চিত্রশিল্পী ভিনসেন্ট ভ্যান গখের আঁকা ‘দ্য স্টারি নাইট’ নিয়ে নতুন এক তথ্য প্রকাশ করেছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। তাঁদেরদীর্ঘ গবেষণা বলছে, এই চিত্রকর্মে ফুটিয়ে তোলা তারাগুলি আসলে প্রচলিত ধারণার মতো মেষ রাশির নয়, বরং এগুলি বৃষ নক্ষত্রমণ্ডলের হায়াডিস তারাগুচ্ছের অংশ। এই আবিষ্কারের ফলে চিত্রকর্মটি তৈরির সময়কাল নিয়ে নতুন করে চর্চা শুরু হয়েছে। বর্তমানে নিউ ইয়র্কের ‘মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্টে’ সংরক্ষিত রয়েছে বিশ্বখ্যাতএই চিত্রকর্মটি।
বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী ‘সায়েন্টিফিক রিপোর্টস’-এ প্রকাশিত এক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ১৮৮৯ সালের জুলাই মাসের শেষের দিকে আকাশের গায়ে হায়াডিস তারাগুচ্ছের যে নির্দিষ্ট বিন্যাস ছিল, তার সঙ্গে ছবির তারার অবস্থানের অদ্ভুত মিল রয়েছে। এতদিন শিল্প সমালোচকরা মনে করতেন, ফ্রান্সের স্যাঁ-রেমি-দ্য-প্রোভঁসে থাকাকালীন ওই বছরের জুনের মাঝামাঝি কোনও এক সময়ে এই ছবিটি এঁকেছিলেন ভ্যান গখ। কোরীয় এই গবেষণা দলের প্রধান ও মহাকাশ গবেষক এলিয়া জিয়ং-হিউন কিমের মতে, ক্যানভাসের ঠিক মধ্যভাগের তারাগুচ্ছটি প্রথম দেখাতেই তাঁর কাছে বৃষ রাশির হায়াডিস বলে মনে হয়েছিল। বিষয়টি তাঁকে আরও গভীর ভাবে অনুসন্ধান করতে উদ্বুদ্ধ করে। তারার সঠিক বিন্যাস শনাক্ত করতে গবেষক দল ‘প্রোক্রাস্টিস’ নামের একটি বিশেষ সফ্টওয়্যার ব্যবহার করেন। যেখানে তারার আকার বা রঙের চেয়ে মূলত একে অপরের সাপেক্ষে তাদের পারস্পরিক অবস্থান ও বিন্যাসকে গুরুত্ব দেওয়াহয়। এই প্রযুক্তির সহায়তায় ছবির পাঁচটি তারার সঙ্গে হায়াডিসের পাঁচটি তারার নিখুঁত সাদৃশ্য খুঁজেপাওয়া যায়।
গবেষকরা তাদের এই পদ্ধতির নির্ভরযোগ্যতা যাচাই করতে ভ্যান গখের আর এক চিত্রকর্ম ‘স্টারি নাইট ওভার দ্য রোন’-এ ফুটিয়ে তোলা সপ্তর্ষিমণ্ডলের তারার বিন্যাস নিয়েও পরীক্ষাচালান। সেখানেও বাস্তব আকাশের সঙ্গে ক্যানভাসের সুনির্দিষ্ট মিল দেখতে পান তারা। পাশাপাশি, শিল্পীর ব্যক্তিগত চিঠিপত্র এবং সে সময়কার চাঁদের অবস্থানও গবেষণায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ১৮৮৯ সালের জুন মাসে লেখা এক চিঠিতে শিল্পী তারা ভরা আকাশ নিয়ে নতুন ছবি আঁকার কথা জানালেও গবেষকদের ধারণা, ক্যানভাসটি একাধিক ধাপে সম্পন্ন হয়ে থাকতে পারে এবং জুলাইয়ের শেষের দিকের চাঁদের ক্ষয়িষ্ণু রূপটির সঙ্গে ছবির মিলবেশি রয়েছে।
এ দিকে নতুন এই গবেষণার ফলাফল নিয়ে কিছুটা দ্বিমতও প্রকাশ করেছেন ‘টেক্সাস স্টেট ইউনিভার্সিটি’র পদার্থবিদ্যা ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইমেরিটাস অধ্যাপক ডন ওলসন। তাঁর মতে, হায়াডিসের অবস্থানের সঙ্গে উজ্জ্বল শুক্র গ্রহের সংযোগটি ছবির বিন্যাসের সঙ্গে পুরোপুরি খাপ খায় না, তাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে আরও জোরালো প্রমাণের প্রয়োজন রয়েছে। তা সত্ত্বেও গবেষকরা মনে করছেন, শিল্পকর্মটির ইতিহাস নতুন করে পর্যালোচনা করার মতো পর্যাপ্ত ও গ্রহণযোগ্যভিত্তি তৈরি হয়েছে। কিম বলেন, “দ্য স্টারি নাইট আমার মতো এক জন জ্যোতির্বিজ্ঞানীর সঙ্গে কথা বলেছে। আমি সেই আহ্বানেসাড়া দিয়েছি।”
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
