সপ্তাহখানেক আগে ফ্রান্সে গণবিক্ষোভ ঘিরে সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম ভয়াবহ নগর সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার পর, শনিবার হতে যাওয়া নতুন বিক্ষোভ দমনে দেশজুড়ে ৭০ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হচ্ছে। আজ শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) এ তথ্য জানিয়েছে দেশটির সরকার। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।
চলমান এই অভ্যন্তরীণ সংকটের কারণে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এ মাসের শেষদিকে নাইজেরিয়া ও সেনেগালে তার প্রস্তাবিত সফর স্থগিত করছেন বলে সহযোগীরা জানিয়েছেন। তিনি জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে তার প্রতিরক্ষা কাউন্সিলের এক বিশেষ বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। এছাড়া নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গেও বৈঠকে বসার কথা রয়েছে তার।
প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ প্রথমবারের মতো হাইস্কুলের শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন। ক্লাসরুমের নাজুক পরিবেশ নিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ থেকে এই আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল। পরবর্তীতে সেই আন্দোলন জীবনযাত্রার অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধির বিরুদ্ধে সরকারের ওপর দেশব্যাপী এক ক্ষোভের বিস্ফোরণে রূপ নেয়।
প্যারিসে এক সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনোজ জানান, শনিবার প্রায় ৭০ হাজার নিরাপত্তা কর্মী মাঠে মোতায়েন থাকবেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সহিংসতা ও লুটপাটের ডাক ছড়িয়ে পড়ছে বলেও তিনি সতর্ক করে দেন।
প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁর উত্তরসূরি নির্বাচনের আর মাত্র ছয় মাস বাকি থাকা অবস্থায় ফ্রান্সের জন্য অত্যন্ত সংকটময় মুহূর্তে এই আন্দোলন দেখা দিল। একটি নতুন জনমত সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, উগ্র ডানপন্থী পদপ্রার্থী মেরি লি পেইন নির্বাচনে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন এবং সাম্প্রতিক এই ঘটনাগুলোর কারণে তার রাজনৈতিক অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে।
উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে লি পেইন চলতি সপ্তাহান্তে ওরলিয়েন্স শহরে তার দল 'ন্যাশনাল র্যালি'-এর কংগ্রেস আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সেখানে হাজার হাজার সমর্থকের সমাগম ঘটবে বলে আশা করা হচ্ছে, তবে বিরোধীরাও শহরটির দিকে রওনা দেওয়ায় বড় ধরনের সংঘর্ষের আশঙ্কা করছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অনুরোধে নুনোজ শুক্রবার ওরলিয়েন্স শহর পরিদর্শনে যাবেন এবং সেখানকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যালোচনা করবেন বলে জানা গেছে।
শিক্ষার্থীদের সাথে ম্যাক্রোঁর বৈঠকের বিষয়ে 'রেনুভো লিসিও' (হাই স্কুল রিন্যুয়াল)-এর প্রেসিডেন্ট নাথানিয়েল কমবারি বলেন, ‘আমরা তার কাছে আমাদের দাবিগুলো পেশ করব—যা আগের মতোই অপরিবর্তিত রয়েছে- স্কুলের জরাজীর্ণ অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পদ্ধতির আমূল সংস্কার।’
ম্যাক্রোঁর সরকার আন্দোলনকারীদের যৌক্তিক দাবির সাথে গত শনিবারের বিক্ষোভের আড়ালে হওয়া লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের মধ্যে একটি স্পষ্ট পার্থক্যের রেখা টানার চেষ্টা করছে।
বিচারমন্ত্রী জেরাল্ড দারমানিন জানিয়েছেন, বিচার ব্যবস্থার নজিরবিহীন কঠোর পদক্ষেপে গত শনিবারের ঘটনায় জড়িত ২১৭ জনকে আদালত ইতোমধ্যে কারাগারে পাঠিয়েছে, যাদের মধ্যে অর্ধেকই ছিলেন প্রথমবারের মতো অপরাধী।
বৃহস্পতিবার প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ কঠোরতার আহ্বান জানান এবং অভিযোগ করেন যে, উগ্র-বামপন্থি গোষ্ঠীগুলো গত সপ্তাহান্তে প্রজাতন্ত্রের পতন ঘটানোর চেষ্টা করেছিল।
‘পুলিশের দায়িত্ব রয়েছে’
শনিবার ফ্রান্সজুড়ে দ্বিতীয় দফার বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের লিঁও শহরের কেন্দ্রস্থলে এ সপ্তাহে আন্দোলনকারীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকবে, আর প্যারিসে আন্দোলনকারীদের কেবল বাস্তিল এবং নেশন স্কয়ারের মধ্যবর্তী একটি নির্দিষ্ট পথ ধরে পদযাত্রা করার অনুমতি দেওয়া হবে।
মার্সেই শহরের কর্তৃপক্ষও বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করেছিল, তবে শুক্রবার তারা ঘোষণা করে যে, কেবল একটি ট্রেড ইউনিয়ন আয়োজিত সমাবেশকে ব্যতিক্রম হিসেবে অনুমতি দেওয়া হবে—যা দক্ষিণাঞ্চলীয় বুশ-দু-রোন বিভাগের জন্য একমাত্র অনুমোদিত বিক্ষোভ।
শহরে শনিবার সব ধরনের গণপরিবহন বন্ধ রাখার যে সিদ্ধান্ত আগে নেওয়া হয়েছিল, তা-ও প্রত্যাহার করেছে কর্তৃপক্ষ। তবে রাজধানীতে শনিবার ল্যুভর সহ অন্যান্য প্রধান জাদুঘরগুলো বন্ধ থাকবে এবং 'আর্ট বাসেল' আন্তর্জাতিক শিল্প মেলা নির্ধারিত সময়ের আগেই শেষ করা হচ্ছে।
গত সপ্তাহে পুলিশের দূরদর্শিতা ও গোয়েন্দা তথ্যের ঘাটতি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার পর, এই সপ্তাহান্তে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য সংখ্যা প্রায় ২০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে।
বিক্ষোভের সময় শিশুদের গুরুতর আহত হওয়ার খবরে উদ্বেগ প্রকাশ করে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর জ্যেষ্ঠ ইউরোপ গবেষক ইভা কোসে বলেন, ‘আইনের শাসনে পরিচালিত একটি দেশে পুলিশের দায়িত্ব কেবল বিক্ষোভ যেন শান্তিপূর্ণভাবে ও নিরাপদে হতে পারে তা নিশ্চিত করা নয়, বরং উগ্র বিশৃঙ্খলা থেকে জনগণকে রক্ষা করাও তাঁদের দায়িত্ব।’
সংশ্লিষ্ট সংবাদ: ফ্রান্স
২১ অক্টোবর ২০২৬
২০ অক্টোবর ২০২৬
২০ অক্টোবর ২০২৬
