Published on
:
2 min read
সুনন্দ ঘোষ ও দিগন্ত মান্না
ফ্লাইট ল্যান্ড করতেই হাততালি দিয়ে উঠলেন যাত্রীরা। পাইলটের জন্য নয়। এক যাত্রীর জন্য। আরজি কর পাসআউট ৬০ বছরের শিশু বিশেষজ্ঞ সেই যাত্রী, চিকিৎসক প্রবীর ভৌমিক রাতারাতি ‘হিরো’ হয়ে গিয়েছেন। হবেন নাই বা কেন?
ফ্লাইট তখন প্রায় ৪০ হাজার ফুটে। প্যারিস থেকে এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইট সবে দেড় ঘণ্টা উড়েছে। ২০ ই আসনে বসে ঝিমোচ্ছিলেন প্রবীর। প্রথম ঘোষণা তাই খেয়াল করেননি। রিপিট ঘোষণায় এয়ারহস্টেসের গলায় উদ্বেগ ছিল স্পষ্ট, ‘ফ্লাইটে কোনও ডক্টর আছেন? থাকলে প্লিজ় পিছনের গ্যালি (যেখান থেকে এয়ারহস্টেসরা খাবার পরিবেশন করেন)–তে যোগাযোগ করুন।’
প্রবীর সেখানে পৌঁছে দেখেন গ্যালির মেঝেতে বড়সড় চেহারার মাঝবয়সী এক ব্যক্তি শুয়ে। জ্ঞান নেই। অক্সিজেন দিয়ে, মাথায় জল দিয়ে এয়ারহস্টেসরা আপ্রাণ তাঁর জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা করছেন। তার পরে শুরু হয় প্রবীরের লড়াই। তিন ঘণ্টা ধরে পাঁচ–দশ মিনিট অন্তর সিপিআর (কার্ডিয়ো–পালমোনারি রিসাসিটেশন, যার সাহায্যে বুকে পাম্প করে হৃদযন্ত্র ও শ্বাসযন্ত্র সচল রাখার চেষ্টা করা হয়) দিয়ে কার্যত প্রাণ বাঁচিয়েছেন পাঞ্জাবের জলন্ধরের ওই ব্যক্তির। পাইলট বার বার ককপিট থেকে ফোন করে জানতে চেয়েছেন, প্রেশার কত, স্যাচুরেশন কত, ফ্লাইট ডাইভার্ট করতে হবে কি না। আর প্রবীর বার বার আশ্বাস দিয়ে গিয়েছেন, সিচুয়েশন একটু একটু বেটার হচ্ছে। তিন ঘণ্টা পরে সত্যিই পরিস্থিতি একটু ভালো হলে ড্রিমলাইনারের পিছনের সিট খালি করে শুইয়ে দেওয়া হয় ওই যাত্রীকে। ফ্লাইটের বাকি সময়টা তাঁর পায়ের কাছে বসে মনিটর করতে করতে দিল্লি ফিরেছেন প্রবীর। ফ্লাইটকে আর ডাইভার্ট করতে হয়নি।
এ দৃশ্য নজরে এসেছে যাত্রীদের। তাই, ফ্লাইট দিল্লিতে ল্যান্ড করার পরে অভিবাদনের বন্যা বয়ে গিয়েছে। পূর্ব মেদিনীপুরের কোলাঘাটের একটি নার্সিংহোমের মালিক প্রবীরের কথায়, ‘জলন্ধরের ওই যাত্রীর জন্য দিল্লিতে এয়ার–অ্যাম্বুল্যান্স রাখা ছিল। আচমকাই হার্ট অ্যাটাক করেছিল তাঁর। আমার যা করণীয় তাই করেছি। তবে, শিশুদের সিপিআর দিতে অভ্যস্ত আমি। এক জন পূর্ণবয়স্ক, ওই রকম বড়সড় চেহারার মানুষকে অতক্ষণ ধরে সিপিআর দিতে গেলে যে কায়িক পরিশ্রম হয়, তাতে অভ্যস্ত নই।’ বৃহস্পতিবার দিল্লি থেকে নেমে কলকাতার কানেক্টিং ফ্লাইট ধরার সময়েও অনেক সহযাত্রী তাঁর সঙ্গে এসে হ্যান্ডশেক করেছেন। তাঁরাও প্যারিসের ওই ফ্লাইটে ছিলেন। প্রবীর চিকিৎসার পাশাপাশি সিনেমা প্রযোজনার কাজও করেন। তাঁর প্রযোজিত বাংলা সিনেমা ‘পাগলা ঘোড়া’ এ বার প্যারিস ফিল্ম ফেস্টিভালে দেখানো হয়েছে। সেই কারণে ডিরেক্টর শেখর দাসের সঙ্গে প্যারিস গিয়েছিলেন তিনি। বুধবার স্থানীয় সময় রাত পৌনে ন’টায় দু’জনে ফিরতি ফ্লাইট ধরেন।
শুক্রবার কোলাঘাট থেকে ফোনে প্রবীর বলছিলেন, ‘আমি যখন বিমানের গ্যালিতে পৌঁছই, দেখি ওই যাত্রীর পালস খুব লো। স্যাচুরেশন ৮০–রও কম। তখনই সিপিআর দিতে শুরু করি। একটু পরে স্যাচুরেশন একটু বেটার হতে অক্সিজেনও দেওয়া হয়। তবে ফ্লাইটে যে মাস্ক ছিল, তা দেখে ভয় লেগেছে। খুবই নিম্নমানের।’ বেশ কিছুক্ষণ একটানা সিপিআর দেওয়ার পরে তা একটু সময়ের জন্য বন্ধ করতেই ওই যাত্রীর স্যাচুরেশন আবার ড্রপ করছিল বলে জানিয়েছেন প্রবীর। তাই, নির্দিষ্ট সময় অন্তর সিপিআর দিয়ে যেতে হচ্ছিল। সরবিট্রেটের মতো ওষুধ অবশ্য ছিল। জ্ঞান ফেরার পরে অ্যাসপিরিনও দিতে হয়েছে।
প্রবীরের কথায়, ‘পাইলট খুব টেনশন করছিলেন। এয়ারহস্টেসদের মাধ্যমে বার বার জানতে চাইছিলেন, ফ্লাইট ডাইভার্ট করতে হবে কি না। সেরকম ইমার্জেন্সি হলে করতে হতো। কিন্তু, সিচুয়েশন ম্যানেজ করা গিয়েছে।’ বিমান পরিবহণের বিশেষজ্ঞদের কথায়, ‘সে অর্থে এয়ারলাইন্সের লোকসানও অনেকটা বাঁচিয়ে দিয়েছেন ডাক্তার। কারণ, বিদেশে কোথাও ফ্লাইট ডাইভার্ট করলে প্রভূত ক্ষতি হয় এয়ারলাইন্সের।’
