বাঁশখালীর ছেলে রেজাওনুল ইসলাম গণি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম, বাংলাদেশ ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার পদে নিয়োগ পরীক্ষায় সারা দেশে প্রথম। তবু বাবার চাওয়া পূরণ হয়নি। তাঁর এক কথা, ‘জুডিশিয়ারি হতে হবে।’ অবশেষে সেই স্বপ্ন পূরণের পথে এগিয়েছেন রেজাওনুল। ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় ১০৪তম হয়ে চূড়ান্তভাবে সিভিল জজ পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন তিনি।
রেজাওনুলের বাবা নিজামুল হক (৫৫) পটিয়া চৌকি আদালতের সেরেস্তাদার। তাঁর আদি বাড়ি চট্টগ্রামের বাঁশখালীর প্রেমাশিয়া গ্রামের মৌলভীপাড়ায়। একসময় সেখানে ছিল ভিটেমাটি, ফসলি জমি আর পূর্বপুরুষের স্মৃতিমাখা বসতি। কিন্তু সাঙ্গু নদীর ভাঙনে একে একে হারিয়ে গেছে সব। অভাব-অনটনের মধ্যেও সন্তানদের পড়াশোনা নিয়ে স্বপ্ন দেখেছেন নিজামুল। তাঁর ইচ্ছা ছিল, ছেলে চিকিৎসক হয়ে গ্রামের মানুষের সেবা করবে। সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। তখন লক্ষ্য স্থির করেছিলেন, ছেলেকে বিচারক বানাতেই হবে।
ছোটবেলায় চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন রেজাওনুলও। গ্রামের মানুষের চিকিৎসাসেবার অভাব তাঁকে ভাবাত। কিন্তু এসএসসি পরীক্ষার সময় একটি দুর্ঘটনার কারণে প্রত্যাশার চেয়ে কম জিপিএ পাওয়ায় মেডিকেলে ভর্তির প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েন তিনি। ২০১৮ সালের মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় ২৬৫ নম্বরের মধ্যে ২৬৩ পেয়েও সরকারি মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ হয়নি। বেসরকারি মেডিকেলে পড়ার সামর্থ্যও ছিল না পরিবারের।
চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন পূরণ না হলেও থেমে যাননি রেজাওনুল। ২০১৬ সালে বাকলিয়া সরকারি উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ২০১৮ সালে হাজেরা তজু ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন তিনি। পরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে পড়ার সুযোগ পান। শেষ পর্যন্ত ভর্তি হন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে। সেখানে ভর্তি পরীক্ষায় তাঁর অবস্থান ছিল ১৮তম।
রেজাওনুল বলেন, ‘সব বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলাম। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগেও ভর্তির সুযোগ এসেছিল। সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয়েই মেধাতালিকায় ১০০ থেকে ১৫০-এর মধ্যে আমার নাম ছিল। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৮তম হয়ে আইন বিষয়ে পড়ার সুযোগ পাই।’
আইন পড়তে এসে একের পর এক সাফল্য ধরা দিতে থাকে রেজাওনুলের হাতে। ২০২৪ সালে স্নাতক শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর অ্যাওয়ার্ড পান তিনি। একই বছর প্রধানমন্ত্রীর স্বর্ণপদকের জন্য মনোনীত হন। পরে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার পদে নিয়োগ পরীক্ষায় সারা দেশে প্রথম হন। কিন্তু এত অর্জনের পরও বাবার প্রত্যাশা তখনো পূরণ হয়নি।
রেজাওনুল বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হলাম, তখন আব্বু-আম্মুকে ফোন করে খুশির খবর জানাই। কিন্তু আব্বু বললেন, যেদিন জুডিশিয়ারি হবি, সেদিন খুশি হব। বাংলাদেশ ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার পদেও আমি সারা দেশে প্রথম হয়েছিলাম। তখনো বাবা বলেছিলেন, এটা হবে না, জুডিশিয়ারি হতে হবে।’
বাবার সেই কথাই একসময় নিজের লক্ষ্য করে নেন রেজাওনুল। তাঁর বন্ধু রোবায়েত ১৭তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বিচারক হন। বন্ধুর পাসপোর্ট সাইজের ছবির পেছনে রেজাওনুল লিখে রাখেন, ১৮তম বিজেএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বিচারক হবেন। ছবিটি রাখতেন মানিব্যাগে।
কিন্তু প্রথম চেষ্টাতেই সফল হননি তিনি। ১৭তম বিজেএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেননি। ব্যর্থতার হতাশা কাটিয়ে আবার পড়ার টেবিলে ফেরার প্রেরণা হয়ে ওঠে মানিব্যাগে রাখা সেই ছবি, যার পেছনে লেখা ছিল নিজের কাছে দেওয়া প্রতিজ্ঞা।
রেজাওনুল বলেন, ‘১৭তম পরীক্ষায় প্রিলিমিনারি পাস করতে পারিনি। তিন-চারটি প্রশ্ন ভুল হয়েছিল। যখন সবাই আনন্দ করত, আমি তা পারতাম না। তখন মানিব্যাগ থেকে বন্ধুর ছবিটি বের করে পেছনে লেখা কথাগুলো দেখতাম। ভাবতাম, দিনশেষে নিজের কাছে দেওয়া কথা আমাকে রাখতেই হবে। তাই পড়াশোনার মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিয়েছিলাম।’
১৮তম বিজেএসের প্রস্তুতিও ছিল কঠিন। পরীক্ষার আগে সিলেবাস শেষ করতে গিয়ে দিনে তিন ঘণ্টার বেশি ঘুমাতে পারতেন না বলে জানান তিনি। পড়াশোনার চাপে কখনো বন্ধুদের সঙ্গে মনোমালিন্য হলেও আবার বই নিয়ে বসতেন। রেজাওনুল বলেন, ‘জুডিশিয়ারির পরীক্ষা খুব কঠিন। এমন দিন গেছে, বন্ধুদের সঙ্গে ঝগড়া হয়ে গেছে, মাথা গরম হয়ে গেছে। আবার বই হাতে নিয়ে পড়তে বসেছি। পরীক্ষার ১০ দিন আগে মনে হতো, প্রতিদিন তিন ঘণ্টার বেশি ঘুমাতে পারতাম না। কারণ, সিলেবাস অনেক বড়।’
এ সময় বাবা-মায়ের দোয়া তাঁকে সাহস জুগিয়েছে। মা তাঁর জন্য তাহাজ্জুদ নামাজ পড়েছেন, রেখেছেন রোজা। রেজাওনুল বলেন, ‘আব্বু-আম্মু নামাজ পড়ে আমার জন্য দোয়া করতেন। মা আমার জন্য তাহাজ্জুদ নামাজ পর্যন্ত পড়েছেন। বড় ভাইও একদিন তাহাজ্জুদ নামাজ বাদ দেননি। মা আমার জন্য অনেক রোজা রেখেছেন। মা-বাবার দোয়া আল্লাহ কখনো ফিরিয়ে দেন না—এ কথায় আমি বিশ্বাস করি।’
বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে রেজাওনুল ইসলাম গণি কখনো আবাসিক হলে থাকেননি। পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখা এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকার কথা ভেবেই বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছাকাছি ভাড়া বাসায় থাকতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে তাঁর জন্য কক্ষ বরাদ্দ হলেও সেখানে ওঠেননি। বাবাও চেয়েছিলেন, ছেলে যেন নির্বিঘ্নে পড়াশোনা করতে পারে।
রেজাওনুল বলেন, ‘হলে থাকলে রাজনীতিতে যেতে হবে, মিছিল-মিটিংয়ে অংশ নিতে হবে-এমন একটা চাপ ছিল। আমার অনেক বন্ধু এই পরিস্থিতিতে আটকে গিয়েছিল। আমি রাজনীতি থেকে দূরে থাকতাম। কারণ, রাজনীতি আমার ভালো লাগত না। বাবাও আমাকে রাজনীতি থেকে দূরে থেকে পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ দিতেন।’
এখন নতুন অর্জনের অনুভূতি জানতে চাইলে রেজাওনুল বলেন, ‘অনুভূতির চেয়ে দায়িত্বটা বেশি। একজন বিচারক হিসেবে যদি ভুল রায় দিই, অন্যায় করি, তাহলে কেয়ামতের দিন জবাবদিহি করতে হবে। জনগণকে যদি জবাব দিতে না পারি, তাহলে আল্লাহকে কীভাবে জবাব দেব?’
নিজের দায়িত্ববোধের কথা বলতে গিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘রাষ্ট্র আমাকে জনগণের বিচার করার দায়িত্ব দিচ্ছে। আমি যদি ভুল বিচার করি, তাহলে জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকব। স্রষ্টার কাছেও দায়বদ্ধ থাকব, নিজের নীতি-নৈতিকতার কাছেও দায়বদ্ধ থাকব। তাই আমার এলাকার মানুষ, উপজেলার মানুষ-সবার কাছে দোয়া চাই, যেন নিজের ওপর অর্পিত দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করতে পারি।’
খেয়ে না খেয়ে সন্তানদের জন্য বাবা নিজামুল হকের সংগ্রাম
১৯৯৬ সালে জীবিকার সন্ধানে চট্টগ্রাম শহরে আসেন নিজামুল হক। তখন নতুন বিয়ে করেছেন, সঙ্গে বিয়ের দেনা-পাওনাও ছিল। সব মিলিয়ে সম্বল ছিল মাত্র ১ হাজার ২২০ টাকা। শহরে টিকে থাকার লড়াইয়ে এমন দিনও গেছে, ভাত না খেয়ে সাতটি বাটারবান খেয়ে কাটাতে হয়েছে দিন।
নিজামুল হকের জীবনে অভাব আর নদীভাঙনের ক্ষতি পাশাপাশি। সাঙ্গু নদীতে হারিয়েছে তাঁদের বাড়িভিটা, ফসলি জমি, এমনকি পারিবারিক কবরস্থানও। চার ভাই প্রেমাশিয়া ছেড়ে পুকুরিয়া ইউনিয়নে পাহাড়ে টিনশেড বাড়ি করে বসবাস শুরু করেন। সেখানে বিভিন্ন গ্রামের মানুষ এসে বসতি গড়েছিলেন। নতুন পরিবেশে সবার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াও সহজ ছিল না। তবু সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন তাঁরা। ২০১৪ সালে পরিবারটি চন্দ্রপুর এলাকায় চলে আসে। পরে জীবিকার প্রয়োজনে চট্টগ্রাম শহরে এসে বাদুরতলায় ভাড়া বাসায় ওঠেন নিজামুল।
নিজের সংগ্রামের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘যে নিজে চেষ্টা করে, আল্লাহ তার সহায়ক হন। মানুষ নিজেই নিজের মিস্ত্রি। আমি একজন ছোট চাকরিজীবী। আমার নুন আনতে পান্তা ফুরায়। […] এমন দিনও গেছে, একদিন ভাত না খেয়ে সাতটি বাটারবান খেয়ে দিন কাটিয়েছি।’
নিজের কষ্টের মধ্যেও সন্তানদের পড়াশোনায় আপস করেননি তিনি। প্রথমে ছেলেকে চিকিৎসক বানাতে চেয়েছিলেন গ্রামের মানুষের সেবার কথা ভেবে। পরে ছেলের বিচারক হওয়ার স্বপ্নকে সমর্থন দিয়েছেন। রেজাওনুলের পড়াশোনার খরচ চালাতে পরিবার থেকে মাসে সাত থেকে দশ হাজার টাকা পাঠানো হতো। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় নিজের খরচ মেটাতে টিউশনিও করতেন তিনি।
সন্তানদের জন্য সম্পদ রেখে যেতে না পারলেও শিক্ষাকেই সবচেয়ে বড় সম্পদ মনে করেন নিজামুল। তিনি বলেন, ‘আমি হয়তো সন্তানদের জন্য বিল্ডিং করে দিতে পারব না, কিন্তু লেখাপড়াই একটি বিল্ডিং, লেখাপড়াই একটি সম্পদ।’
সীমিত আয়ের কারণে পরিবারের দৈনন্দিন জীবনেও নানা সংকট ছিল। নিজামুল হক বলেন, ‘এমন সময়ও গেছে, বাজার-সদাই করতে পারিনি। আমার ছেলেরা এখনো মাছ-মাংস চায় না। আলুভর্তা পেলেই খুশি হয়ে যায়। তারা সাদাসিধে জীবনযাপনে বিশ্বাসী।’
নিজের আর্থিক অবস্থার কথা বলতে গিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘আমার মতো অনেক পেশকার-সেরেস্তাদার আছেন, যাঁদের দুই-তিনটি বিল্ডিং আছে। কিন্তু আমি কিছু করতে পারিনি। যেখানে কম ভাড়ায় ঘর পাওয়া যায়, সেখানে থাকছি।’
নদীভাঙনে সব হারানোর বেদনা আজও তাঁকে তাড়িয়ে বেড়ায়। নিজামুল বলেন, ‘আমি একসময় জমিদারের ছেলে ছিলাম। নদীভাঙনে ফকির হয়ে গিয়েছি। আমাদের গ্রামের মানুষ আমার আব্বা ও জেঠার কাছে জিজ্ঞেস করতেন, তোমাদের কবর কোথায় হবে? কিন্তু আজ আমাকে চিন্তা করতে হচ্ছে, আমার কবর কোথায় হবে? আমাদের কবরস্থানও নদীতে চলে গেছে।’
ছেলের সাফল্যে খুশি নিজামুল। তবে তাঁর কাছে সাফল্যের অর্থ শুধু বিচারক পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়া নয়; বরং সততা, সাহসিকতা ও দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করা। তিনি চান, ছেলে যেন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখেন। তাঁর ভাষায়, ‘একজন বিচারকের তিনটি গুণ থাকা দরকার-সততা, সাহসিকতা ও দক্ষতা। এই তিনটি গুণের সমন্বয়ে একজন বিচারক দায়িত্ব পালন করেন। এর কোনো একটি না থাকলে দায়িত্ব পালনে বিচ্যুতি ঘটতে পারে। এই গুণগুলো থাকলে সে আল্লাহর কাছেও গ্রহণযোগ্য হবে, মানুষের কাছেও সম্মান পাবে।’
সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও চার সন্তানের শিক্ষাজীবন এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন নিজামুল হক। নিজামুল হকের বড় ছেলে আরিফুল ইসলাম সরকারি সিটি কলেজ থেকে ফিন্যান্স বিভাগে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। তাঁর এক মেয়ে সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজে স্নাতক পর্যায়ে পড়ছেন। ছোট মেয়ে পড়ছেন কৃষ্ণকুমারী সিটি করপোরেশন বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণিতে।
The post সেরেস্তাদার বাবার স্বপ্নপূরণ, ছেলে হচ্ছেন সিভিল জজ appeared first on সুপ্রভাত বাংলাদেশ.
