Published on
:
2 min read
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম তিনি শুনেছেন। ‘কবি মানুষ’। লেখাপত্র অবশ্য পড়েননি। সেই সুযোগও হয়তো ছিল না। কিন্তু যায় আসে না কিছুই। ঢাকার ওই অখ্যাত রিকশাচালক জানেন, কবির অসম্মান করতে নেই। তাই নিজে হাতে জল ঢেলে রগড়ে রগড়ে কবির মুখের কালি মুছেছেন তিনি। যেন বাংলাদেশের গা থেকে ময়লা তুলছেন।
রিকশাচালকের নাম-পরিচয় জানা যায়নি। তবে তাঁর সেই কালি মোছার ভিডিয়ো (সত্যতা যাচাই করেনি এই সময় অনলাইন) ছড়িয়ে পড়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। দেখা যাচ্ছে, পরনে একটা লুঙ্গি আর গেঞ্জি। হাতে সাদা ড্রাম। তা থেকে জল ঢেকে রবীন্দ্রনাথের ছবির উপর থেকে কালি মুছছেন তিনি। তাঁকে ঘিরে সাংবাদিকদের ভিড়। ক্যামেরা, বুম। একজন জিজ্ঞেস করলেন, ‘কার ছবি জানেন?’
রিকশাচালকের মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। তার ফাঁক দিয়েই একগাল হাসলেন, ‘কবি মানুষ। একটা দেশের লোক। ভালো লোক।’ কিন্তু সাংবাদিকরা ছাড়ার পাত্র নন। পাল্টা প্রশ্ন ধেয়ে এল, ‘কোন দেশের লোক? বাংলাদেশের না অন্য দেশের?’ মানচিত্র, সীমান্ত, কাঁটাতারের বেড়াজালে রবীন্দ্রনাথকে আটকানোর এক শেষ চেষ্টা যেন।
রিকশাচালকের এত কিছু বোঝার কথা নয়। তিনি যেন ‘দুয়োরে খিল/ টান দিয়ে তাই খুলে দিলাম জানলা’ মন্ত্রে বিশ্বাসী। আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বললেন, ‘এই দেশেরই তো।’ সঙ্গে সঙ্গে ভুল ধরিয়ে দিলেন ওই সাংবাদিক, ‘তিনি এই দেশের লোক নন।’ কথাটা শুনেও মুখে কোনও ভাবান্তর হলো না রিকশাচালকের। বরং আরও চওড়া হেসে বললেন, ‘ওহ, আমি জানি না অত।’
ততক্ষণে ভিড় বেড়েছে। কেউ একজন চিৎকার করে বললেন, ‘তুই যা এখান থেকে।’ কথাগুলো শুনে একবার চারদিকে তাকালেন। তার পরে ড্রাম নিয়ে উল্টো দিকে হাঁটতে শুরু করলেন তিনি। তাঁর পিছু পিছু ছুটতে লাগলেন সাংবাদিকরাও। হাতের বুম বাড়িয়ে দিয়ে একজন জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনি নিজে থেকে মুছেছেন?’ প্রশ্নটা শুনেই থমকে দাঁড়ালেন রিকশাচালক। প্রথমে বললেন, ‘হ্যাঁ, এমনিই জল দিয়ে মুছে দিলাম।’ তার পরেই যেন কিছু ভেবে শুধরে নিলেন, ‘স্যরেরা বললেন।’
ভিড় থেকে আবার একটা চিৎকার ভেসে এল, ‘তোকে যেতে বললাম তো।’ আর দাঁড়ালেন না তিনি। পড়ি কি মরি করে ছুটতে শুরু করলেন। ততক্ষণে পুলিশও এসে গিয়েছে। বাঁশি বাজিয়ে ভিড় পাতলা করতে শুরু করেছেন তাঁরা। তবে রবীন্দ্রনাথের ছবিটা ততক্ষণে পরিষ্কার। শনিবার সেগুনবাগিচায় শিল্পকলা অ্যাকাডেমির দেওয়ালে আঁকা রবীন্দ্র-গ্রাফিতিতে এক তরুণী যে কালি লাগিয়ে দিয়েছিলেন, তা ওই রিকশাচালক সাফ করে দিয়েছেন পুরো।
জানা গিয়েছে, গত ৫ অক্টোবর ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন অ্যাকডেমির পাশের ফুটপাথ দখলমুক্ত করার পরে দেওয়ালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজি নজরুল ইসলাম, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, সত্যজিৎ রায়-সহ ১০ জন বিশিষ্ট ব্যক্তির প্রতিকৃতি আঁকা হয়। কিন্তু এই নিয়ে প্রশ্ন তোলে ‘জুলাই রেভ্যুলুশনারি অ্যালায়েন্স’ নামের একটি গোষ্ঠী। তাঁদের কাছে সত্যজিৎ, বিদ্যাসাগররা ‘পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব’। তার পরেই কালি লেপার ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় এখনও পর্যন্ত চার জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
