বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষা ও ক্রমবর্ধমান ঋণের বোঝা সামাল দিতে কর কাঠামোর আমূল সংস্কার, অপ্রয়োজনীয় কর অব্যাহতি প্রত্যাহার এবং সরকারি ব্যয়ে দক্ষতা বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। একই সঙ্গে ঢালাও ভর্তুকি দেওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা বলয় নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে সংস্থাটি।
গতকাল বুধবার থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনের অংশ হিসেবে আয়োজিত ‘ফিসক্যাল মনিটর’ সংক্রান্ত সংবাদ ব্রিফিংয়ে এসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়। ব্রিফিংয়ে আইএমএফের ফিসক্যাল অ্যাফেয়ার্স বিভাগের পরিচালক রদ্রিগো ভালদেস, উপপরিচালক এরা
দাবলা-নরিস এবং ডিভিশন চিফ ডেভিডে ফুরচেরি বক্তব্য রাখেন।
আইএমএফের বিশ্লেষণে বলা হয়, ঢালাওভাবে ভর্তুকি দিলে তার বড় সুফল চলে যায় উচ্চ ভোগক্ষমতাসম্পন্ন শ্রেণির কাছে। ফলে সরকারি সম্পদের কার্যকর ব্যবহারে জ্বালানি ও নিত্যপণ্যে নির্বিচারে ভর্তুকি না দিয়ে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত ও দরিদ্র পরিবারগুলোকে সামাজিক সুরক্ষা দেওয়া প্রয়োজন। কর ব্যবস্থার অটোমেশন ও ফাঁকি রোধের মাধ্যমে অনেক দেশ তাদের জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ অতিরিক্ত রাজস্ব আহরণ করতে পারে বলেও উল্লেখ করা হয়। তবে কর বৃদ্ধি বা ভর্তুকি সমন্বয়ের সময় সাধারণ মানুষ যেন অতিরিক্ত মূল্যস্ফীতির চাপে না পড়ে, সে বিষয়েও সতর্ক করেছে সংস্থাটি। এ ছাড়া বৈশ্বিক ভূরাজনীতি, প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি, জলবায়ু ঝুঁকি ও বয়োবৃদ্ধ জনসংখ্যার কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক সক্ষমতা রক্ষায় দ্বিপক্ষীয় ঋণদাতাদের গঠনমূলক ভূমিকার ওপর জোর দেয় আইএমএফ।
এদিকে চলমান সম্মেলনের ফাঁকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
চীনের এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনার কথা জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সার্বিক সহযোগিতায় আমরা ঋণের কাঠামো বা ফাইন্যান্সিয়াল আর্কিটেকচার পরিবর্তন করতে চাই। আমরা কেবল সভরেন লোন বা ওডিআই ঋণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ইক্যুইটি ইনভেস্টমেন্টে যেতে চাচ্ছি। অর্থাৎ ডেট (ঋণ) থেকে সরে এসে আমরা সরাসরি ও যৌথ অংশীদারত্বমূলক বিনিয়োগের দিকে যাচ্ছি। এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে এবং তারা বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখছে।’
যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের সঙ্গে বৈঠক প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী জানান, ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং সামগ্রিক দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব নিয়ে কথা হয়েছে। ওয়াশিংটনের কাছ থেকে প্রত্যাশিত আর্থিক সহায়তা ও অনুদান না পাওয়ার বিষয়টি সরাসরি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমরা তাদের বলেছি, বর্তমানে বাংলাদেশ বিপুল পরিমাণ মার্কিন উড়োজাহাজ, তেল, সয়াবিন ও অন্যান্য পণ্য কিনছে। ব্যালান্স অব পেমেন্টের বিষয়টিও ইতিবাচকভাবে নেওয়া হয়েছে। অতএব এমন বড় বাণিজ্যিক অংশীদারত্বের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকেও প্রত্যাশিত আর্থিক সমর্থনগুলো আসা উচিত। তারা বিষয়টি অনুধাবন করে একমত প্রকাশ করেছে।’
এ ছাড়া কৃষি উৎপাদন বাড়ানো ও টেকসই কৃষিব্যবস্থার রূপরেখা প্রণয়নে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিলের (ইফাদ) সঙ্গেও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
তিনি জানান, আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক এবং মার্কিন ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট— সবাই একবাক্যে স্বীকার করেছে যে বাংলাদেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক সংকট, ভঙ্গুর রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতি বর্তমান সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে।
তিতুমীর বলেন, ‘আন্তর্জাতিক মহল দেখছে যে বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধানে সরকার অত্যন্ত আন্তরিক ও সমন্বিতভাবে কাজ করছে। এ কারণেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার ও সংকট মোকাবিলায় সব ধরনের সহযোগিতা দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ। আমরা অত্যন্ত আশাবাদী যে আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যেই এই সহায়তার স্পষ্ট রূপরেখা, আর্থিক পরিমাণ ও অগ্রগতি দেখতে পাওয়া যাবে।’
