ডা. বিএম আতিকুজ্জামান
বর্ষা বা শীতের সময়ে অনেকেই বলেন, “প্রতি বছরই তো ঠান্ডা-জ্বর হয়, আবার টিকা কেন?” আবার কেউ টিকা নেওয়ার পর হাতব্যথা বা সামান্য জ্বরকে ফ্লু হওয়ার প্রমাণ মনে করেন। এ দুই ধারণাই ভুল হতে পারে। ইনফ্লুয়েঞ্জা বা ফ্লু শুধু নাক দিয়ে পানি পড়া নয়। এটি হঠাৎ জ্বর, শরীরব্যথা, কাশি, মাথাব্যথা, দুর্বলতা ও কাজকর্ম বন্ধ করে দেওয়ার মতো অসুস্থতা তৈরি করতে পারে। শিশু, বয়স্ক মানুষ, গর্ভবতী নারী এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে এটি নিউমোনিয়া, হাসপাতালে ভর্তি বা পুরোনো রোগের অবনতি ঘটাতে পারে। ফ্লু টিকা শতভাগ সংক্রমণ ঠেকাবে- এমন নিশ্চয়তা দেয় না। কিন্তু এটি গুরুতর অসুস্থতা ও জটিলতার ঝুঁকি কমানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।
ফ্লু আর সাধারণ সর্দির পার্থক্য: সাধারণ সর্দি ধীরে ধীরে শুরু হয়, নাক বন্ধ বা গলা খুসখুসে থাকাই প্রধান সমস্যা। ফ্লু অনেক সময় হঠাৎ আসে- সকালে ভালো থাকা মানুষ বিকেলে জ্বর, কাঁপুনি, তীব্র শরীরব্যথা ও অসহ্য দুর্বলতায় বিছানায় পড়ে যেতে পারেন। তবে শুধু লক্ষণ দেখে নিশ্চিত হওয়া কঠিন। কোভিড-১৯, জঝঠ এবং অন্যান্য শ্বাসতন্ত্রের ভাইরাসও কাছাকাছি উপসর্গ তৈরি করতে পারে। ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তি—বিশেষত বয়স্ক, গর্ভবতী, শিশু বা দীর্ঘস্থায়ী রোগী- জ্বর ও কাশি হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন। অ্যান্টিবায়োটিক ভাইরাসজনিত ফ্লু সারায় না; প্রয়োজন হলে চিকিৎসক ভাইরাসবিরোধী ওষুধ বিবেচনা করতে পারেন।
টিকা প্রতি বছর কেন লাগে: ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস সময়ের সঙ্গে বদলায়। সে জন্য প্রতি মৌসুমে টিকার উপাদান বদলে সম্ভাব্য চলমান ভাইরাসের সঙ্গে মিল রাখার চেষ্টা করা হয়। ২০২৬–২৭ মৌসুমে ব্যবহৃত ফ্লু টিকাগুলো তিন ধরনের ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের বিরুদ্ধে সুরক্ষার জন্য তৈরি। আরেকটি কারণ, টিকা নেওয়ার পর তৈরি হওয়া সুরক্ষা সময়ের সঙ্গে কমে যেতে পারে। তাই গত বছরের টিকা এ বছরের জন্য যথেষ্ট নয়।
কারা অগ্রাধিকার পাবেন: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মৌসুমি ফ্লু টিকায় বিশেষভাবে অগ্রাধিকার দিতে বলেছে গর্ভবতী নারী; ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সি মানুষ; হৃদরোগ, ফুসফুসের রোগ, ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ, লিভারের রোগ, স্নায়বিক রোগ বা রোগপ্রতিরোধক্ষমতা কমে গেছে- এমন ব্যক্তি; স্বাস্থ্যকর্মী; ছোট শিশু, দেশের জাতীয় কর্মসূচি ও টিকার প্রাপ্যতা অনুযায়ী; গর্ভাবস্থার যেকোনো পর্যায়ে নিষ্ক্রিয় ফ্লু টিকা নেওয়া যায়। এটি শুধু মাকেই নয়; জন্মের পর প্রথম কয়েক মাস- যখন শিশুর নিজের টিকা নেওয়ার বয়স হয়নি, তখর শিশুকেও কিছু সুরক্ষা দিতে সাহায্য করে। স্বাস্থ্যকর্মীর টিকা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তারা রোগীর সংস্পর্শে থাকেন এবং দুর্বল রোগীদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে দিতে পারেন।
কখন টিকা নেওয়া ভালো: উত্তর গোলার্ধে অধিকাংশ মানুষের জন্য সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর ফ্লু টিকা নেওয়ার সুবিধাজনক সময়। তবে দেরি হয়ে গেলেও মৌসুমে ভাইরাস ছড়াতে থাকলে টিকা নেওয়া অর্থবহ। টিকা কাজ করতে সাধারণত প্রায় দুই সপ্তাহ সময় লাগে। বাংলাদেশসহ উষ্ণ ও উষ্ণমণ্ডলীয় দেশগুলোতে ফ্লুর মৌসুম ও টিকা প্রদানের সময় অঞ্চলভেদে আলাদা হতে পারে। তাই স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ও চিকিৎসকের পরামর্শকে অগ্রাধিকার দিন। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান নির্দেশনায় ৬ মাস বা তার বেশি বয়সি সবার জন্য প্রতিবছর ফ্লু টিকা সুপারিশ করা হয়েছে, বিরল কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া।
শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে বিশেষ খেয়াল: ৬ মাসের কম বয়সি শিশুকে ফ্লু টিকা দেওয়া যায় না। তাই গর্ভবতী মা, বাবা, ভাইবোন এবং শিশুর কাছের পরিচর্যাকারীদের টিকা নেওয়া শিশুকে পরোক্ষভাবে সুরক্ষা দেয়। ৬ মাস থেকে ৮ বছর বয়সি কিছু শিশুর প্রথমবার টিকা নিতে দুই ডোজ লাগতে পারে; দুই ডোজের মধ্যে অন্তত চার সপ্তাহের ব্যবধান প্রয়োজন। শিশুর আগের টিকার ইতিহাস দেখে চিকিৎসক বা টিকাদানকর্মী সিদ্ধান্ত দেবেন। ৬৫ বছরের বেশি বয়সিদের রোগপ্রতিরোধ প্রতিক্রিয়া তুলনামূলক দুর্বল হতে পারে। তাই কিছু দেশে তাদের জন্য উচ্চমাত্রা, সহায়ক উপাদানযুক্ত বা রিকম্বিন্যান্ট টিকাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। তবে উপযুক্ত বিশেষ টিকার অপেক্ষায় থেকে টিকা বিলম্ব করা ঠিক নয়; যা বয়সোপযোগী ও সহজলভ্য, তা নেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।
টিকার পাশাপাশি কী করবেন: ফ্লু প্রতিরোধ শুধু একটি ইনজেকশনে সীমাবদ্ধ নয়। কাশি বা জ্বর হলে ঘরে থাকা, কাশির সময় মুখ ঢেকে রাখা, হাত ধোয়া, ঘরের বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করা এবং অসুস্থ অবস্থায় বয়স্ক বা দুর্বল মানুষ থেকে দূরে থাকা জরুরি। শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা, ঠোঁট নীলচে হওয়া, বিভ্রান্তি, শিশুর পানি না খাওয়া বা প্রস্রাব কমে যাওয়া, অথবা জ্বর-কাশি ভালো হয়ে আবার খারাপ হওয়া- এসব হলে দ্রুত চিকিৎসা দরকার।
লেখক: আমেরিকায় বসবাসরত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক
কেএমএএ/আপ্র/১৯.১০.২০২৬
