‘তুমি কোন শহরের মাইয়া গো, লাগে উড়াধুরা’- জনপ্রিয় এই গানের কণ্ঠশিল্পী দেবশ্রী অন্তরা রায় চৌধুরী চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলার সাহাপুর চৌধুরী বাড়ির মেয়ে। ২০২৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত বাংলাদেশের আলোচিত চলচ্চিত্র ‘তুফান’-এর গান ‘লাগে উড়াধুরা’ দিয়ে দেশজুড়ে পরিচিতি পান তিনি। ছোটবেলা থেকে সংগীতচর্চা, নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে জাতীয় সংগীতাঙ্গনে জায়গা করে নেওয়া অন্তরার এই অর্জনে গর্বিত শাহরাস্তিবাসী।
শারদীয় দুর্গাপূজার ছুটিতে নিজের জন্মভূমি চাঁদপুরের শাহরাস্তিতে এসে ‘খবরের কাগজ’-এর সঙ্গে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে নিজের সংগীতজীবনের শুরু, পেশাদার অঙ্গনে নানা বাধা, সফলতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেন এই সংগীতশিল্পী। তাঁর ভাষায়, সংগীতের পথে এগিয়ে যাওয়ার গল্পটা কেবল সাফল্যের নয়, বরং দীর্ঘ সাধনা, অপেক্ষা ও নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে নিজের জায়গা তৈরি করার গল্প।
মাত্র তিন-চার বছর বয়স থেকেই অন্তরার গানের যাত্রা শুরু। তাঁর বাবা রবীন্দ্রসংগীত গাইতেন এবং মা যুক্ত ছিলেন জাতীয় পর্যায়ের নাচের সঙ্গে। পরিবারে গান ও নাচের পরিবেশেই তাঁর বেড়ে ওঠা। বাবার কিনে দেওয়া হারমোনিয়ামে ভাইয়ের হাত ধরে গানের প্রাথমিক পাঠ শুরু হলেও মা-ই তাঁকে নিয়মিত গান শেখাতেন এবং মঞ্চে পরিবেশনার জন্য প্রস্তুত করতেন।
পরবর্তী সময়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সংগীতচর্চার জন্য সপ্তম শ্রেণিতে ছায়ানটে ভর্তি হন তিনি। সেখানে চার বছর নজরুলগীতি, রবীন্দ্রসংগীত ও লোকসংগীতসহ বিভিন্ন ধারার গানে প্রশিক্ষণ নেন। স্কুলজীবনে বিরতির সময় সহপাঠীরা যখন খেলাধুলায় ব্যস্ত থাকত, অন্তরা তখন শিক্ষকদের কাছে গিয়ে গান শিখতেন।
২০১৬ সালে বাসায় বসে গাওয়া একটি গানের ভিডিও ‘বাংলাবিটস’ নামের পেজে ছড়িয়ে পড়ার পর অন্তরার সামনে নতুন সুযোগ আসে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক এক প্রযোজকের উদ্যোগে মুসাফিল আইনের সঙ্গে বাপ্পা মজুমদারের প্রযোজনায় গান রেকর্ড হলেও সংশ্লিষ্টদের বিরোধে তা আর প্রকাশ পায়নি। ২০১৭-১৮ সালেও মৌলিক গানের সুযোগ এলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার কারণে রেকর্ডিংয়ে অংশ নিতে না পারায় অন্য শিল্পীকে নেওয়া হয়।
এসব অভিজ্ঞতা থেকে অন্তরা উপলব্ধি করেন, শুধু ভালো গাইলেই সংগীতজগতে সুযোগ পাওয়া যায় না। একাধিকবার পছন্দের গান থেকে বাদ পড়া কিংবা কাজের নামে অর্থ দাবির মতো তিক্ত অভিজ্ঞতা তাঁর পথচলাকে কঠিন করে তোলে। ফলে একপর্যায়ে তিনি পড়াশোনা ও অন্যান্য কাজে মনোযোগী হন।
২০২২ সালে ফুয়াদ লাইভ অনুষ্ঠানের জন্য হাবিব ওয়াহিদের গান নিয়ে একটি অডিও-ভিজ্যুয়াল তৈরি করে প্রশংসিত হন অন্তরা। পরে নিজের দীর্ঘ সাত বছরের কাজের পোর্টফোলিও হাবিব ওয়াহিদের কাছে পাঠালে সাড়া পান। এরপর স্টুডিওতে দীর্ঘ আলাপের পর সুযোগ আসে ‘প্রেমে পড়া মন’ গানটি গাওয়ার। পরবর্তীতে হাবিব ওয়াহিদের সঙ্গে ‘ফুটো’ জিঙ্গেল, প্রাণ আপের কাজ এবং ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ‘মন বোঝে না’ গানটি দিয়ে বেশ সাড়া ফেলেন তিনি।
‘তুফান’ ছবির ‘লাগে উড়াধুরা’ গানটি অন্তরার জীবনে নতুন অধ্যায় তৈরি করে। তবে গানটি নিয়ে শুরুতে এতটা প্রত্যাশা ছিল না তাঁর। রেকর্ডিংয়ের দিনের ব্যস্ততার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, দুপুরে টিভিতে সংবাদ পাঠ শেষে প্রীতম হাসানের স্টুডিওতে গিয়ে গানটি রেকর্ড করেন। এরপর রাতেই পরিচালক গিয়াস উদ্দিন সেলিমের সাক্ষাৎকার নিতে ছোটেন। আলাদা প্রস্তুতির সুযোগ না থাকলেও গানটি মুক্তির পর শ্রোতাদের ব্যাপক ভালোবাসা ও সাড়া তাঁকে অভিভূত করে।
সংগীতকে পূর্ণকালীন পেশা না করার কারণ ব্যাখ্যা করে অন্তরা বলেন, “আমাদের দেশে সংগীতশিল্পীদের নিয়মিত আয় নিশ্চিত করা কঠিন। দৈনন্দিন খরচের চাপ থাকলে স্বাধীনভাবে গান করা যায় না।” তাই সংবাদ পাঠ, চাকরি ও শিক্ষকতার পাশাপাশি গান চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। তবে তাঁর মতে, পেশাদারিত্ব ও শিল্পচর্চার মধ্যে ভারসাম্য থাকাই সবচেয়ে জরুরি।
শাহরাস্তি ক্রিকেট একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা ও এসপিএলের উদ্যোক্তা সাদ্দাম হোসেন মিঠু সম্প্রতি জাতীয় পর্যায়ে ‘ইয়ুথ ভলান্টিয়ার অ্যাওয়ার্ড–২০২৬’ অর্জন করায় তাঁকে অভিনন্দন জানান অন্তরা। প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে পুরস্কার পাওয়ায় তাঁর প্রতি শুভকামনা জানানোর পাশাপাশি ‘এসপিএল সিজন-৪’-এর সাফল্য কামনা করেন তিনি।
নিজের জন্মভূমির স্মৃতিচারণ করে দেবশ্রী অন্তরা রায় চৌধুরী বলেন, “চাঁদপুর আমার জন্মভূমি, শিকড়ের টান সবসময় অনুভব করি। শাহরাস্তির যেকোনো আয়োজনে সুযোগ পেলে আমি উপস্থিত থাকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।”
নিজের জন্মভূমির মানুষের কাছে দোয়া চেয়ে তিনি প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন, সংগীতের পথে এগিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি নিজ এলাকার মানুষের সঙ্গে ভালোবাসার এই বন্ধন যেন আজীবন অক্ষুণ্ন থাকে।
ফয়েজ আহমেদ/এসএন/
