভিড়ের মধ্যে পদপিষ্ট হন প্রিয়া।
প্রিয়ার বাবা শ্যামল সমাদ্দার ব্লাউজের কাটিংয়ের কাজ করেন। নিউ ব্যারাকপুরের এপিসি কলেজে বিএ প্রথম বর্ষের ছাত্রী ছিলেন প্রিয়া।
মেয়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে হাসপাতালে পৌঁছেও তাঁকে বাঁচাতে পারেননি বাবা-মা। দিদিকে হারিয়ে অসহায় প্রিয়ার ছোট বোনও।
প্রিয়ার পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, শনিবার দুপুর আড়াইটে নাগাদ পাঁচ-ছ’জন বন্ধুর সঙ্গে ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছিলেন প্রিয়া। প্রথমে সন্তোষ মিত্র স্কোয়্যারের ঠাকুর দেখেন। সেখান থেকে চোরবাগানে যান। পরিবারের দাবি, সেখানেই ভিড়ের মধ্যে পড়ে গিয়ে পদপিষ্ট হন প্রিয়া। তবে ঠিক কোন পরিস্থিতিতে এই দুর্ঘটনা ঘটেছিল, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
উত্তর যোগেন্দ্রনগরের ১৬ ফুটের রাস্তা এলাকায় ভাই ভাই সঙ্ঘের পাশে বাড়ি প্রিয়াদের। বাবা শ্যামল সমাদ্দার ব্লাউজ়ের কাটিংয়ের কাজ করেন। প্রিয়া নিউ ব্যারাকপুরের এপিসি কলেজে বিএ প্রথম বর্ষের ছাত্রী ছিলেন। তাঁর তিন বছরের বোনও আছে। বাবা-মায়ের বড্ড আদরের বড় মেয়ে। পরিবারের লোকেরা জানান, বাবা-মায়ের প্রথম সন্তান প্রিয়া। তাই ছোট থেকেই আদরে-আবদারে বড় হয়েছে। দুই মেয়ের মুখে হাসি ফোটাতে বাবা সারাদিন পরিশ্রম করেন। মা-ও সবটা আগলে রাখেন।
মেয়ের এই পরিণতি মানতেই পারছেন না বাবা-মা। থেকে থেকেই ডুকরে কেঁদে উঠছেন মা, ‘ছোট থেকেই কষ্ট সহ্য করতে পারে না আমার মেয়ে। কী কষ্টই না পেল আমার মেয়েটা।’ প্রিয়ার বাবা জানান, সন্ধে সাড়ে ৭টা নাগাদ মেয়ের এক বান্ধবীর ফোন আসে বাড়িতে। বলা হয়, প্রিয়া হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। দ্রুত তাঁরা বাড়ি থেকে বেরিয়ে হাসপাতালে পৌঁছন। তবে সেখানে গিয়ে মেয়েকে নিথর অবস্থায় দেখেন।
শিউলি ফোটা উৎসবের সকাল যে রাতের থেকেও অন্ধকার হবে, বিশ্বাসই করতে পারছেন না প্রিয়ার বাবা-মা। চোখ ঝাপসা পাড়ার লোকেরও। দুই মেয়েকে নিয়ে সমাদ্দার দম্পতির সুখের সংসারে এমন অভিশাপ নেমে আসবে, বিশ্বাসই হচ্ছে না তাঁদের।
বাড়ি জুড়ে কান্না, হাহাকার। বিছানায় বসে আছে প্রিয়ার সাড়ে তিন বছরের বোন। হাতে মোবাইল ফোন। হারানো-প্রাপ্তি বোঝার বয়স ওর হয়নি। তবে দিদির বড্ড নেওটা, যে দিদির সঙ্গে আর কোনও দিনও দেখা হবে না। আদর-খুনসুটি হবে না। দিদির ছায়ায় বেড়ে ওঠা হবে না। ফি বছর পুজো এলেই বুক কেঁপে উঠবে মা, বাবারও।
FAQ
১. প্রিয়া সমাদ্দার কে ছিলেন?
প্রিয়া সমাদ্দার উত্তর ২৪ পরগনার ব্যারাকপুর-২ ব্লকের ঘোলা থানার অন্তর্গত উত্তর যোগেন্দ্রনগরের ১৮ বছরের তরুণী ছিলেন। তিনি নিউ ব্যারাকপুরের এপিসি কলেজে বিএ প্রথম বর্ষে পড়তেন।
২. কী ভাবে মৃত্যু হয় প্রিয়া সমাদ্দারের?
পরিবারের দাবি, শনিবার বন্ধুদের সঙ্গে ঠাকুর দেখতে গিয়ে চোরবাগান সর্বজনীনের ভিড়ের মধ্যে পড়ে পদপিষ্ট হন প্রিয়া।
৩. কখন বাড়ি থেকে বেরোন প্রিয়া?
শনিবার দুপুর আড়াইটে নাগাদ পাঁচ-ছ’জন বন্ধুর সঙ্গে ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছিলেন তিনি। প্রথমে সন্তোষ মিত্র স্কোয়্যারের পুজো দেখে চোরবাগানে যান।
৪. প্রিয়ার মৃত্যুর খবর কী ভাবে পায় পরিবার?
সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা নাগাদ প্রিয়ার এক বান্ধবী বাড়িতে ফোন করে জানান, প্রিয়া হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। পরিবারের সদস্যরা হাসপাতালে পৌঁছলে ততক্ষণে সব শেষ।
৫. প্রিয়ার পরিবারে কারা রয়েছেন?
প্রিয়ার বাবা শ্যামল সমাদ্দার ব্লাউজের কাটিংয়ের কাজ করেন। তাঁর মা এবং তিন বছরের ছোট বোন রয়েছে। পরিবারের বড় মেয়ে ছিলেন প্রিয়া।