প্রফেসর ড. শেখ আসিফ এস. মিজান :
আবহমান কাল ধরে বাংলার সামাজিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা, মায়া ও সৌহার্দ্যের এক গভীর ঐতিহ্য বিদ্যমান ছিল। রাজনৈতিক আদর্শ, মতাদর্শ ও পথের ভিন্নতা থাকলেও গ্রামীণ বা নাগরিক জীবনে পরস্পরের কুশল বিনিময় কিংবা একে অপরের সুখ-দুঃখের ভাগিদার হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো অলিখিত দেয়াল বা মনস্তাত্ত্বিক বাধা ছিল না। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের গতিপথ পর্যালোচনায় দেখা যায়, মহান স্বাধীনতা অর্জনের পর জাতীয় ঐক্যের যে অভূতপূর্ব সুযোগ তৈরি হয়েছিল, তা সুসংহত করার পরিবর্তে তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী একদলীয় ও কঠোর নিয়ন্ত্রণমূলক রাজনীতির সূচনা করে। বাকশাল গঠন করে সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা, ভিন্নমত ও মুক্ত গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধে মাত্র চারটি বাদে সব সংবাদপত্র বন্ধ করে দেওয়া, জাসদের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীকে বিচারহীনতার আওতায় নিয়ে আসা এবং বিপ্লবী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সিরাজ শিকদারকে হত্যার পর জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য দেওয়ার মতো ঘটনাবলি বাংলার ঐতিহ্যবাহী সম্প্রীতির রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক গভীর ক্ষত বা অপসংস্কৃতির জন্ম দেয়।
দীর্ঘ সময় ও বহু চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বাংলাদেশ যখন ক্রমান্বয়ে সামনের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, ঠিক তখনই রাষ্ট্রক্ষমতায় আরোহণ করেন শেখ হাসিনা। পূর্ববর্তী অপশাসনের নিষ্ঠুরতা ও দাম্ভিকতার যে রূপ নতুন প্রজন্মের অজানা ছিল, তা তারা প্রত্যক্ষ করে তাঁর দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনকালে। অধ্যাপক মোশতাক খানের প্রাতিষ্ঠানিক ও ‘পলিটিক্যাল সেটেলমেন্ট’ (রাজনৈতিক বন্দোবস্ত) তত্ত্বের আলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যখন কোনো ক্ষমতাশীল গোষ্ঠী নিজেদের অবৈধ অবস্থানকে দীর্ঘস্থায়ী করতে রাষ্ট্রের শাসনতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পদ্ধতিগতভাবে ধ্বংস করে, তখন সমাজে এক চরম রাজনৈতিক ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়। শেখ হাসিনা ঠিক এই পথেই হেঁটেছেন। বিচার বিভাগ, প্রশাসন ও নির্বাচন ব্যবস্থার মতো মেরুদণ্ডগুলোকে ভেঙে দিয়ে তিনি এক চরম ফ্যাসিবাদের জন্ম দেন। খুন, গুম, হামলা ও গায়েবি মামলার সংস্কৃতি চালুর মাধ্যমে নাগরিকদের জীবনকে করে তোলেন চরম ঝুঁকিপূর্ণ। তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে বানোয়াট মামলায় ফরমায়েশি রায়ের মাধ্যমে কারারুদ্ধ করে রাখা এবং স্বাধীনতার ঘোষক, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, বেগম খালেদা জিয়া ও তাঁদের জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমানকে লক্ষ্য করে প্রতিনিয়ত যে রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত কুরুচিপূর্ণ আক্রমণ চালানো হতো, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক শিষ্টাচারকে পুরোপুরি ধূলিসাৎ করে দেয়। তবে ইতিহাসের নির্মম সত্য হলো—স্বৈরাচারী শক্তির পতন অবশ্যম্ভাবী। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ওপর যখন নির্বিচারে রাষ্ট্রীয় বুলেট চালানো হলো, তখন আপামর জনতা রাজপথে নেমে আসে এবং এক অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানের মুখে ৫ আগস্ট ফ্যাসিবাদের অবসান ঘটে। এই ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে নেতৃত্বদানকারী ছাত্রনেতারা জাতির সামনে বীর হিসেবে আবির্ভূত হন।
রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে একটি ‘নতুন বন্দোবস্ত’ প্রতিষ্ঠার যে ঘোষণা তাঁরা দিয়েছিলেন, তা দেশের সাধারণ মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছিল। কিন্তু ইন্টারিম সরকারে ছাত্রনেতাদের সরাসরি যোগদানের প্রাথমিক পদক্ষেপ থেকেই এক ধরনের সংশয়ের সৃষ্টি হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জন ডিউই বলেছিলেন, “প্রতিটি প্রজন্মে গণতন্ত্রকে নতুন করে জন্ম নিতে হয় এবং শিক্ষাই হলো তার ধাত্রী”। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, যে গণঅভ্যুত্থানের মূল সূচনাবিন্দু ছিল কোটাবিরোধী আন্দোলন, সেখানে ক্ষমতা ও প্রভাবের বলয়ে এসে অনেকে নিজেই কোটার নতুন উপাসক হয়ে উঠেছেন। ইন্টারিম সরকারে মাঠপর্যায়ে বদলি, টেন্ডার, পদায়ন, মামলা, চাঁদা ও কমিশন বাণিজ্যের মতো যে নানাবিধ অভিযোগ ও অপরাধের খতিয়ান বিভিন্ন মাধ্যমে উঠে আসছে, তা সাধারণ মানুষকে তীব্রভাবে হতাশ করছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই নতুন বন্দোবস্তের প্রবক্তাদের রাজনৈতিক ভাষা, আচরণ এবং অঙ্গভঙ্গি। তাঁদের কর্মকাণ্ড ও শ্লোগানের ভাষা সমাজকে এক গভীর নৈতিক সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তাঁরা একটি কাঠামোগত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার করতে না পারলেও, অবক্ষয়গ্রস্ত ও অসহিষ্ণু একটি ‘নষ্ট প্রজন্ম’ তৈরি করছেন- যা সুশাসনের জন্য দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের হুমকি।
আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, এ দেশের ইতিহাস সুদীর্ঘ আন্দোলন ও সংগ্রামের ইতিহাস। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ কিংবা ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন-;প্রতিটি ঐতিহাসিক বাঁকে আমাদের রাজনৈতিক শ্লোগান, ভাষা ও সাংস্কৃতিক চেতনা ছিল পারমাণবিক বোমার মতোই শক্তিশালী, যা অপশক্তিকে পরাস্ত করেছিল। কিন্তু সেই ভাষা বা আচরণে কোনো প্রকার নোংরামি, কুরুচি কিংবা ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার প্রকাশ ছিল না। বরং শ্লোগান, সংগীত ও রাজনৈতিক ভাষা ছিল মর্মস্পর্শী, শক্তিশালী এবং মর্যাদাপূর্ণ। সেই ভাষা মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করেছে, সাহস জুগিয়েছে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর প্রেরণা দিয়েছে। তরুণ ও যুব সমাজের প্রতি আহ্বান থাকবে, আত্মঘাতী ও নোংরা ভাষা ব্যবহারের পথ পরিহার করে পূর্বসূরিদের সেই গৌরবময় শিষ্টাচার ও শালীনতার পথ অবলম্বন করুন। একটি সত্যিকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের দিকে এগিয়ে যান। মনে রাখবেন, ইতিহাসের সত্যকে অস্বীকার করলে—ইতিহাস কাউকেই ক্ষমা করে না।
লেখক: উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, সোমালিয়া এবং অপরাধবিজ্ঞান, সুশাসন ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ ।
The post রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নতুন বন্দোবস্তে নষ্ট প্রজন্ম সৃষ্টির আশঙ্কা appeared first on Dhaka Protidin.
