পবিত্র মক্কায় যাওয়ার স্বপ্ন বুকে নিয়ে কত মানুষের জীবন কেটে যায়, আর সেখানে পৌঁছে পবিত্র কাবার সামনে দাঁড়াতেই আবেগে ভিজে ওঠে চোখ। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আসা লাখো ধর্মপ্রাণ মুসলমানের কেউ সেখানে দুহাত তুলে ক্ষমা চান, কেউ প্রিয়জনের জন্য দোয়া করেন, কেউ বুকের ভেতর জমিয়ে রাখা দুঃখের কথা সৃষ্টিকর্তার কাছে নিবেদন করেন। তাঁদের কাছে মক্কা ইবাদত, সংযম ও আত্মশুদ্ধির স্থান।
সেই পবিত্র মক্কার একটি মসজিদে ‘অনৈতিক কর্মকাণ্ডের’ দায়ে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার খবর প্রকাশের পর শুরু হয় তুমুল আলোচনা। কিন্তু ঘটনার তথ্য জানার আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্নজন নিজেদের মতো করে কাহিনি ছড়াতে থাকেন। কেউ তাঁদের নবদম্পতি বানিয়ে হানিমুনের গল্প লিখেছেন। কেউ বলেছেন, স্বামী স্ত্রীর কপালে চুমু দেওয়ায় এই শাস্তি হয়েছে। আদালতে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ শব্দের ভুল অর্থ বোঝা থেকে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত নানা নাটকীয় বর্ণনাও যোগ হয়েছে। এসবের পাশাপাশি ছড়িয়েছে পুরোনো মৃত্যুদণ্ডের ভিডিও এবং অন্য মানুষের মরদেহের ছবি। এই প্রতিবেদনে সরকারি ঘোষণা, বাংলাদেশ মিশনের চিঠি, সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধান এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রকাশিত বক্তব্য মিলিয়ে ঘটনাটির বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হলো।
গত ১৪ অক্টোবর সৌদি আরবের মক্কা অঞ্চলে নজরুল ইসলাম ও সুইটি আখতার নামে দুইজন বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মক্কা নগরীর একটি মসজিদের ভেতরে ‘অনৈতিক কর্মকাণ্ডের’ দায়ে তাঁরা আদালতে দোষী সাব্যস্ত হন। রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সৌদি প্রেস এজেন্সি বা এসপিএ এই ঘোষণা প্রকাশ করে।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুজনকে নিয়ে প্রথম বড় বিভ্রান্তি তৈরি হয় তাঁদের সম্পর্ক ও সৌদি যাওয়ার উদ্দেশ্য সম্পর্কে। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নজরুল কাজের উদ্দেশ্যে সৌদি যাওয়ার জন্য ২০২২ সালের অক্টোবরে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর ছাড়পত্র নেন। সুইটি ছাড়পত্র নেন পরের বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি। তাঁরা আলাদাভাবে কাজের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবে যান। দুই পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁরা পরস্পরের স্বামী-স্ত্রী ছিলেন না।
নজরুলের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সুলতানপুর ইউনিয়নের বিরামপুর গ্রামে। বাবা আব্দুল বাছির ও মা রহিমা বেগমের চার সন্তানের মধ্যে তিনি বড়। পরিবার জানিয়েছে, আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ছয় লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর তাঁকে সৌদি পাঠানো হয়। প্রথম সাত-আট মাসে তিনি প্রায় দেড় লাখ টাকা বাড়িতে পাঠান। মক্কার হারাম শরিফে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সুইটিকে নজরুলের স্ত্রী বলা হলে তাঁর বাবা তা অস্বীকার করেন। আব্দুল বাছির বলেন, “সে বিয়ে করল কখন? ওই মেয়ে নজরুলের স্ত্রী নয়, তাকে আমরা চিনিও না।” পরিবারের এই বক্তব্য থেকেও স্পষ্ট হয়, হানিমুনে যাওয়া নবদম্পতি হিসেবে তাঁদের নিয়ে প্রচারিত গল্পটির কোনো ভিত্তি নেই।
সুইটির বাড়ি টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার মহেড়া ইউনিয়নের নগর ছাওয়ালী গ্রামে। বাংলা ট্রিবিউন সূত্রে জানা যায়, দিনমজুর ফজল মিয়ার পাঁচ মেয়ের মধ্যে তিনি ছোট। আগে দুটি বিয়ে হলেও কোনোটিই টেকেনি। পরে পরিবারের আর্থিক সংকট কাটাতে সৌদি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। দেড় লাখ টাকা ঋণ করে ২০২৩ সালে তাঁকে পাঠানো হয়। সেখানে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ করে কয়েক মাসে মোট ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা বাড়িতে পাঠিয়েছিলেন বলে পরিবার জানিয়েছে।
এরপরের ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে সংবাদমাধ্যমে কয়েকটি পৃথক বর্ণনা এসেছে। সবচেয়ে বিস্তারিত একটি বর্ণনা প্রকাশ করেছে ঢাকা টাইমস। সংবাদমাধ্যমটি মোক্তার আহমেদ নামে একজনের একটি ফেসবুক পোস্ট উদ্ধৃত করেছে। ওই পোস্টে তায়েফের হাওয়ায়া দাওয়াহ সেন্টারের আব্দুর রাকিব মাদানির নামে ঘটনার একটি বর্ণনা তুলে ধরা হয়। ওই বর্ণনায় দাবি করা হয়, নজরুল ও সুইটি মসজিদুল হারামে পরিচ্ছন্নতাকর্মী ছিলেন। কর্মস্থলে তাঁদের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। নারীর আবাসন ছিল বাতহা কুরাইশ এবং পুরুষের হাইয়্যাল ইসকান এলাকায়।
ওই পোস্টের দাবি অনুযায়ী, তাঁরা প্রায়ই কর্মস্থলের একটি নির্জন স্থানে মিলিত হতেন। স্থানটি ছিল মসজিদুল হারামের ৮৫ থেকে ৮৭ নম্বর গেটের মধ্যবর্তী সিঁড়ির ওপরের একটি কক্ষ। নজরুল সুইটিকে নিয়ে সেখানে দেখা করতে যাওয়ার সময় এক ভারতীয় বন্ধুকে নিচে পাহারায় রাখেন। সেই ব্যক্তিই গোপনে তাঁদের ভিডিও ধারণ করেন বলে পোস্টটিতে দাবি করা হয়েছে। পরে তিনি সুইটিকে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের প্রস্তাব দেন এবং প্রত্যাখ্যাত হয়ে ভিডিওটি ছড়িয়ে দেন বলেও দাবি করা হয়। ঢাকা টাইমসের প্রতিবেদনে উদ্ধৃত ওই পোস্টে ভিডিও ধারণকারী ব্যক্তির ২০ বছরের কারাদণ্ড হওয়ার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে, বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, ভিডিওটি ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় আরও অন্তত ২০ জনকে সাইবার অপরাধের মামলায় সাজা দেওয়া হয়।
দ্য ডেইলি স্টারের হাতে আসা জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেটের চিঠিতে বন্দিতালিকার ভিত্তিতে তাঁদের আটকের তারিখ ও নথিভুক্ত অভিযোগের বিবরণ পাওয়া যায়। ১৮ অক্টোবর প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠিতে দুজনকে আল মাজাল কোম্পানির পরিচ্ছন্নতাকর্মী বলা হয়েছে। ৩০ সেপ্টেম্বর পাওয়া বন্দিতালিকায় নজরুলের আটকের তারিখ ২০২৩ সালের ১ আগস্ট এবং সুইটির ২ আগস্ট উল্লেখ ছিল। নজরুলের বিরুদ্ধে সাইবার অপরাধ এবং সুইটির বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অভিযোগ নথিভুক্ত ছিল। তাঁদের যথাক্রমে জেদ্দা সংশোধনাগার ও জেদ্দা মহিলা কারাগারে রাখা হয়।
সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত বিচারিক বিবরণে বলা হয়েছে, গ্রেপ্তারের পর তদন্তে তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয় এবং সংশ্লিষ্ট আদালতে পাঠানো হয়। আদালত অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে সিদ্ধান্ত দেন। অপরাধের গুরুতরতা এবং সময় ও স্থানের পবিত্রতা লঙ্ঘনের বিষয় বিবেচনায় ‘তাআজির’ হিসেবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট বিচারিক কর্তৃপক্ষের অনুমোদনে রায় চূড়ান্ত হওয়ার পর রাজকীয় আদেশ জারি করা হয় এবং ১৪ অক্টোবর তা কার্যকর করা হয়।
ঘটনাটি নিয়ে আরও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে বিভিন্ন ভিডিওকে এক করে দেখার কারণে। তথ্যযাচাইয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য দাবি করে প্রচারিত একটি ভিডিওকে ২০১৫ সালের ভিন্ন ঘটনার বলে শনাক্ত করা হয়। তাঁদের মরদেহ দেশে এসেছে দাবি করে অন্য প্রবাসীর কফিনের ভিডিওও ছড়ানো হয়। এমনকি রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের প্রবাসী মুরাদ শেখের মরদেহ দেশে ফেরার ছবিকেও এই ঘটনার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
হাজরে আসওয়াদের কাছে এক নারী-পুরুষের আরেকটি ভিডিও রিলও এই মামলার সঙ্গে যুক্ত করে প্রচার করা হয়। পবিত্র দুই মসজিদবিষয়ক সংবাদমাধ্যম ‘দ্য হলি মস্কস’ সেই দাবিকে বিভ্রান্তিকর বলেছে।
বাংলাদেশ মিশনের ভূমিকা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠেছে। কনস্যুলেটের বক্তব্য অনুযায়ী, বন্দিতালিকায় তাঁদের নাম থাকলেও মৃত্যুদণ্ডের তথ্য ছিল না। মিশন জানিয়েছে, দুই পরিবারের পক্ষ থেকে তাদের কাছে আইনি সহায়তার আবেদন করা হয়নি। সৌদি কর্তৃপক্ষও মৃত্যুদণ্ডের রায় বা তা কার্যকরের বিষয়টি মিশনকে আগাম জানায়নি।
কিন্তু দীর্ঘদিন বন্দি থাকা নাগরিকের মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে মিশনের খবর রাখা উচিত ছিল কি না, সেই প্রশ্নও রয়েছে। সাবেক রাষ্ট্রদূত গোলাম মসীহ দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া অজানা থাকার বিষয়টি নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। রামরুর তাসনীম সিদ্দিকীও বন্দি নাগরিকদের বিষয়ে আরও সক্রিয়ভাবে খোঁজ রাখার দায়িত্বের কথা বলেছেন।
নজরুলের পরিবারের সঙ্গে তাঁর শেষ যোগাযোগ হয়েছিল ১১ অক্টোবর। কয়েক মিনিটের সেই কথোপকথনের পর ১৪ অক্টোবর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর আসে। সুইটির পরিবারও জানিয়েছে, তিনি কারাগার থেকে মাঝেমধ্যে ফোন করতেন। সর্বশেষ যোগাযোগের সময়ও দেশে ফেরার আশা করেছিলেন বলে স্বজনদের ভাষ্য।
মসজিদের পবিত্রতা রক্ষার দায়িত্বের সঙ্গে কোনো আপস চলে না। বিশেষ করে মক্কার মতো ধর্মীয় নগরীতে কাজ করতে বা ইবাদত করতে যাওয়া প্রত্যেকের আচরণে সেই দায়িত্ববোধ থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কোনো আপত্তিকর দৃশ্য হাতে পেলেই তা ছড়িয়ে দেওয়া জনসচেতনতার সমার্থক নয়।
এই ঘটনায় দণ্ড কার্যকরের সরকারি ঘোষণা রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে বিশ্বস্ত সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও বিভিন্ন সূত্রের বর্ণনা। এসব তথ্যের বদলে পবিত্র স্থানকে ঘিরে মনগড়া হানিমুনের গল্প ছড়িয়ে যাঁরা মানুষকে বিভ্রান্ত করেছেন, তাঁরা দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছেন। মানুষের বিশ্বাস ও ধর্মীয় অনুভূতিকে এমন কল্পকাহিনির উপকরণ করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। যাচাই করা তথ্য পাঠকের সামনে তুলে ধরা, মানুষের বিশ্বাসের প্রতি সম্মান রাখা এবং সত্যের প্রতি দায়বদ্ধ থাকাই সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব।
এনএন/ ২২ অক্টোবর ২০২৬
সম্পুর্ন খবরটি পড়ার জন্য এই লিঙ্কে ক্লিক করুন ::সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড ঘিরে বিভ্রান্তির গল্প first appeared on DesheBideshe.