বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে আলোচনা সাধারণত সংকট দেখা দিলেই জোরালো হয়। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমলে আমদানি নিয়ন্ত্রণ, ডলারের দাম বাড়লে বাজার তদারকি, প্রবাসী আয় কমলে প্রণোদনা—এভাবেই আমরা সমস্যার তাৎক্ষণিক প্রতিকার খুঁজি। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি প্রশ্নটি ভিন্ন: কীভাবে বাংলাদেশ এমন একটি অর্থনীতি হয়ে উঠবে, যেখানে বিদেশে উপার্জিত অর্থ শুধু দেশে পাঠানোই নয়, নিরাপদে জমা রাখা, বিনিয়োগ করা এবং উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহার করাও সহজ হবে?
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক একটি নীতিপত্র আমাদের এই প্রশ্নটি নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করে। ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত ওই বিশ্লেষণে দেখানো হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা বাংলাদেশের জন্য দ্বিমুখী ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। একদিকে জ্বালানি আমদানি, জাহাজভাড়া, বিমা ব্যয় ও শিল্পের কাঁচামালের খরচ বাড়তে পারে; অন্যদিকে ওই অঞ্চলেই কর্মরত বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশির কর্মসংস্থান ও প্রবাসী আয়ের প্রবাহ অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে। অর্থাৎ একই অঞ্চলের ওপর জ্বালানি ও প্রবাসী আয়ের নির্ভরতা আমাদের অর্থনীতিকে বহির্বিশ্বের অভিঘাতের প্রতি আরও সংবেদনশীল করে তোলে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিপত্রটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জ্বালানি, খাদ্য, বাণিজ্য ও প্রবাসী আয়—সব ক্ষেত্রেই বৈচিত্র্য ও স্থিতিস্থাপকতা দরকার। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ, জ্বালানির উৎসের বহুমুখীকরণ, দক্ষ জনশক্তির জন্য নতুন শ্রমবাজার সৃষ্টি এবং রপ্তানিমুখী শিল্পে আর্থিক সহায়তা—সবই একই কৌশলের অংশ হওয়া উচিত। বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতিশীলতা শুধু ডলার জমিয়ে রাখার বিষয় নয়; এটি উৎপাদনক্ষমতা, বিনিয়োগের আস্থা এবং অর্থনীতির বহুমুখীকরণের প্রশ্ন।
এই বাস্তবতায় শুধু প্রবাসী আয় বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। প্রবাসী আয় দেশের কোটি পরিবারের উপার্জন, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থানের ভরসা। কিন্তু এর বড় অংশ স্বাভাবিকভাবেই দৈনন্দিন ব্যয়ে ব্যবহৃত হয়। আবার বিদেশি ঋণ উন্নয়ন প্রকল্পে প্রয়োজনীয় হলেও তা পরিশোধের বাধ্যবাধকতা তৈরি করে। বাংলাদেশের প্রয়োজন এমন পুঁজি, যা ব্যবসার ঝুঁকি ভাগ করে নেবে, নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে এবং রপ্তানির সক্ষমতা বাড়াবে।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঞ্চয় সেই সম্ভাবনার একটি বড় উৎস। লন্ডন, দুবাই, রিয়াদ, সিঙ্গাপুর, কুয়ালালামপুর কিংবা নিউইয়র্কে বসবাসকারী একজন বাংলাদেশি যদি নিজের নামে বৈদেশিক মুদ্রার হিসাব খুলতে, দেশে শেয়ারে বিনিয়োগ করতে, অবকাঠামো তহবিলে অংশ নিতে কিংবা নতুন ব্যবসায় অংশীদার হতে চান, তবে তার সামনে অপ্রয়োজনীয় জটিলতা থাকা উচিত নয়। তার অর্থের উৎস যাচাই হবে, পরিচয় নিশ্চিত হবে এবং কর ও নিয়ন্ত্রক বিধিবিধান মানতে হবে। কিন্তু বৈধ অর্থকে অনিশ্চয়তা ও দীর্ঘ অনুমোদনপ্রক্রিয়ার গোলকধাঁধায় ফেলে রাখা কোনো আধুনিক অর্থনীতির পরিচয় নয়।
এখানেই প্রবাসী বাংলাদেশিদের নতুন পরিচয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তারা এখন শুধু শ্রমবাজারের কর্মী নন। লন্ডন, নিউইয়র্ক, দুবাই, রিয়াদ, সিঙ্গাপুর, কুয়ালালামপুরসহ নানা শহরে বহু বাংলাদেশি বড় ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের মালিক, অংশীদার, ব্যবস্থাপক ও পেশাজীবী। তাদের রয়েছে ব্যবসা পরিচালনার অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সংযোগ, প্রযুক্তিগত জ্ঞান, সরবরাহব্যবস্থার অভিজ্ঞতা এবং পুঁজি ব্যবস্থাপনার দক্ষতা। বাংলাদেশ যদি এই জ্ঞান, যোগাযোগের নেটওয়ার্ক ও অর্থকে সংগঠিতভাবে আকর্ষণ করতে পারে, তবে প্রবাসী সমাজ জাতীয় অর্থনীতির আরও শক্তিশালী অংশীদার হয়ে উঠতে পারে।
কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা প্রায়ই উল্টো কথা বলে। অনেক প্রবাসী উদ্যোক্তার অভিযোগ, বিদেশে তাদের প্রতিষ্ঠানের বৈধ আয় বা কোম্পানির তহবিল বাংলাদেশে ব্যবসায়িক ব্যাংক হিসাবে আনতে গেলে দীর্ঘ কাগজপত্রের প্রক্রিয়া, একাধিক দপ্তরের অনুমোদন, অস্পষ্ট নির্দেশনা এবং অনিশ্চিত অপেক্ষার মুখে পড়তে হয়। এতে প্রবাসী উদ্যোক্তার সময় ও আস্থা—দুটিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রতিযোগী অর্থনীতিগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশকে শিখতে হবে, কীভাবে বৈদ্যুতিন পদ্ধতিতে যাচাই, নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং ঝুঁকিভিত্তিক তদারকির মাধ্যমে বৈধ ব্যবসায়িক অর্থ দ্রুত নিষ্পত্তি করা যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আরেকটি গবেষণা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেয়। আবাসিক বৈদেশিক মুদ্রা হিসাব এবং অনাবাসিক বৈদেশিক মুদ্রা হিসাব বিদেশে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রাকে দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ধরে রাখার পুরোনো কিন্তু কার্যকর মাধ্যম। এ ব্যবস্থা রয়েছে, ব্যবহারকারীদের আস্থাও রয়েছে; কিন্তু এর সামগ্রিক সম্ভাবনা এখনো পূর্ণভাবে কাজে লাগানো হয়নি।
প্রবাসী উদ্যোক্তাদের তহবিল বা সঞ্চয়কে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে রূপ দিতে তাদের জন্য ডলারভিত্তিক বা মুদ্রার মূল্যহ্রাসজনিত ঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত অবকাঠামো বন্ড, পরিবেশবান্ধব জ্বালানি তহবিল, তালিকাভুক্ত শেয়ারে সহজ বিনিয়োগ, যৌথ বিনিয়োগ তহবিল, রপ্তানিমুখী ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে অংশীদারত্ব এবং স্বচ্ছ ব্যক্তিমালিকানাধীন মূলধন বা নতুন উদ্যোগে ঝুঁকিপূর্ণ মূলধন জোগানোর তহবিল গড়ে তোলা যেতে পারে। গবেষণাপত্রে প্রস্তাবিত সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিন পদ্ধতিতে পরিচালিত অনাবাসীদের রূপান্তরযোগ্য টাকা হিসাবও এ আলোচনায় গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। এটি এখনো একটি প্রস্তাব; তবে যথাযথ সুরক্ষা ও অর্থ প্রত্যাবাসনের সুস্পষ্ট অধিকার থাকলে এমন ব্যবস্থা প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে পারে।
বাংলাদেশকে প্রবাসী আয় গ্রহণকারী দেশ থেকে ধীরে ধীরে বিনিয়োগ আকর্ষণকারী দেশে রূপ নিতে হবে। একজন যাচাইকৃত প্রবাসী উদ্যোক্তা যেন দূরে বসেই একটি হিসাব খুলতে, কোম্পানি নিবন্ধন করতে, বৈধ তহবিল পাঠাতে, বিনিয়োগের অগ্রগতি দেখতে এবং নিয়ম মেনে মুনাফা বা মূলধন ফেরত নিতে পারেন—এটিই হওয়া উচিত লক্ষ্য। প্রবাসীদের ডলার শুধু পরিবারের খরচ মেটানোর সহায়ক নয়; সঠিক নীতি থাকলে সেটি হতে পারে নতুন কারখানা, নতুন রপ্তানি, দক্ষ কর্মসংস্থান এবং অর্থনীতির স্থিতিস্থাপকতা বৃদ্ধির পুঁজি। পাকিস্তানের প্রবাসীদের জন্য চালু করা রোশন ডিজিটাল হিসাবব্যবস্থার অভিজ্ঞতা দেখায়, দূর থেকে হিসাব খোলা, বিনিয়োগের বিভিন্ন সুযোগ এবং অর্থ ফেরত নেওয়ার সুস্পষ্ট অধিকার থাকলে প্রবাসীরা আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার প্রতি বেশি আস্থাশীল হন।
পাকিস্তানের রোশন ডিজিটাল হিসাবব্যবস্থা দেখায়, কীভাবে একটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংক একসঙ্গে প্রবাসীদের অর্থকে সঞ্চয়, বিনিয়োগ ও দৈনন্দিন ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে। প্রবাসী পাকিস্তানিরা বিদেশে বসেই বৈদ্যুতিন পদ্ধতিতে হিসাব খুলে সরকারি ঋণপত্র, শেয়ার, যৌথ বিনিয়োগ তহবিল, ব্যাংকে আমানত ও আবাসন খাতে বিনিয়োগ করতে পারেন। বিনিয়োগের মুনাফা ও মূলধন আগাম কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়াই বিদেশে ফেরত নেওয়ার অধিকারও তাদের রয়েছে। এর প্রভাবও দৃশ্যমান। ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ৯ লাখ ৬৬ হাজার হিসাব খোলা হয়েছে এবং এ পথে মোট ১৩ দশমিক ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি অর্থ এসেছে।
ভারত প্রবাসীদের অর্থকে শুধু পারিবারিক প্রবাসী আয় হিসেবে নয়, সঞ্চয়, বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক মূলধন হিসেবেও ব্যবহারযোগ্য করেছে। এ জন্য অনাবাসী ভারতীয়দের সাধারণ সঞ্চয়ী হিসাব এবং বৈদেশিক মুদ্রায় আমানত রাখার মতো বিভিন্ন হিসাব, ব্যবসায়িক লেনদেনের সুযোগ, বিনিয়োগের পর অর্থ ফেরত নেওয়ার অধিকার এবং বৈদ্যুতিন প্রতিবেদনব্যবস্থা তৈরি করেছে। সাম্প্রতিক ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অনাবাসী ভারতীয়দের আমানতে নিট প্রবাহ ছিল প্রায় ১৪ দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে ব্যক্তিগত প্রবাসী আয় ছিল ৪২ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশকে প্রবাসী আয় গ্রহণকারী দেশ থেকে ধীরে ধীরে বিনিয়োগ আকর্ষণকারী দেশে রূপ নিতে হবে। লক্ষ্যটি সহজ: একজন যাচাইকৃত প্রবাসী বাংলাদেশি যেন দূরে বসেই আস্থার সঙ্গে বিনিয়োগ করতে পারেন, ন্যায্য মুনাফা পান এবং নিয়ম মেনে অর্থ ফেরত নিতে পারেন। বৈধ পুঁজির জন্য গতি, সব পুঁজির জন্য স্বচ্ছতা এবং অবৈধ পুঁজির বিরুদ্ধে কঠোরতাই হতে পারে সেই নতুন কৌশলের ভিত্তি।
লেখক: চার্টার্ড হিসাববিদ, উচ্চশিক্ষা ও শিক্ষাদান বিষয়ে স্বীকৃত ফেলো
