বেসরকারি বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ধীরগতিতে ব্যাংকগুলোতে অতিরিক্ত তারল্যের পাহাড় জমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, গত আগস্ট শেষে ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা। জুনের তুলনায় মাত্র দুই মাসে তা বেড়েছে প্রায় সাড়ে ২৭ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ ব্যাংকে অর্থের জোগান থাকলেও বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সেই অর্থের পুরোপুরি প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। কারণ, ব্যাংকগুলোর মোট তরল সম্পদের প্রায় ৮২ শতাংশই রয়েছে অনুমোদিত সিকিউরিটিজে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত
তারল্য বাড়লেও সেই অর্থ কাজে লাগানোর মতো বিনিয়োগের চাহিদা তৈরি হচ্ছে না। এর পেছনে মূলত চাহিদার ঘাটতি ও বিনিয়োগ পরিবেশের অনিশ্চয়তা কাজ করছে। একদিকে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, বৈশ্বিক অস্থিরতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, চাঁদাবাজি ও নীতির সমন্বয়হীনতার কারণে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে সতর্ক রয়েছেন। অন্যদিকে, বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণের চাপ সামলাতে ব্যাংকগুলোও নতুন ঋণ বিতরণে ঝুঁকি নিতে চাইছে না। ফলে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কম থাকায় ব্যাংকগুলো আমানতের অর্থ আয়যোগ্য সম্পদে পরিণত করতে সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। তাই বিনিয়োগ উৎসাহিতে সুদের হার কমানোর পাশাপাশি বিনিয়োগের নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ ও নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাও জরুরি। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর আর্থিক দুর্বলতা দূর করা, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং ঋণের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজম্যান্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক ড. এজাজুল ইসলাম আমাদের সময়কে বলেন, ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য বাড়ার অন্যতম কারণ হলো বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কম থাকা। ব্যাংকগুলো আমানত সংগ্রহ করছে, কিন্তু সেই তুলনায় বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কম। ফলে ব্যাংকের হাতে থাকা অর্থ আয়যোগ্য সম্পদে রূপান্তর করতে তারা সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করছে। তিনি বলেন, সরকারি সিকিউরিটিজে ব্যাংকের বিনিয়োগ বাড়ার অর্থ এই নয় যে, এ কারণে বেসরকারি খাতে ঋণ দেওয়া হচ্ছে না, বরং বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদাই কম। উদ্যোক্তারা ঋণ চাইলে ব্যাংকগুলোর ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে। বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কম থাকার কারণ ব্যাখ্যা করে ড. এজাজুল ইসলাম বলেন, বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশের অভাব এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা, বৈশ্বিক পরিস্থিতি, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং যুদ্ধের প্রভাব ব্যবসা-বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যমান কারখানাগুলোই উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। ফলে নতুন বিনিয়োগ ও ঋণের চাহিদা বাড়ছে না।
দুই মাসে উদ্বৃত্ত তারল্য বেড়েছে সাড়ে ২৭ হাজার কোটি টাকা : নিয়মানুযায়ী, দেশের ব্যাংকগুলোকে নগদ জমার হার (সিআরআর) এবং সহজে বিনিময়যোগ্য সম্পদ (এসএলআর) নামে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ সংরক্ষণ করতে হয়। এ দুই উপায়ে রাখা অর্থ ব্যাংকের তারল্য সম্পদ হিসেবে গণ্য। বর্তমানে ব্যাংকগুলোকে মোট আমানতের ৪ শতাংশ সিআরআর এবং ১৩ শতাংশ এসএলআর আকারে জমা রাখতে হয়। এর অতিরিক্ত অর্থই উদ্বৃত্ত তারল্যের অংশ। এই অর্থের একটি বড় অংশ সরকারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করা থাকে, যা প্রয়োজন হলে নগদায়ন করা সম্ভব। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, জুন শেষে ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য ছিল প্রায় ৪ লাখ ১৪ হাজার ৫৩৭ কোটি টাকা। আগস্ট শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪ লাখ ৪১ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকা। ফলে দুই মাসে উদ্বৃত্ত তারল্য বেড়েছে প্রায় ২৭ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা।
কোন ব্যাংকে কত উদ্বৃত্ত তারল্য : ব্যাংক গ্রুপভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি উদ্বৃত্ত তারল্য রয়েছে বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে (শরিয়াহ ব্যাংক বাদে)। জুন শেষে এ গোষ্ঠীর ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত তারল্য ছিল প্রায় ২ লাখ ৩৭ হাজার ৫৫৮ কোটি টাকা। আগস্ট শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৭১ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা। অর্থাৎ দুই মাসে এ গোষ্ঠীর উদ্বৃত্ত তারল্য বেড়েছে ৩৪ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা। রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত তারল্য জুনের প্রায় ১ লাখ ৩৬ হাজার ৭১১ কোটি টাকা থেকে বেড়ে আগস্টে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪০ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা। ফলে দুই মাসে বেড়েছে ৪ হাজার ১২৪ কোটি টাকা। বিদেশি ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত জুনের প্রায় ২৬ হাজার ৩১২ কোটি টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ২৬ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা। অর্থাৎ বেড়েছে ৪২৮ কোটি টাকা। অন্যদিকে ইসলামী ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত তারল্য জুনের প্রায় ১৪ হাজার ৩০ কোটি টাকা থেকে কমে আগস্টে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২৮৩ কোটি টাকা। দুই মাসে এ গোষ্ঠীর ব্যাংকের উদ্বৃত্ত কমেছে প্রায় ১১ হাজার ৭৪৭ কোটি টাকা। বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে জুনে ন্যূনতম প্রয়োজনীয় তরল সম্পদের তুলনায় ঘাটতি ছিল প্রায় ৭৪ কোটি টাকা। আগস্টে তা ৪০৪ কোটি টাকা উদ্বৃত্তে পরিণত হয়েছে। তবে বিশেষায়িত ব্যাংকগুলো এসএলআর সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতিপ্রাপ্ত।
তরল সম্পদের ৮২ শতাংশই সরকারি সিকিউরিটিজে : জুন শেষে তফসিলি ব্যাংকগুলোর মোট তারল্য সম্পদ ছিল ৭ লাখ ৪১ হাজার ৫০২ কোটি টাকা। আগস্ট শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭ লাখ ৮১ হাজার ২১৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ দুই মাসে মোট তারল্য সম্পদ বেড়েছে ৩৯ হাজার ৭১২ কোটি টাকা। তবে ব্যাংকগুলোর হাতে থাকা তারল্য সম্পদের বড় অংশই রয়েছে অনুমোদিত সিকিউরিটিজে। জুন শেষে অনুমোদিত সিকিউরিটিজের পরিমাণ ছিল ৬ লাখ ৯২০ কোটি টাকা, যা মোট তারল্য সম্পদের প্রায় ৮১ শতাংশ। আগস্ট শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬ লাখ ৪০ হাজার ৭৫৬ কোটি টাকায়। এ সময় মোট তারল্য সম্পদের প্রায় ৮২ শতাংশই ছিল এসব সিকিউরিটিজে। জুন থেকে আগস্ট— এই দুই মাসে সিকিউরিটিজের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৩৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ একই সময়ে ব্যাংক খাতে মোট তারল্য সম্পদ যে পরিমাণ বেড়েছে, তার প্রায় পুরোটাই এসেছে সিকিউরিটিজের বৃদ্ধির মাধ্যমে।
ব্যাংকে বিপুল অর্থ থাকলেও বিনিয়োগের গতি এখনও ধীর : ব্যাংকে উদ্বৃত্ত তারল্য বাড়লেও বেসরকারি ঋণের গতি এখনও দুর্বল। সর্বশেষ আগস্টে বেসরকারি ঋণের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, বিনিয়োগের মন্থর চাহিদা, ঋণগ্রহীতাদের উচ্চ ঝুঁকি এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এর পেছনে ভূমিকা রেখেছে। জানতে চাইলে পলিসি থিঙ্ক অ্যান্ড রিসার্চের (পিটিআর) চেয়ারম্যান ও অর্থনীতি বিশ্লেষক মাজেদুল হক আমাদের সময়কে বলেন, বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে নেমে আসা বিনিয়োগে স্থবিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। অর্থাৎ গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার পর বিনিয়োগ বাড়ার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা এখনও পূরণ হয়নি। তিনি বলেন, একজন বিনিয়োগকারী অর্থ বিনিয়োগের আগে লাভের সম্ভাবনার পাশাপাশি বিনিয়োগের নিরাপত্তা ও ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ বিবেচনা করেন। বর্তমানে জ্বালানি সংকট, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, চাঁদাবাজি এবং নীতিনির্ধারণে সমন্বয়হীনতার কারণে বিনিয়োগকারীরা প্রত্যাশিত স্বস্তি পাচ্ছেন না। ফলে নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ কম থাকায় বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদাও বাড়ছে না। এ ছড়া বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষও নতুন ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ঝুঁকি নিতে চাইছে না। এ কারণে অনেক ব্যাংক বেসরকারি খাতে ঋণ দেওয়ার পরিবর্তে ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকছে। সুদের হার বিনিয়োগের ক্ষেত্রে একটি বাধা হলেও এটিই প্রধান সমস্যা নয় বলে মনে করেন মাজেদুল হক। তার মতে, উচ্চ নীতিসুদ ব্যবসার খরচ বাড়ায় এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য চাপ তৈরি করে। তবে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, জ্বালানি সংকট, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং নীতির সমন্বয়হীনতা বিনিয়োগের পথে আরও বড় বাধা। এসব ক্ষেত্রে অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা না গেলে বিনিয়োগে উল্লেখযোগ্য গতি ফেরানো কঠিন হবে।
