প্রায় এক বছর পর খুলনার শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির তদন্ত শেষ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গত ১৯ অক্টোবর দুই ঠিকাদার এবং কেডিএ’র ৬ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলার অনুমোদন দিয়েছে কমিশন। আগামী রোববার দুদকের খুলনা জেলা কার্যালয়ে মামলাটি দায়ের করা হবে।
তবে অনুমোদিত আসামির তালিকায় কেডিএ’র সাবেক চেয়ারম্যান, সদস্যদের নাম না থাকায় বিষ্ময় প্রকাশ করেছেন অনেকে। আবার এই অনিয়মে যুক্ত না হয়েও অনেককে আসামি করা হয়েছে। অভিযুক্তদের মধ্যে প্রথমসারির ব্যক্তিরা বাদ পড়ায় পুরো প্রক্রিয়াই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন নাগরিক নেতারা। তারা নতুন করে তদন্তের দাবি তুলেছেন।
কেডিএ থেকে জানা গেছে, শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন প্রকল্প একনেকে অনুমোদন পায় ২০১৩ সালের ৭ মে। শুরুতে প্রকল্প ব্যয় ছিল ৯৮ কোটি টাকা। দীর্ঘ ১৩ বছরেও সড়কটির কাজ শেষ হয়নি। উল্টো ব্যয় বেড়ে দাড়িয়েছে ২৮০ কোটি টাকা। এনিয়ে খুলনা গেজেটসহ জাতীয় ও আঞ্চলিক দৈনিকে অসংখ্য সংবাদ প্রকাশ হয়েছে। এমন সংবাদের প্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ওই সড়কে অভিযান চালায় দুদক। তারা সড়কের বিভিন্ন অংশের নমুনা সংগ্রহ করেন এবং অনিয়মের প্রমাণ পান। এর প্রেক্ষিতে গত জুলাই মাসে কমিশনে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। গত ১৯ অক্টোবর মামলার অনুমোদন দেওয়া হয়।
অনুমোদিত নথি অনুসারে আসামি করা হচ্ছে আতাউর রহমান খান লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও খুলনা শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন প্রকল্পের লিড পার্টনার মো. আতাউর রহমান, ঠিকাদারি কোম্পানি মাহাবুব ব্রাদার্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রকল্পের পার্টনার শেখ মাহাবুব রহমান, কেডিএর প্রধান প্রকৌশলী কাজী সাবিরুল আলম, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শামীম জেহাদ, প্রকল্প পরিচালক মো. আরমান হোসেন, নির্বাহী প্রকৌশলী মুনতাসির মামুন, সহকারী প্রকৌশলী বাসুদেব কুমার বিশ্বাস ও উপ-সহকারী প্রকৌশলী শরীফ ওয়াহিদুজ্জামান।
সূত্র জানায়, খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী ও সর্বময় প্রশাসনিক ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তি হলেন চেয়ারম্যান। সংস্থার প্রশাসনিক ও নীতিনির্ধারণী সমস্ত সিদ্ধান্ত তাঁর নেতৃত্বেই পরিচালিত হয়। প্রকল্প চলাকালীন কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তা চেয়ারম্যান ছিলেন।
দ্বিতীয় পর্যায়ে রয়েছেন সদস্যরা। রাজনৈতিক বিবেচনায় অরাজনৈতিক ব্যক্তি ও কর্মকর্তারা এই পদে দায়িত্ব পালন করেন। প্রকল্প চলাকালে ৬ জন কেডিএর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে প্রকল্পটি দেখাশোনা করেছেন। শিপইয়ার্ড সড়কের প্রতিটি বিল, সিদ্ধান্ত তাদের নির্দেশেই হয়েছে। নিচের কর্মকর্তারা এটা পালন করেছেন। প্রতিটি নথি, চেকে চেয়ারম্যান ও সদস্যের স্বাক্ষর রয়েছে। অথচ মামলায় তাদের কারও নাম আসেনি।
গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে জানা গেছে, গত ৯ জুন শিপইয়ার্ড সড়ক প্রকল্প তৃতীয় দফা সংশোধন ও ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি প্রকল্পটি বাস্তবায়নে গাফিলতি ও বিলম্বের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করার নির্দেশ দেন। ওই দিনই তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। গত ৩১ আগস্ট গৃহায়ণ সচিবের কাছে ৪০৪ পাতার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। মন্ত্রণালয়ের সুপারিশে তিন জন সদস্যসহ মোট ১৪ জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়। ওই সুপারিশেও কেডিএ চেয়ারম্যানদের নাম ছিল না। তবে তিন সদস্যকে অভিযুক্ত করা হয়।
কেডিএর কর্মকর্তা ও ঠিকাদাররা জানান, শিপইয়ার্ড সড়কের কাজ চলাকালে পুরো বিষয়টি দেখভাল করতেন চেয়ারম্যান ও সদস্যরা। সরকারি দলের প্রভাবশালী নেতা হওয়ায় ঠিকাদার মাহবুবুর রহমান প্রকল্পের প্রকৌশলীদের পাত্তা দিতেন না। কাজে কোন ভুল হয়েছে, এটা সংশোধন বা চিঠি দিতেও ভয়ে থাকতেন দায়িত্বরত প্রকৌশলীরা। কারণ ঠিকাদারের বিষয়ে কিছু বললেই চেয়ারম্যান ও সদস্যরা ডেকে পাঠাতেন। বিল থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের বেশিরভাগই তারা নিতেন।
সূত্রটি জানায়, অল্পকিছু দিন প্রকল্পে দায়িত্বে ছিলেন নির্বাহী প্রকৌশলী মুনতাসির মামুন। সৎ, বিনয়ী ও পরোপকারী হিসেবে বুয়েটের সাবেক এই ছাত্রের সুনাম রয়েছে। ওই অল্প কয়েকদিন দায়িত্ব পালনের জন্য তাকেও আসামি করা হয়েছে। অথচ মূল পরিকল্পনাকারী চেয়ারম্যান ও সদস্যরা কেউই আসামির তালিকায় নেই। যে কোনো প্রকল্পের অর্থ ছাড়ের আগে কেডিএর নিজস্ব অডিট টিম বিষয়টির তদন্ত করে। তাদের অজ্ঞাতসারে আর্থিক অনিয়ম সম্ভব না, মামলায় তাদেরও কেউ নেই।
কারণে জানতে চাইলে দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা আকতারুল ইসলাম কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এ ব্যাপারে খুলনা মহানগর নাগরিক ফোরামের কো-চেয়ারম্যান ও সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের মহানগর সাধারণ সম্পাদক সরদার আবু তাহের বলেন, পুরো বিষয়টি দুঃখজনক। দীর্ঘ ১৩ বছর যারা মানুষকে কষ্ট দিয়েছে শিপইয়ার্ড সড়কের অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িত সকলের বিরুদ্ধে দৃষ্টিমূলক আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে পুনঃতদন্ত করতে হবে।
খুলনা গেজেট/এএজে
