যশোরে লেভেল ক্রসিংগুলো কার্যত মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। এসব ক্রসিংয়ের বেশিরভাগই অবৈধ। বৈধগুলোরও অর্ধেকে নেই গেটম্যান। ফলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষকে রেললাইন পার হতে হয়। এতে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা।
জনবল সংকটে লেভেল ক্রসিংয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে না রেলওয়ে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে কার্যকর যোগাযোগব্যবস্থার অনুপস্থিতি।
বিজ্ঞাপন
রেল কর্তৃপক্ষের মতে, এলজিইডি, পৌরসভা, সওজ ও ইউনিয়ন পরিষদ সড়ক তৈরি করতে গিয়ে যত্রতত্র ক্রসিং নির্মাণ করায় নিরাপত্তা দিতে বেশি সংকটে পড়ছেন তারা। আর গ্রামাঞ্চলে রাস্তা তৈরির প্রধান প্রতিষ্ঠান এলজিইডির মতে, রেলওয়েকে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করলেও তা গা করে না। অর্থাৎ এক্ষেত্রে প্রধান দুই কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার দৃষ্টিকটু প্রবণতা দৃশ্যমান।
রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, যশোর জেলার ওপর দিয়ে যাওয়া তিনটি রেলপথের বিভিন্ন স্থানে ১৭৭টি ক্রসিং রয়েছে। এর মধ্যে ৯৯টি অবৈধ। বৈধ ৭৮টির মধ্যে ৩৪টিতে গেটম্যান নেই। রেলওয়ের বেজেরডাঙ্গা-যশোর সেনানিবাস সেকশনে ৫৮টি এবং যশোর-বেনাপোল সেকশনে চারটি ক্রসিং বাদে ৪১টি অবৈধ ক্রসিং রয়েছে। এসব স্থানে গেটবার না থাকায় ঝুঁকি নিয়ে রেললাইন পার হতে হয় পথচারী ও ছোট যানবাহনকে।
এলজিইডির তথ্য অনুযায়ী, যশোরে তাদের নির্মাণ করা সড়কে ৪০টি রেলক্রসিং রয়েছে। এর মধ্যে ৩৪টি রেলওয়ের অননুমোদিত।
চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত জেলায় রেললাইন পার হওয়ার সময় দুটি বড়
দুর্ঘটনায় পাঁচজন হতাহত হয়েছেন বলে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে জানা যায়। গত ২৬ সেপ্টেম্বর সদর উপজেলার কৃষ্ণবাটি ক্রসিংয়ে বেনাপোল থেকে ঢাকাগামী ‘রূপসী বাংলা’ ট্রেনের ধাক্কায় ইজিবাইক চালক আজিজুর রহমান ও যাত্রী এরশাদ আলী নিহত হন। এর আগে ১০ মে অভয়নগরের ভাঙাগেটে কয়লা বোঝাই ট্রাকের সঙ্গে ট্রেনের সংঘর্ষে ট্রাকচালক মনোয়ার হোসেন নিহত হন। এ দুর্ঘটনায় ট্রাকের হেলপার রায়হান পঙ্গুত্ববরণ করেন। অভয়নগরের এই ভাঙাগেটটি যশোর-খুলনা মহাসড়কে অবস্থিত। এই ক্রসিংয়ে ছোট-খাটো দুর্ঘটনা নৈমিত্তিক।
এদিকে গত এক দশকে জেলায় ছোট-বড় ৪৫টি দুর্ঘটনায় অন্তত ৭৫ জন প্রাণ হারিয়েছেন। গুরুতর আহত হয়ে পঙ্গুত্ববরণ করেছেন বহু মানুষ।
ফোননির্ভর যোগাযোগে দায়িত্ব পালন
রেলক্রসিংয়ের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে শহরের খড়কি রেলগেটের গেটম্যান সুকান্ত সিংহ বলেন, আমরা এখানে তিনজন ডিউটি করি। আট ঘণ্টা করে ডিউটির মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করা হয়।
তিনি জানান, ট্রেন চলাচলের তথ্য এক গেট থেকে অন্য গেটে ফোন করে জানানো হয়। কোনো গেটম্যান ট্রেনের খবর দিতে ভুল করলে, কল করতে বা রিসিভ করতে না পারলে পরবর্তী গেটে ট্রেনের আগমনের তথ্য না-ও পৌঁছাতে পারে। এতে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়ে।
সুকান্ত বলেন, রেলওয়ের সিগন্যাল ব্যবস্থা খুবই দুর্বল। আমরা ফোনের ওপর নির্ভরশীল। ফোনে চার্জ না থাকলে বা নেটওয়ার্কের সমস্যায় কল না এলে ট্রেনের খবর মিস হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তখন দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
তার ভাষ্য, গেটম্যানদের জন্য বরাদ্দ ঘরে বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় তাদের দায়িত্ব পালন ও অবস্থান করতে দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
আধা কিলোমিটারে সাত ক্রসিং
শহরের খড়কি এলাকায় আধা কিলোমিটারের মধ্যে সাতটি রেলক্রসিং রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র একটি বৈধ। স্থানীয়দের ভাষ্য, এলজিইডির সড়ক নির্মাণের সময় এসব ক্রসিংয়ের সৃষ্টি হয়েছে। ঘনবসতিপূর্ণ খড়কির ধোপাপাড়া সড়কের পাশে রয়েছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, যেখানে তিন শতাধিক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে।
ধোপাপাড়া সড়কটি দক্ষিণ-পশ্চিম অংশের বাসিন্দাদের মূল শহরে ঢোকার প্রধান পথ। সড়কটির ওপর দিয়ে চলে গেছে রেলপথ। ঢাকা ও রাজশাহীসহ উত্তরবঙ্গের সঙ্গে রেলযোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ এই পথে থাকা ক্রসিংটিতে গেটম্যান নেই। সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড থাকলেও তার লেখা অস্পষ্ট।
অরক্ষিত এসব ক্রসিংয়ে রেললাইন পার হওয়ার সময় অনেক ক্ষেত্রে ট্রেন আসছে কি না, তা আগে থেকে বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। কোথাও কোথাও স্থানীয় বাসিন্দারাই স্বেচ্ছায় দাঁড়িয়ে পথচারী ও যানবাহন চালকদের সতর্ক করার চেষ্টা করেন।
খড়কি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আল ইমরান বলেন, বিদ্যালয়ের পাশে থাকা অননুমোদিত রেলক্রসিংটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বিকল্প পথ না থাকায় শিশুদের ঝুঁকি নিয়ে স্কুলে আসতে হয়।
তিনি বলেন, এর আগেও এখানে দুর্ঘটনায় একজনের অঙ্গহানি হয়েছে। এ কারণে আমরা সব সময় উদ্বেগের মধ্যে থাকি কখন কোন শিক্ষার্থী বড় ধরনের দুর্ঘটনার শিকার হয়।
কৃষ্ণবাটিতে দুর্ঘটনার পর আতঙ্ক
যশোর সদরের কৃষ্ণবাটি গ্রামের ভ্যানচালক নাসির উদ্দিন বলেন, অরক্ষিত রেলক্রসিংয়ের কারণে স্থানীয়দের প্রতিনিয়ত ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। তার অভিযোগ, ক্রসিংয়ের দুই পাশ থেকে রেললাইন স্পষ্ট দেখা যায় না। ফলে রেললাইনের কাছে না পৌঁছানো পর্যন্ত অনেক সময় ট্রেন আসছে কি না, তা বোঝা কঠিন হয়।
নাসিরের ভাষ্য, সম্প্রতি কৃষ্ণবাটি ক্রসিংয়ে ট্রেনের ধাক্কায় ইজিবাইকের দুই আরোহীর মৃত্যু স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক বাড়িয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে ক্রসিংটিতে স্থায়ী রেলগেট ও গেটম্যান নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
অবৈধ ক্রসিং তৈরি করছে বিভিন্ন পক্ষ
যশোর রেলওয়ের সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ চাঁদ বলেন, স্থানীয় বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান নিজেদের প্রয়োজনে অনুমোদন ছাড়াই রেলক্রসিং তৈরি করেছে। আবার অতীতে বিভিন্ন দপ্তরের অধীনে থাকা কিছু বৈধ ক্রসিং বর্তমানে জনবলহীন হয়ে পড়েছে।
তিনি জানান, দুর্ঘটনা এড়াতে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকের মাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় ক্রসিং বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে নিয়মিত চিঠি দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে, এলজিইডি, সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ) কিংবা পৌরসভার আওতাধীন যেসব গুরুত্বপূর্ণ ক্রসিং বৈধ করা প্রয়োজন, সেগুলোর অনুমোদন প্রক্রিয়াও নিয়ম অনুযায়ী চলছে।
সিগন্যালের ত্রুটির কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, দূরবর্তী ও প্রত্যন্ত এলাকার ক্রসিংগুলোতে বিদ্যুৎ ও সোলার প্যানেলের মাধ্যমে আলোর ব্যবস্থা চালুর কাজ চলছে। পাশাপাশি যোগাযোগব্যবস্থা আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে পরীক্ষামূলকভাবে মোবাইল ফোন সিস্টেম চালু করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে এটি সব গেটে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী আহমেদ মাহবুবুর রহমান বলেন, রেলক্রসিংগুলো নিয়ে জরিপ করে রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীর সমন্বয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। সেই তথ্য এলজিইডির প্রধান কার্যালয়ের রক্ষণাবেক্ষণ ইউনিটে পাঠানো হয়েছে। আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে এ বিষয়ে যে সিদ্ধান্ত হবে, সেই অনুযায়ী ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা হবে।
তার দাবি, গেটম্যান নিয়োগের বিষয়ে রেলওয়েকে চিঠি দেওয়া হলেও কার্যকর উদ্যোগ পাওয়া যায়নি।
ক্রসিংগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করেন এলজিইডির এই নির্বাহী প্রকৌশলী।
সমন্বয়হীনতা বন্ধের দাবি
বৃহত্তর যশোর রেলযোগাযোগ উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক রুহুল আমিন বলেন, সরকারি দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে অবৈধ রেলক্রসিংয়ের সংখ্যা বাড়ছে। এসব ক্রসিং একেকটি মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে।
তিনি বলেন, দ্রুত অপ্রয়োজনীয় ক্রসিং বন্ধ করতে হবে। যেসব স্থানে মানুষের চলাচলের স্বার্থে ক্রসিং রাখা জরুরি, সেখানে নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও সচেতন হতে হবে।
