রকমারি ডেস্ক: পর্যটন মানেই অবকাশযাপন, নতুন জায়গা ঘুরে দেখা কিংবা প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কর্মসংস্থান, স্থানীয় অর্থনীতি, সংস্কৃতির বিকাশ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি। বাংলাদেশের মতো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ দেশের জন্য পর্যটন তাই কেবল বিনোদনের বিষয় নয়, এটি অর্থনৈতিক সম্ভাবনারও গুরুত্বপূর্ণ একটি ক্ষেত্র।
বিশ্ব ভ্রমণ ও পর্যটন পরিষদের (ডব্লিউটিটিসি) হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ভ্রমণ ও পর্যটন খাতের অবদান ছিল ২ দশমিক ৯ শতাংশ। একই সময়ে দেশের মোট কর্মসংস্থানের ৪ দশমিক ২ শতাংশের সঙ্গে যুক্ত ছিল এই খাত। এ ছাড়া ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক পর্যটন থেকে আয় হয়েছে প্রায় ৪৪ কোটি ৪৭ লাখ মার্কিন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ১৩ দশমিক ৫২ শতাংশ বেশি।
এই পরিসংখ্যানের পেছনে রয়েছে অসংখ্য মানুষের জীবিকা। পর্যটনকেন্দ্রের হোটেল ও রেস্তোরাঁর কর্মী, পরিবহনশ্রমিক, রিকশাচালক, নৌকার মাঝি, পর্যটক গাইড, হস্তশিল্প বিক্রেতা, খাবারের দোকানি থেকে শুরু করে স্থানীয় কৃষকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল। পর্যটকের আনাগোনা বাড়লে তাদের আয় ও স্থানীয় ব্যবসার সুযোগও বাড়তে পারে। তাই একটি পর্যটনকেন্দ্রের বিকাশ আশপাশের এলাকার অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
বাংলাদেশের পর্যটন খাতের সামনে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, নদীভাঙন, অতিবৃষ্টি কিংবা উপকূলীয় পরিবেশের পরিবর্তন পর্যটনকেন্দ্রের অবকাঠামো ও স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করতে পারে। কোনও এলাকায় দুর্যোগের কারণে পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেলে শুধু পর্যটন ব্যবসায়ীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হন না। এর প্রভাব পড়ে পরিবহন, খাবারের দোকান, স্থানীয় পণ্য বিক্রি এবং অন্যান্য সহায়ক পেশাতেও।
বিশেষ করে যেসব এলাকার মানুষের আয়ের বড় অংশ পর্যটকের উপস্থিতির ওপর নির্ভরশীল, সেখানে পর্যটন কার্যক্রম দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে পরিবারগুলোর আর্থিক নিরাপত্তা নড়বড়ে হয়ে উঠতে পারে। যেমন আমাদের দেশের সেন্টমার্টিন দ্বীপ। এই দ্বীপ পুরোটাই পর্যটন নির্ভার। এরপরই বলা যায় কক্সবাজারের কথা। এই জেলার ৯০ শতাংশ মানুষের পেশা ও জীবনযাত্রা সমুদ্রনির্ভর পর্যটন ঘিরে। তাই পর্যটনকেন্দ্রের ক্ষয়ক্ষতিকে অবকাঠামোগত ক্ষতি হিসাবে দেখলে চলবে না। এর সঙ্গে স্থানীয় মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানের বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।
বাংলাদেশে সমুদ্রসৈকত, পাহাড়, বন, হাওর, নদী, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও ঐতিহ্যবাহী জনপদকে ঘিরে পর্যটনের নানা সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এই সম্ভাবনাকে টেকসই অর্থনৈতিক সুযোগে পরিণত করতে হলে পরিকল্পিত উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ, নিরাপদ যাতায়াত, পরিচ্ছন্নতা, মানসম্মত সেবা এবং স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।
পর্যটনকেন্দ্রের উন্নয়নে স্থানীয় বাসিন্দাদের সম্পৃক্ত করা গেলে তাদের জন্য নতুন ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি স্থানীয় খাবার, হস্তশিল্প, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করলে এলাকার স্বতন্ত্র পরিচিতিও তুলে ধরা সম্ভব। তবে উন্নয়নের নামে প্রাকৃতিক পরিবেশ ও স্থানীয় সংস্কৃতির ক্ষতি হলে দীর্ঘ মেয়াদে পর্যটনের আকর্ষণই কমে যেতে পারে।
পর্যটনের সাফল্য শুধু কতজন মানুষ কোনও স্থানে বেড়াতে গেলেন, তা দিয়ে মাপা যায় না। সেই পর্যটন স্থানীয় মানুষের কতটা আয় বাড়ালো, কতটা কর্মসংস্থান তৈরি করলো, পরিবেশ ও সংস্কৃতিকে কতটা সুরক্ষিত রাখলো সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের পর্যটনকে দীর্ঘ মেয়াদে সমৃদ্ধ করতে হলে বিনোদনের পাশাপাশি জীবিকা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতাকেও উন্নয়নের কেন্দ্রে রাখতে হবে।
