সরকার শাহাদত হোসেন: শীতের আগমনী বার্তা জানান দিচ্ছে প্রকৃতি। ভোরের হালকা কুয়াশা আর সন্ধ্যার শীতল বাতাসে গ্রামবাংলায় শুরু হয়েছে খেজুরের রস সংগ্রহের প্রস্তুতি। গাইবান্ধার সাত উপজেলাতেই খেজুরগাছ পরিষ্কার, ডালপালা ছাঁটাই ও রস সংগ্রহের উপযোগী করে তুলতে ব্যস্ত সময় পার করছেন গাছিরা। রাস্তার ধারে, পুকুরপাড়ে কিংবা গ্রামের মেঠোপথের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা খেজুরগাছগুলো যেন জানান দিচ্ছে—দরজায় কড়া নাড়ছে শীত, ফিরছে টাটকা রস আর খেজুরের গুড়ের মৌসুম।
জেলার গাইবান্ধা সদর, পলাশবাড়ী, সুন্দরগঞ্জ, গোবিন্দগঞ্জ, ফুলছড়ি, সাঘাটা ও সাদুল্লাপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে খেজুরগাছ পরিচর্যার প্রস্তুতি চলছে। ধাপেরহাট, নলডাঙ্গা, চেংমারী, পাঁচপীর, সীচা, লালচামার, ঢোলভাঙ্গা, মিরপুর, মীরগঞ্জ, বামনডাঙ্গা, ধাপাচিলা, পচাবস্তা, ঘেগার বাজার, পচা বাজার, ঝাউলি বাজার, বালেরছড়া, ঝালিঙ্গী ও লক্ষ্মীপুরসহ বিভিন্ন এলাকার সড়কপাশে ও গ্রামীণ জনপদে খেজুরগাছ পরিষ্কার করার কাজ শুরু করেছেন গাছিরা। তবে এলাকাভেদে প্রস্তুতির সময় ও রস সংগ্রহের পরিমাণে পার্থক্য রয়েছে।
গাছের পরিচর্যায় ব্যস্ত গাছিরা খেজুরের রস সংগ্রহের জন্য প্রথমেই গাছের মাথা ও আশপাশের শুকনো ডালপালা পরিষ্কার করতে হয়। এরপর বিশেষ কৌশলে গাছের নির্দিষ্ট অংশ ছেঁটে রস ঝরার উপযোগী করা হয়। রস সংগ্রহের জন্য প্রস্তুত রাখা হয় মাটির হাঁড়ি ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম। অভিজ্ঞ গাছিরা জানেন, গাছ কাটার কৌশল, পরিচর্যা এবং আবহাওয়ার ওপর রসের পরিমাণ ও মান অনেকটাই নির্ভর করে।
স্থানীয় গাছিরা জানান, কার্তিক মাসের শেষ দিকে গাছ পরিষ্কার ও কাটাছাঁটার কাজ শুরু হয়। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে অগ্রহায়ণ-পৌষ মাস থেকে পুরোদমে রস সংগ্রহ শুরু হয়। এরপর শীতের তীব্রতা ও গাছের অবস্থা অনুযায়ী মাঘ-ফাল্গুন মাস পর্যন্ত রস সংগ্রহ এবং গুড় তৈরির কাজ চলে।
শীতের সকালে রস-পিঠার অপেক্ষা
খেজুরের রস বাঙালির কাছে শুধু একটি পানীয় নয়, এটি গ্রামবাংলার ঐতিহ্য, আবেগ ও শীতের স্মৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। ভোরে গাছের নিচে রাখা হাঁড়ি থেকে টাটকা রস নামানোর দৃশ্য দেখতে অনেকেই আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করেন। সেই রস দিয়ে তৈরি হয় সুস্বাদু খেজুরের গুড় ও পাটালি। শীতের সকালে ভাপা পিঠা, চিতই পিঠা কিংবা হাতে ভাজা মুড়ির সঙ্গে খেজুরের রস ও গুড়ের স্বাদ গ্রামীণ জীবনে যোগ করে বাড়তি আনন্দ।
গ্রামের প্রবীণদের স্মৃতিতে এখনও ভাসে সেই দিনগুলোর কথা, যখন বাড়ির পাশের খেজুরগাছ থেকে রস সংগ্রহ করে পরিবারের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বাড়তি রস দিয়ে তৈরি করা হতো গুড়। আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে পাঠানো হতো সেই গুড়, আর শীতের পিঠাপুলির আয়োজন ঘিরে তৈরি হতো পারিবারিক মিলনমেলা।
কমছে খেজুরগাছ, হারানোর শঙ্কায় ঐতিহ্য
তবে শীতের এই চিরচেনা ঐতিহ্যের সামনে রয়েছে উদ্বেগও। অনেক এলাকায় খেজুরগাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় রস সংগ্রহের সুযোগও সংকুচিত হচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিমত। রাস্তার ধারে, পুকুরপাড়ে ও পরিত্যক্ত জমিতে একসময় প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা খেজুরগাছ এখন আগের মতো চোখে পড়ে না। কোথাও বসতি ও অবকাঠামো নির্মাণ, কোথাও গাছ কেটে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার এবং নতুন করে গাছ রোপণে অনীহার কারণে এই পরিবর্তন ঘটছে বলে মনে করছেন এলাকাবাসী।
এ ছাড়া খেজুরগাছ থেকে রস সংগ্রহ একটি শ্রমসাধ্য ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। গাছের উঁচুতে উঠে ধারালো সরঞ্জাম দিয়ে গাছ কাটতে হয় বলে অসতর্কতায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে। এ কাজে অভিজ্ঞ গাছির প্রয়োজন হয়। কিন্তু নতুন প্রজন্মের অনেকের মধ্যে পেশাটির প্রতি আগ্রহ কমে গেলে ভবিষ্যতে দক্ষ গাছির সংকটও দেখা দিতে পারে।
গাছ লাগালেই ফিরবে শীতের মিষ্টি ঐতিহ্য
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, খেজুরগাছ রক্ষা ও নতুন করে গাছ রোপণে উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। বাড়ির আঙিনা, পুকুরপাড়, উপযুক্ত পতিত জমি ও সড়কের পাশে পরিকল্পিতভাবে খেজুরগাছ লাগানো গেলে ভবিষ্যতে রস ও গুড় উৎপাদনের সুযোগ বাড়তে পারে। পাশাপাশি গাছিরা যাতে নিরাপদে কাজ করতে পারেন, সে বিষয়েও সচেতনতা প্রয়োজন।
খেজুরগাছ প্রকৃতির এক অনন্য উপহার। এই গাছ গ্রামীণ অর্থনীতি, লোকজ সংস্কৃতি ও শীতকালীন খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। তাই গাছ রোপণ ও সংরক্ষণের মাধ্যমে ঐতিহ্যটি টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব সবার।
গাইবান্ধার গ্রামীণ জনপদে এখন চলছে সেই চেনা প্রস্তুতি। গাছ পরিষ্কার হচ্ছে, প্রস্তুত হচ্ছে রস সংগ্রহের সরঞ্জাম। আর কয়েক সপ্তাহ পর আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ভোরের অন্ধকারে গাছ থেকে নামানো হবে টাটকা রসের হাঁড়ি। সেই রসের মিষ্টি স্বাদে মুখর হয়ে উঠবে গ্রামবাংলার শীতের সকাল। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বেঁচে থাকবে খেজুরের রস, গুড় আর বাঙালির শীতের চিরন্তন গল্প।

