ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে (এমআইটি) একটি পাঠ্যক্রম চালুর প্রস্তাব থেকে শুরু হয়েছিল বিরোধ। তিন বছর পর সেই দ্বন্দ্ব এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগীয় সম্পর্ক, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ও যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে।
পাঠ্যক্রমটির নাম ছিল ‘ঔপনিবেশিকতা মুক্তকরণ, মুক্তি, শান্তি ও সম্প্রদায় গঠনের জন্য ভাষা ও ভাষাবিজ্ঞান ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের নদী থেকে সমুদ্র এবং হাইতির পর্বতমালা ও তার বাইরে।’ এর প্রস্তাবক এমআইটির স্থায়ী পদে থাকা ভাষাবিজ্ঞানের অধ্যাপক মিশেল দেগ্রাফ।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলার কয়েক মাস পর তিনি পাঠ্যক্রমটির ধারণা তৈরি করেন। ক্যাম্পাসে ফিলিস্তিনপন্থি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পক্ষে সোচ্চার শিক্ষকদের অন্যতম ছিলেন দেগ্রাফ। সেই আন্দোলনে ব্যবহৃত ‘নদী থেকে সমুদ্র পর্যন্ত’ স্লোগানকে কিছু ইহুদি ইহুদিবিদ্বেষী হিসেবে দেখেন।
এমআইটির একটি কমিটি শেষ পর্যন্ত পাঠ্যক্রমটি অনুমোদন করেনি। হাইতি ও ক্রেওল ভাষাবিষয়ক গবেষক দেগ্রাফের প্রস্তাবিত বিষয়টি পড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলে কমিটি।
কিন্তু দেগ্রাফের কাছে সেখানেই বিষয়টির সমাপ্তি হয়নি। তিনি সিদ্ধান্তটির বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ই-মেইল পাঠিয়ে এটিকে ‘নতুন ম্যাকার্থিবাদ’-এর অংশ বলে অভিহিত করেন। ডিন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি পর্যন্ত অনেককে তিনি অভিযোগ জানান এবং পরে সেই ই-মেইল বিনিময়ের কিছু অংশ প্রকাশও করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মতামতধর্মী লেখাতেও তিনি সিদ্ধান্তটির সমালোচনা করেন।
শেষ পর্যন্ত এমআইটির বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় আদালতে মামলা করেন দেগ্রাফ। তাঁর অভিযোগ, গাজা নিয়ে ক্যাম্পাসে মতপ্রকাশের পরিসর সংকুচিত করা হচ্ছে এবং তাঁর শিক্ষাদান ও গবেষণার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘এমআইটির এভাবে আমার শিক্ষাদান বন্ধ করা উচিত নয়।’ সিদ্ধান্তটিকে নিজের ‘পেশাগত অধিকার লঙ্ঘন’ বলেও দাবি করেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয় এ অভিযোগ আদালতে অস্বীকার করেছে। এক নথিতে এমআইটি বলেছে, যেসব বিষয়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার অভিযোগ দেগ্রাফ করছেন, সেসব নিয়েই তিনি এখনো প্রকাশ্যে ব্যাপকভাবে কথা বলছেন।
বিরোধ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর সমালোচকও বেড়েছে। এক সাবেক ইহুদি শিক্ষার্থী তাঁর বিরুদ্ধে হয়রানির অভিযোগে মামলা করেন। গত বসন্তে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের একটি কমিটির প্রতিবেদনে দেগ্রাফের বিরুদ্ধে ‘ইহুদিবিদ্বেষী ষড়যন্ত্রতত্ত্ব ছড়িয়ে দেওয়ার’ অভিযোগও আনা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও তাঁর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে। অভিযোগ ছিল, তিনি কর্মপরিবেশে বিঘ্ন ঘটিয়েছেন এবং নিয়ম ও নির্দেশনা লঙ্ঘন করেছেন। তাঁকে ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ থেকে সরিয়ে ‘বিভাগের বাইরে কর্মরত শিক্ষক’ নামে একটি পদে রাখা হয়। দেগ্রাফ নিজের ই-মেইল স্বাক্ষরে পদবিটি ব্যঙ্গাত্মকভাবে উদ্ধৃতিচিহ্নে লিখে থাকেন।
তাঁর দাবি, নির্ধারিত বেতন বৃদ্ধি থেকে তাঁকে বঞ্চিত করা হয়েছে, নতুন শিক্ষার্থীদের পরামর্শদাতা হতে দেওয়া হচ্ছে না এবং বিভাগের ফেসবুক পাতা থেকেও সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। টানা তৃতীয় শরৎকালীন শিক্ষাবর্ষে কোনো ক্লাস না পড়িয়েও তিনি বেতন পাচ্ছেন বলেও জানান।
২০২৪ সালের শেষ দিকে মানবিক, শিল্পকলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন আগুস্তিন রায়ো এক চিঠিতে জানান, দেগ্রাফকে সাময়িকভাবে বিভাগ থেকে সরানো হচ্ছে। কারণ হিসেবে কর্মপরিবেশে বিঘ্ন এবং তাঁকে অসন্তুষ্ট করা ব্যক্তিদের প্রকাশ্য আলোচনায় লক্ষ্যবস্তু হওয়ার আশঙ্কার কথা বলা হয়। চিঠিতে লেখা ছিল, ‘আপনার মতপ্রকাশের অধিকার আপনাকে এমআইটির নিয়মের ঊর্ধ্বে স্থান দেয় না।’
দেগ্রাফের বিরুদ্ধে অভিযোগকারী সাবেক শিক্ষার্থী উইলিয়াম সাসম্যান ২০২৫ সালে তাঁর ও এমআইটির বিরুদ্ধে মামলায় যুক্ত হন। তাঁর অভিযোগ, ইহুদি হওয়ার কারণে দেগ্রাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে লক্ষ্যবস্তু করেছেন এবং জায়নবাদী ‘মানসিক সংক্রমণ’-এর উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছেন। সাসম্যানের দাবি, হয়রানির কারণেই তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়তে হয়েছে।
দেগ্রাফ অবশ্য বলেন, ‘মানসিক সংক্রমণ’ শব্দবন্ধটি তিনি একজন ইসরায়েলি গবেষকের কাছ থেকে নিয়েছেন, যিনি ইসরায়েলি পাঠ্যবইয়ে ফিলিস্তিনিদের প্রান্তিকীকরণ বোঝাতে এটি ব্যবহার করেছিলেন। তিনি নিজেকে ইহুদিবিদ্বেষী নন বলে দাবি করেন এবং বলেন, ইসরায়েলের সমালোচনা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইহুদিবিদ্বেষ নয়।
মামলার একটি অংশ ইতিমধ্যে খারিজ হয়েছে, যেখানে দেগ্রাফের বিরুদ্ধে আনা কিছু অভিযোগও ছিল। তবে সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ রয়েছে।
৬৩ বছর বয়সী দেগ্রাফের জন্ম হাইতির পোর্ট-অ-প্রিন্সে। কম্পিউটার বিজ্ঞান পড়তে যুক্তরাষ্ট্রে এলেও পরে তাঁর আগ্রহ কেন্দ্রীভূত হয় হাইতিয়ান ক্রেওল ভাষায়। পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর পিএইচডি গবেষণার বিষয়ও ছিল ক্রেওল ব্যাকরণ ও বাক্যগঠন। ১৯৯৬ সালে তিনি এমআইটির ভাষাবিজ্ঞান বিভাগে যোগ দেন।
হাইতির স্বাধীনতার ইতিহাস ও ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতার সংগ্রামের মধ্যে মিল দেখেন দেগ্রাফ। ২০২৩ সালের ৫ ডিসেম্বর এমআইটির সভাপতি স্যালি কর্নব্লুথসহ হার্ভার্ড ও পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতাদের কংগ্রেসে ইহুদিবিদ্বেষ নিয়ে কঠোর জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়তে দেখার দিনই তাঁর মাথায় পাঠ্যক্রমটির ধারণা আসে।
প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর ২০২৪ সালের শরতে তিনি সেটিকে অতিথি বক্তাদের নিয়ে আলোচনাভিত্তিক ধারাবাহিক কর্মসূচিতে রূপ দেন। একই বছর ক্যাম্পাসে ইসরায়েলের সঙ্গে এমআইটির সম্পর্ক ছিন্ন করার দাবিতে শিক্ষার্থীদের তিন সপ্তাহের অবস্থান কর্মসূচিতেও প্রায় প্রতিদিন উপস্থিত ছিলেন বলে জানান তিনি। পরে পুলিশ ওই কর্মসূচি তুলে দেয়।
গত মার্চে এমআইটির বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা করেন দেগ্রাফ। এবার কংগ্রেসের সেই কমিটি ও এর সভাপতিকেও আসামি করা হয়। তাঁর অভিযোগ, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার কারণেই তাঁকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, ‘আপনি যদি শিক্ষকদের চুপ থাকতে বলেন, তাহলে মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছেন। কারণ, কঠিন বিষয়গুলো নিয়ে শিক্ষা দেওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ।’
দেগ্রাফের বন্ধুরা অবশ্য তাঁর অবস্থানকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, মানবাধিকার ও ভাষার রাজনৈতিক ব্যবহারের প্রতি দীর্ঘদিনের আগ্রহের অংশ হিসেবে দেখেন। এমআইটির অবসরপ্রাপ্ত গণিত অধ্যাপক হেইনস মিলার বলেন, দেগ্রাফ ইহুদিবিদ্বেষী নন; অন্যায় মনে করলে তিনি সহজে হাল ছাড়েন না।
অন্যদিকে সিসেরো ইনস্টিটিউটের প্রধান কর্মকর্তা ক্রিস শার্পের মতে, কিছু স্থায়ী পদে থাকা শিক্ষক ব্যক্তিগত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে ‘একাডেমিক স্বাধীনতা’র আড়ালে উপস্থাপন করেন। তাঁর বক্তব্য, একাডেমিক স্বাধীনতার অর্থ সীমাহীনভাবে যেকোনো বিষয় পড়ানো নয়; বরং নিজস্ব বিশেষজ্ঞ ক্ষেত্রের মধ্যে স্বাধীনভাবে শিক্ষা ও গবেষণা করা।
বিতর্কের মধ্যেও দেগ্রাফকে বসন্তকালীন শিক্ষাবর্ষে তাঁর পুরোনো দুটি পাঠ্যক্রম ‘ক্রেওল ভাষা ও ক্যারিবীয় পরিচয়’ এবং ‘কৃষ্ণাঙ্গদের বিষয়াবলি: কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যয়নের পরিচিতি’ পড়ানোর জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে তাঁর নতুন আরেকটি পাঠ্যক্রমও অনুমোদন পায়নি। গত গ্রীষ্মে নিজের বই আমাদের নিজস্ব ভাষা: শিক্ষা ও মুক্তির জন্য ক্রেওল এবং অন্যান্য মাতৃভাষার শক্তিকে কাজে লাগানো অবলম্বনে পাঠ্যক্রমটির প্রস্তাব দেন তিনি। বিভাগ বইটির কপি চাইলেও দেগ্রাফ তা দিতে অস্বীকৃতি জানান। তাঁর দাবি, জমা দেওয়া পাঠ্যক্রমের রূপরেখাই যথেষ্ট এবং বই পর্যালোচনার দাবি তাঁর প্রতি ‘চলমান বৈষম্য ও হয়রানির’ অংশ।
এভাবেই একটি পাঠ্যক্রমের অনুমোদন নিয়ে শুরু হওয়া বিরোধ এখন এমআইটির একাডেমিক স্বাধীনতা, রাজনৈতিক মতপ্রকাশ এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণের সীমা এই তিন প্রশ্নকে ঘিরে দীর্ঘ এক সংঘাতে পরিণত হয়েছে।
The post উপনিবেশবাদ এবং ফিলিস্তিন দখলের ইতিহাস নিয়ে কোর্স চালুর প্রস্তাব দেওয়ার পর অধ্যাপককে আর ক্লাস নিতে দিচ্ছে না এমআইটি appeared first on Mohona Tv.
